এক সময় ট্রাক চালাতেন। শখের বশে আঙুর চাষ শুরু করেন। এ দেশের আবহাওয়ায় আঙুর চাষ প্রায় অসম্ভব জেনেও ঝুঁকি নেন হেলাল উদ্দিন। তবে সফল হয়েছেন তিনি। ট্রাক চালানো ছেড়ে দিয়ে এখন তিনি পুরোপুরি আঙুরচাষী। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের অঙুর টক হয়, এমন প্রচলিত ধারণাও ভুল প্রমাণ করেছেন তিনি।
হেলাল উদ্দিন (৪৫) সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা বাইপাস সড়কের বাসিন্দা। বাবা জিন্নাত মোল্লা। তার শুরুটা হয় তিন বছর আগে ইউটিউব দেখে। তিনি বাড়ির আঙিনায় দুটি আঙুরের চারা রোপণ করেন। প্রথমবারেই ভালো ফলন হওয়ায় আগ্রহ বাড়ে। পরে বাইপাস এলাকায় ১৫ কাঠা জমিতে গড়ে তোলেন আঙুর বাগান।
বর্তমানে হেলাল উদ্দিনের বাগানে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইউক্রেন ও ইতালিসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ২০ প্রজাতের আঙুর চাষ হচ্ছে। তার বাগান দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন জেলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। তার কাজে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন স্ত্রী আলেয়া বেগম।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মাচার নিচে সারি সারি ঝুলছে থোকা থোকা আঙুর। সবুজ পাতার ফাঁকে কোথাও লাল, কোথাও কালো, কোথাও হলুদ, কোথাও সবুজ রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে পুরো বাগান। আলেয়া বেগম বলেন, প্রথমে ইউটিউব দেখে আমার স্বামী দুটি আঙুরের চারা দুই হাজার টাকা দিয়ে কিনে বাড়ির আঙিনায় রোপণ করেন। এরপর আমি তাকে বকাবকি করেছিলাম, আঙুর কি বাংলাদেশে হয়? ভেবেছিলাম এতো টাকা নষ্ট হলো। তবে সে তখন বলেছিল, দেখি না কী হয়? একপর্যায়ে কিছুদিন পর ওই গাছে ফল আসলে আমাদের ধারণা বদলে যায়। আঙুরগুলো খুব মিষ্টি এবং সুস্বাদু হয়। এখন বড় বাগান করেছি ৯ মাস হলো। বিভিন্ন প্রজাতির মোট ১২৬টি গাছ রয়েছে।
হেলাল উদ্দীন বলেন, ওই চারা থেকে ভালো ফল পাওয়ায় আমি সিদ্ধান্ত নেই বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ করার। ১৫ হাজার টাকা দিয়ে ১৫ কাঠা জমি বর্গা নিয়ে আঙুর চাষ শুরু করি। মোট খরচ হয় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। ইতিমধ্যে আঙুরের প্রথম চালান বিক্রি করে আমার খরচ উঠে গেছে।
আঙুর চাষে প্রথম একবারই খরচ করতে হয়। এরপর গাছের পরিচর্যা ছাড়া আর কোন খরচ নেই। এই গাছ ৪০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে এবং ১২ মাস ফল দেয়। তবে, ফেব্রুয়ারি মাসে আঙুরের ফলন বেশি হয় বলে তিনি জানান।
যে কেউ বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ করতে পারেন উল্লেখ করে হেলাল উদ্দিন বলেন, আমার এখানে বর্তমানে কালো, লাল, সবুজ ও হলুদসহ ২০ প্রজাতির আঙুর গাছ রয়েছে। আমি আরো ১ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে কাজ শুরু করেছি। সঠিক জাত নির্বাচন ও পরিচর্যার মাধ্যমে দেশীয় মাটিতেও উন্নত মানের মিষ্টি আঙুর উৎপাদন সম্ভব।
আঙুরের বাগান দেখতে আসা পুরাতন সাতক্ষীরার মানিক চন্দ্র বিশ্বাস জানান, কৃষি বিভাগ যদি আঙুর চাষীদের পরামর্শ ও সহযোগিতা করে তাহলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এই আঙুর বিদেশেও রপ্তানী করা সম্ভব।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, নতুন ফসল হিসেবে সাতক্ষীরায় আঙুরের আবাদ শুরু হয়েছে। সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়া উপজেলায় দুজন প্রাথমিকভাবে আঙুর চাষ শুরু করেছেন। এখানে ২০ থেকে ৮০ প্রকার জাতের আঙুর চাষ হচ্ছে। ভালো উৎপাদন করতে পারলে আমরা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য জেলায় বিক্রি করতে পারব।
আবহাওয়া ও মাটির গুণের ভিত্তিতে সাতক্ষীরার আম ও কুলের যেমন স্বাদ রয়েছে, ঠিক তেমনি আঙুরের স্বাদ যদি আমরা একইভাবে আনতে পারি তাহলে অঙুরেরও ব্যাপক চাহিদা থাকবে। বলেন তিনি।