রাজনীতি

বাজেটে কর, মূল্যস্ফীতি চক্র থেকে মুক্তির দিকনির্দেশনা নেই: ইসলামী ফ্রন্ট

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট দেশের শ্রমজীবী, নিম্নআয়ের ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। অর্থপাচারকারীদের নয়, বরং সাধারণ মানুষের ওপর বাজেটের বোঝা চাপানো হয়েছে ব‌লে মন্তব্য ক‌রে‌ছেন বাংলা‌দেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান মাওলানা এম এ মতিন।

বা‌জেট প্রতি‌ক্রিয়ায় শুক্রবার (১২ জুন) দল‌টির চেয়ারম্যান ব‌লেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট দেশের শ্রমজীবী, নিম্নআয়ের ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এটি মূলত ঋণ, কর ও বৈষম্যনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার একটি রাজনৈতিক দলিল, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান সংকট নিরসনের কার্যকর কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

তি‌নি বলেন, প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের বিপরীতে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি রাখা হয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে সরকার দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা আরও বাড়াতে যাচ্ছে। ফলে আজকের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার বোঝা আগামী প্রজন্মের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণ, ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপ জাতীয় অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার দিকে ঠেলে দেবে।

দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করলেও বাজেটে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর কর্মপরিকল্পনা নেই মন্তব্য করে এম এ ম‌তিন ব‌লেন, চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, ওষুধ, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অথচ জনগণের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার, বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে বাজেটে কোনো দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য উদ্যোগ প্রতিফলিত হয়নি।

রাজস্ব আদায়ের অবাস্তব লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন কর আরোপ এবং পরোক্ষ কর বৃদ্ধির পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সীমিত আয়ের মানুষ। অন্যদিকে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে, ব্যাংক খাতকে দুর্বল করেছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার সাধারণ জনগণের ওপর কর ও মূল্যস্ফীতির নতুন বোঝা চাপানোর পথ বেছে নিয়েছে ব‌লেও অ‌ভি‌যোগ ক‌রেন তি‌নি।

দেশের ব্যাংকিং খাত আজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং আর্থিক খাতে অনিয়মের কারণে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে এ সংকট উত্তরণে কোনো মৌলিক সংস্কার কর্মসূচি নেই। যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট ও অর্থপাচারের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার কোনো দৃঢ় অঙ্গীকারও বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি ব‌লে দা‌বি ক‌রেন তি‌নি।

দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত যুবক বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত উল্লেখ করে এম এ ম‌তিন ব‌লেন, শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও নীতিগত সহায়তা বাজেটে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। একইভাবে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ন্যায্যমূল্যের সংকট এবং কৃষিখাতের বহুমাত্রিক সমস্যার সমাধানেও কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে।

তি‌নি ব‌লেন, একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের বাজেট হওয়া উচিত কৃষক, শ্রমিক, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে ধনী-গরিব বৈষম্য হ্রাস, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট প্রতিফলন নেই। বরং অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো বজায় রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

অবিলম্বে বাজেট পুনর্বিবেচনা করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি ও উৎপাদনমুখী খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, অর্থপাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান দল‌টির চেয়ারম্যান এম এ মতিন।