বাংলা গানের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদীকে বিশেষ সম্মাননা জানিয়েছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। শুক্রবার (১২ জুন) একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘কালজয়ী কণ্ঠ: শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সৈয়দ আব্দুল হাদী’ শীর্ষক অনুষ্ঠান। এতে পৃষ্ঠপোষকতা করে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রদর্শন করা হয় সৈয়দ আব্দুল হাদীর জীবন, সংগীতজীবন ও অবদানের ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে মঞ্চে বরণ করে নিয়ে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মাননা স্মারক।
সম্মাননা গ্রহণ করে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এই বরেণ্য শিল্পী। বিনয়ী কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি কিছুটা বিব্রতও হয়েছি। এই জন্য যে আমি এতটা যোগ্য নই। আমার প্রতি আপনারা যে প্রশংসাবাক্য উচ্চারণ করলেন, তার প্রতিদানে আমি কী দেব? আমার তো দেওয়ার তেমন কিছু নেই।”
দেশ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, “আমরা যেন আমাদের ভারে দেশটাকে ভারাক্রান্ত না করে ফেলি। সবাই যেন দেশটাকে ভালোবাসি।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং লেখক ও গবেষক জাহেদ উর রহমান। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর আহ্বায়ক হেলাল খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ বলেন, “বাংলা সংগীতকে তিনি এমনভাবে সমৃদ্ধ করেছেন যে, একটি গান কতটা ভালো হয়েছে, তা অনেক সময় বিচার করা হয় সৈয়দ আব্দুল হাদীর কণ্ঠের সঙ্গে তুলনা করে। এমন কোনো সংগীতপ্রেমী মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি অন্তত একবার হলেও তার গাওয়া কোনো গান গুনগুন করেননি। এটাই তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, “বিগত সময়ে আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেক ক্ষতি হয়েছে। কোথাও যেন যথাযথ যত্ন ও আধুনিক পরিকল্পনার অভাব ছিল। আমরা সেই জায়গা থেকে সংস্কৃতিকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চাই। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে শুরু করে সংস্কৃতির সব শাখাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে চাই।”
একপর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী হাদীকে গান গাওয়ার অনুরোধ জানান। জবাবে শিল্পী বলেন, “যদি এখনো গাইতাম, তাহলে হয়তো একটি গান গেয়েই এর প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু আমি তো গান ছেড়ে দিয়েছি, অনেক দিন গাই না। তাই সবাইকে আমার অকৃত্রিম ভালোবাসা উপহার দিলাম।”
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ‘গীতসন্ধ্যা’ আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা সৈয়দ আব্দুল হাদীর জনপ্রিয় গান পরিবেশন করে তাকে শ্রদ্ধা জানান। অংশ নেন আব্দুল্লাহ হেল রাফি তালুকদার, স্মরণ, নোলক বাবু, অনন্যা আচার্য, পিয়াল হাসান, নুজহাত সাবিহা পুষ্পিতা, অপু আমান, সোহানুর রহমান, স্বরলিপি, রাশেদ, রাকা পপি, আজিজুল বারী (সিপু), মুহাম্মদ আনিসুর রহমান ও আতিকসহ অনেকে।
তাদের কণ্ঠে ভেসে ওঠে ‘বাংলাদেশের ছবি এঁকে দিও’, ‘তোমাদের সুখের এই নীড়’, ‘আমার অর্থই একবার যদি কেউ ভালোবাসত’, ‘এই পৃথিবীর পান্থশালায়’, ‘আমি তোমারই প্রেম ভিখারি’, ‘এমনও তো প্রেম হয়’, ‘তুমি ছাড়া আমি একা’, ‘যেও না সাথি’ এবং ‘যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে’-এর মতো কালজয়ী গান।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় সৈয়দ আব্দুল হাদীর বহুল জনপ্রিয় দুটি গান ‘আছেন আমার মোক্তার’ এবং ‘সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি’।
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগীতাঙ্গনে অবদান রেখে আসা সৈয়দ আব্দুল হাদী পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘শ্রেষ্ঠ গায়ক’ হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন। এছাড়া ২০০০ সালে তিনি অর্জন করেন দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক।