কুমিল্লার দাউদকান্দিতে শিবির নেতা জিসানের বহুল আলোচিত নিখোঁজের ঘটনার মোড় নাটকীয়ভাবে ঘুরে গেছে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে। অপহরণের অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেওয়া ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া প্রধানকে ধর্ষণ ও জোরপূর্বক গর্ভপাত করানোর অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, জিসানকে অপহরণ করা হয়নি। বরং বিয়ের চাপ এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এড়াতে তিনি নিজেই আত্মগোপনে গিয়ে অপহরণের নাটক সাজিয়েছেন।
শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন, জিসানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পুলিশের একাধিক টিম তদন্তে নামে এবং অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ভিন্ন চিত্র।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১১ জুন রাত সাড়ে ৮টার দিকে দাউদকান্দি বাজার এলাকা থেকে জিসান মিয়া প্রধান নিখোঁজ হয়েছেন দাবি করে তার স্বজনরা ১২ জুন দাউদকান্দি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে অপহরণ করা হয়েছে বলে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট মাঠে নামে এবং প্রযুক্তিগত ও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান শুরু করে।
তদন্তের এক পর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে দাউদকান্দি এলাকার এক তরুণীর সঙ্গে জিসানের পরিচয় হয়। পরবর্তীতে মোবাইল ফোনে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২০ মে দাউদকান্দিতে জিসানের ভাড়া বাসায় ওই তরুণী ধর্ষণের শিকার হন। পরে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে একাধিকবার তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন জিসান।
পুলিশ সুপার জানান, সম্পর্কের এক পর্যায়ে তরুণী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে জিসান তাকে গর্ভপাত করানোর জন্য চাপ দিতে থাকেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, গর্ভপাতে রাজি না হলে তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। প্রাণনাশের আশঙ্কায় একসময় তরুণী গর্ভপাত করাতে সম্মত হন। এরপর জিসান গর্ভপাতের ওষুধ সংগ্রহ করে তাকে সেবন করান। পরবর্তীতে গর্ভপাত হলে তরুণী জিসানের কাছে বিয়ের দাবি জানান এবং এ নিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চাপের মুখে পড়ে জিসান ১২ জুন বিয়ে করবেন বলে সম্মতি দেন। তবে বিয়ে এড়ানোর পরিকল্পনা থেকেই তিনি ১১ জুন রাতে আত্মগোপনে চলে যান। এরপর এ ঘটনাকে অপহরণ হিসেবে উপস্থাপন করতে স্বজনদের মাধ্যমে থানায় জিডি করানো হয় এবং বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে পুলিশ জানায়।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় শুক্রবার রাতে লাকসাম থানা এলাকার স্থানীয় লোকজন ও পুলিশের সহযোগিতায় লাকসাম জংশন থেকে আত্মগোপনে থাকা জিসানকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় ভুক্তভোগী তরুণী দাউদকান্দি থানায় উপস্থিত হয়ে জিসানকে প্রধান আসামি করে ধর্ষণ, ধর্ষণে সহযোগিতা এবং ভ্রূণ নষ্ট করার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। মামলায় মোট চারজনকে আসামি করা হয়েছে। গর্ভপাতে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, জিসান বর্তমানে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশি হেফাজতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সকল অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জিসান মিয়া প্রধান (২৮) ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং সংগঠনটির কুমিল্লা পশ্চিম জেলা শাখার সাবেক সভাপতি।
এদিকে, কেন্দ্রীয় শিবির নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও গর্ভপাতের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর দাউদকান্দিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে দাউদকান্দি উপজেলা বিএনপি। একইসঙ্গে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জিসানকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।