মতামত

তত্ত্ব ও বাস্তবতার নিরিখে এবারের বাজেট

একটা ধ্রুপদী বিতর্কের বিষয় দিয়ে শুরু করি। ‘তাত্ত্বিক জ্ঞান’ বনাম ‘বাস্তব প্রয়োগের’ মধ্যে প্রকাশ্য মতভেদ রয়েছে। অ্যাকাডেমিসিয়ানগণ মনে করেন যারা কাজ সম্পাদন, বাস্তবায়ন ও অনুশীলন করেন তারা তত্ত্বনির্ভর নন। পক্ষান্তরে, যারা সরাসরি কাজের সাথে সম্পৃক্ত তারা মনে করেন, শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞাননির্ভর হলে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আসলে দু’পক্ষের বক্তব্যই অসম্পূর্ণ। যে কোনো সমস্যার টেকসই সমাধান চাইলে এর তাত্ত্বিক বিষয়গুলো গভীরভাবে অনুধাবন এবং একইসঙ্গে এর প্রায়োগিক দিক সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হয়। 

যেমন, বাজেটের আকার জিডিপির কত শতাংশ হবে তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের বাজেট জিডিপির ২০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত। আবার যারা বাস্তবায়ন করেন তারা একে ১৫ থেকে ১৭ শতাংশে রাখতে আগ্রহী। এবারের প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে জিডিপি ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। ফলে বাজেট জিডিপির ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ হওয়ায় এবারের বাজেটকে সম্প্রসারণমূলক বলার যুক্তি নাই। প্রসঙ্গত, শেষ হতে যাওয়া অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৬০ লাখ ৮০ হাজার ৩২০ কোটি টাকা।

বাজেট নিয়ে লেখা মূলত কী কী পণ্যের দাম বাড়ল ও কমলো, রাজস্ব আয়ের অপ্রতুলতার কারণে ঘাটতি বাজেট কত হলো, দেশিয় ও বৈদেশিক ঋণের কী অবস্থা কিংবা মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে আটকে যায়। তবে এ লেখা ভিন্নরূপে ২০২৭ অর্থবছরের বাজেটকে মূল্যায়ন করার প্রয়াস পেয়েছে। তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি কীভাবে বাস্তবতার নিরিখে এ বাজেট জনগণের কল্যাণে কাজ করবে সে বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। কেইনসীয় অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেট সরকারের রাজস্ব নীতির মূল হাতিয়ার; যার মাধ্যমে সরকার সামগ্রিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কেইনসীয় দর্শন অনেকক্ষেত্রেই সম্প্রসারণশীল বাজেটকে সমর্থন করে। সামগ্রিক বিবেচনায় অন্তত দুটি কারণে এবারের বাজেট রক্ষণশীল। প্রথমত, আগে যেভাবে বলেছি, বাজেট জিডিপির মাত্র ১৪ শতাংশের মতো যা আসলে সম্প্রসারণশীল নয়। তবে গত অর্থবছরের তুলনায় বাজেট ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বৃদ্ধিকে সম্প্রসারণমূলক বলা যেতে পারে। এখানে একটি দৃশ্যমান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি সংকোচনমুখী থাকে (মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য) তবে এটি সম্প্রসারণমুখী রাজস্বনীতিকে (বৃহৎ বাজেট) নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে যা একটি নীতিগত দ্বন্দ্ব। এ দুই নীতির সমন্বয়ের অভাব সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, অনুদান ব্যতীত বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে সরকার অপেক্ষাকৃত নিম্ন ঘাটতি নীতি গ্রহণ করেছে মর্মে প্রতীয়মান হয়। Ricardian Equivalence তত্ত্ব বলছে, রাজকোষের অতিরিক্ত ঘাটতি ভবিষ্যতে করদাতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে সংকুচিত করতে পারে। এক্ষেত্রে, ৩ দশমিক ৬ শতাংশের এ ঘাটতি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য যথেষ্ট বিচক্ষণ। বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে সরকার বিদেশি ঋণের ওপর ৪৫ শতাংশের কিছু বেশি এবং অবশিষ্ট অংশের জন্য অভ্যন্তরীণ উৎসের (ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা) ওপর নির্ভর করবে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ বাজেটের একটি ক্রমবর্ধমান অংশকে গ্রাস করছে, যা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ-স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন ধরে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ধারণা অনুসারে, যদি সুদের হার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি হয় তবে ঋণ-জিডিপি অনুপাত সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় যা ভবিষ্যতে রাজস্ব নীতির সক্ষমতা সংকুচিত করতে পারে। তবে বৈদেশিক উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে Concessional Loan পাওয়া গেলে debt sustainability নিয়ে শঙ্কার কিছু নাই। যদিও নিম্ন-আয়ের দেশ হতে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের ফলে বাজারভিত্তিক ঋণ গ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় ঋণের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে, আইএমএফ বাংলাদেশকে ‘নিম্ন ঝুঁকি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘মধ্যম ঝুঁকি’ ক্যাটাগরিতে অবনমন করেছে। এর কারণ হিসেবে সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দুর্বলতা, নীতি-শৃঙ্খলার অনুপস্থিতি এবং সচ্ছতাকে দায়ী করেছে। 

চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম যার প্রধান কারণ ধীরগতির প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রকিউরমেন্টে কালক্ষেপণ এবং দাতাদের শর্ত পূরণে জটিলতা। বাজেটে যদি বৈদেশিক অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হয় তবে সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর (ব্যাংক ঋণ) নির্ভর করতে হবে, যা মুদ্রাবাজারে crowding out প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে; অর্থাৎ ব্যক্তিখাতের ঋণ প্রাপ্তি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ সীমিত হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সুদের হার বৃদ্ধির চাপ তৈরি করতে পারে। এ ক্রাউডিং আউট মূলত একটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অনেকাংশেই প্রযোজ্য নয়। কারণ আমাদের বেসরকারি বিনিয়োগ মূলত জ্বালানির সহজলভ্যতা ও অন্যান্য জটিলতার ওপর নির্ভর করে। সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বললে, সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ফলে ব্যাংকিং খাতের অর্থ অলস পড়ে না থেকে সার্ভিসিং হচ্ছে। 

চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা কিছুটা নিম্নমুখী হলেও আগামীতে সরকার একটি উচ্চাভিলাষী পুনরুদ্ধারভিত্তিক প্রবৃদ্ধি (আগামী পাঁচ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশ) লক্ষ্য স্থির করেছে। এটি এক প্রকার V-shaped পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা প্রতিফলিত করে, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রত্যাবর্তন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের আস্থা পুনরুদ্ধারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। 

একইসঙ্গে, এটি ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি বিনির্মাণে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। Harrod-Domar মডেল অনুযায়ী, সাড়ে ৮ শতাংশের প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত অন্তত ৩২-৩৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে যেখানে বেসুরকারি খাতকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা (৭.৫ শতাংশ) এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ, যা দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সমস্যা; যেমন বাজার সিন্ডিকেশন, সরবরাহ চেইনে অদক্ষতা এবং আমদানি নির্ভরতা এর প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়। Phillips Curve অনুসারে, মূল্যস্ফীতি এবং বেকারত্ব বা প্রবৃদ্ধির মধ্যে একটি বিপরীত সম্পর্ক বিদ্যমান। ফলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সাধারণত উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নিতে হতে হয়। কারণ অনেকক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও উচ্চ প্রবৃদ্ধি (অন্যভাবে বললে বেকারত্ব হ্রাস) একসাথে অর্জন করা সম্ভব নয়, যা তাত্ত্বিকভাবেও চ্যালেঞ্জিং। তবে এটি অসম্ভব নয়। যদি supply side এর সংস্কার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ চেইনের দক্ষতা উন্নয়ন করা যায়, তাহলে supply side এর কারণে সৃষ্ট cost-push inflation কমানো সম্ভব হবে। ফলে চাহিদা সংকোচন না করেই মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

জ্বালানি ও খাদ্য খাতে ভর্তুকি ব্যয় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ভর্তুকি বৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদে Consumer Price Index কমাতে সহায়ক হলেও এটি রাজস্ব ঘাটতি বৃদ্ধি করবে। ফলশ্রুতিতে আবার মূল্যস্ফীতিজনক চাপ তৈরি হবে যা একটি সম্ভাব্য circular problem. বাজেটে সরকার লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে এ দ্বিমুখী চাপ মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। Engel’s Law অনুযায়ী কোনো পরিবারের আয় বৃদ্ধি পেলে তাদের মোট আয়ের যে অংশ তারা খাদ্যে ব্যয় করে সে অনুপাত কমতে থাকে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে এ সূত্র কাজ করছে না। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ খাদ্যে পিছনে ব্যয় হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ বা গুণক প্রভাব এর মাধ্যমে কিছুটা হলেও সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। তবে এসব গুণকের কার্যকারিতা মূলত ব্যয়ের ধরনের ওপর নির্ভর করে। উন্নয়ন ব্যয়ের গুণক সাধারণত পরিচালন ব্যয়ের গুণকের তুলনায় বেশি; কারণ মূলধনী ব্যয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করে।

পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তি-নির্ভর খাতে (বৈদ্যুতিক গাড়ি ও এর ব্যাটারি উৎপাদন, চার্জিং অবকাঠামো এবং বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাক) করছাড় এবং ভোগ-নিরুৎসাহী পণ্যে কর বৃদ্ধি সরাসরি Pigouvian Tax তত্ত্বকে সমর্থন করে। কারণ যেসব পণ্য বা কার্যক্রম negative externality সৃষ্টি করে, যেমন তামাক ব্যবহার এবং জ্বালানিনির্ভর যানবাহন থেকে কার্বন নিঃসরণ, সেগুলোর ওপর উচ্চ কর আরোপ করে রাজস্ব বাড়িয়ে সামাজিক ক্ষতি কমানো যায়। উপরন্তু, তামাকজাত পণ্যের চাহিদা সাধারণত মূল্য-অস্থিতিস্থাপক। ফলে Ramsey Rule of optimal taxation এর আলোকে এসব পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বাহ্যিকতা কমাতেও সহায়ক হবে যা কার্যত একটি double dividend প্রভাব। 

অন্যদিকে, positive externality সৃষ্টি করা খাত যেমন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও আইটিতে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। এগুলো অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের একটি পদক্ষেপ, যা পোশাক শিল্প নির্ভরতা থেকে ধাপে ধাপে সরে আসার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এছাড়া, ‘লুইস টার্নিং পয়েন্ট’ এর দিকে ধাবিত হতে হলে সস্তা শ্রমের সুবিধা থেকে ক্রমান্বয়ে উচ্চ মূল্য সংযোজনসম্পন্ন খাতে স্থানান্তরিত হতে হবে। 

প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানবসম্পদ মূলধন তত্ত্ব অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ অপরিহার্য। কারণ এটি শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে অভিযোজন ক্ষমতা বাড়ায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারণায় Endogenous Growth Theory বলছে, দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধি কেবল মানব পুঁজির উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভব। ভৌত অবকাঠামোর চেয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের Multiplier Effect বেশি। মানবসম্পদ উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হলেও যদি প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ধীর এবং অর্থ ব্যয়ের দক্ষতা কম থাকে তাহলে প্রকৃত প্রভাব সংকুচিত হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ৬০-৬৫ শতাংশ এসেছে মূলধন সঞ্চয় থেকে যেখানে Total Factor Productivity এর অবদান মাত্র ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ; কিন্তু টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য একে অন্তত ৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে নিম্ন আয়ের দেশসমূহের কর-জিডিপি অনুপাত যেখানে গড়ে ১৯ শতাংশের মতো সেখানে বাংলাদেশের জন্য তা ৮ শতাংশের নিচে। এ অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি না করা গেলে ঋণ পরিশোধের চাপের ফলে রাজস্ব ঘাটতি সময়ের পরিক্রমায় প্রকৃত অর্থে আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই এ বাজেটের সফলতা মূলত রাজস্ব আদায়ের ওপর নির্ভর করছে।

মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা (এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা) প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কার্যত এনবিআরের প্রশাসনিক সংস্কার, কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং কর জালের সম্প্রসারণের ওপর নির্ভরশীল। Laffer Curve নির্দেশ করে, করের হার অযৌক্তিকভাবে বাড়ালে তা রাজস্ব আদায় কমিয়ে দেয়। তাই বাজেটে করের হারের চেয়ে কর ভিত্তি সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে যা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার অনেক বড় হওয়ায় এ বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা এনবিআরের জন্য একটি পর্বতসম চ্যালেঞ্জ। এছাড়া, বিসৃত অনানুষ্ঠানিক খাতের কারণে Okun’s Law সরাসরি কাজ করবে না কারণ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি-কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা ভিন্নভাবে কাজ করে।

উন্নয়ন আলোচনায় ‘গিনি সহগ’ অন্যতম একটি সূচক। গিনি সহগ মাঝারি পর্যায়ে থাকলেও শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, সার্বিকভাবে গিনি সহগের মান ০.৪৯৯ (গ্রামীণ এলাকায় ০.৪৪৬ ও শহরাঞ্চলে ০.৫৩৯)। এ বৈষম্য যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে তা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। আয় বৈষম্যের ক্ষেত্রে Kuznets Curve ও একটি প্রাসঙ্গিক কাঠামো প্রদান করে। এ তত্ত্ব অনুসারে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাথমিক স্তরে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, কিন্তু পরবর্তীতে তা হ্রাস পেতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বর্তমানে বৈষম্য মাঝারি পর্যায়ে থাকলেও শহর-গ্রাম বিভাজন এবং আঞ্চলিক বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা Kuznets Curve এর ঊর্ধ্বমুখী অংশে অবস্থানের ইঙ্গিত করছে। তবে সামাজিক সুরক্ষাকল্পে গৃহীত ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদি উদ্যোগ বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখবে।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রেরণের ওপর আকর্ষণীয় প্রণোদনা এবং ডিজিটাল ফাইনান্সিয়াল সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে যা আশাব্যঞ্জক। বৈদেশিক মুদ্রার বর্তমান রিজার্ভ স্থিতিশীল যা আনুমানিক পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত। এটি অর্থনীতির একটি শক্তিশালী Shock-absorber হিসেবে কাজ করবে। তবে টাকার অবমূল্যায়ন এবং মার্কিন ডলারে সুদের হার বেশি হওয়ায় (যেমন, SOFR) বৈদেশিক ঋণের আসলের সাথে সুদের কিস্তি পরিশোধের চাপের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকুচিত হতে পারে। তাছাড়া, বৈদেশিক খাত বিশ্লেষণে Mundell–Fleming Model অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এ মডেল অনুযায়ী, একটি small open economy তে মুদ্রানীতি ও বিনিময় হার নীতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ালেও একইসঙ্গে আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত করে। এছাড়া, একই মডেল অনুসারে, এক. স্থির বিনিময় হার (বাংলাদেশে বাজারভিত্তিক), দুই. স্বাধীন মুদ্রানীতি, ও তিন. মুক্ত মূলধন প্রবাহ বজায় রাখা একটি Impossible Trinity যা বাংলাদেশের জন্যও প্রযোজ্য।

উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ। মূলত উন্নয়ন ব্যয়ের কারণেই বাজেট ঘাটতি হয় এবং বাজেট বাস্তবায়নের যে চ্যালেঞ্জ তা মূলত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির কারণেই। আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার ঐতিহাসিকভাবে কম। ফলে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার করে ভ্যালু ফর মানি নিশ্চিত করা অনেকাংশেই সম্ভব হচ্ছে না। সরকার যে দশটি অগাধিকার তালিকা তৈরি করেছে সেগুলোর সাফল্যও নির্ভর করবে উন্নয়ন বরাদ্দ বাস্তবায়নের ওপর। একটি দেশ যখন পূর্ণ ভারসাম্য স্তরের অনেক নিচে অবস্থান করে তখন প্রায় সকল খাতই গুরুত্ব বহন করে এবং উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি দ্রুত হারে বৃদ্ধি পায়। ফলে অগ্রাধিকার তালিকা নিয়ে সংশয় নাই। দশটি অগ্রাধিকার হলো: সবার জন্য উন্নয়ন, সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগনির্ভর কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, বিনিয়ন্ত্রণকরণ, সাশ্রয়ী ও সহজীকৃত ব্যবসার পরিবেশ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির বিকাশ, প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, এবং স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এসব অগ্রাধিকারের পাশাপাশি মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা Creative Economy, Sports Economy, Green Economy এবং Blue Economy এর মতো খাতগুলোকে জাতীয় অর্থনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য সুফল বয়ে আনবে। 

বাজেটের টাইমলাইনগুলো বেশ চমকপ্রদ। সরকার 3R (Recovery & Stabilization, Restoration and Reconstruction for Acceleration Strategy) তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করবে। প্রথম ধাপ এক বছর, দ্বিতীয় ধাপ তিন বছর এবং তৃতীয় ধাপ পাঁচ বছরে সম্পন্ন হবে। এছাড়া, ২০৩০-৩১ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত হবে যা এখনই ঘোষণা করা হয়েছে। পরিশেষে, ডগলাস নর্থের ‘প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি’ অনুযায়ী, একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠানের মানের ওপর। দুর্বল প্রাতিষ্ঠান লেনদেন ব্যয় বাড়িয়ে দেয় যা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সরকারকে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে অর্থনীতিকে গতিশীল করতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর এবং প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংস্কারও করতে হবে। সরকার যেভাবে বলছে, “অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের মাধ্যমে দেশ জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) ও দীর্ঘজীবিতা লভ্যাংশ (Longevity Dividend) এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক লভ্যাংশও (Democratic Dividend) অর্জন করবে।”

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষক