দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে। যুদ্ধ বন্ধের এই চুক্তি নিশ্চিত হওয়ার পর বিশ্ববাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। খবর আল-জাজিরার।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সই হবে। উভয় দেশ বিষয়টি নিশ্চিত করার পরপরই এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে শেয়ার বাজারগুলোতে ব্যাপক উত্থান দেখা গেছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে এসেছে।
সোমবার (১৫ জুন) সকালে লেনদেনের শুরুতেই জাপানের প্রধান সূচক নিক্কেই ২২৫ এক লাফে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক ৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং তাইওয়ানের তাইএক্স ২ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধান সূচকও প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। নিয়মিত বাজার সময়ের বাইরে থাকা মার্কিন স্টক ফিউচারগুলোতেও ১ থেকে ১ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
এর বিপরীতে, বিশ্বব্যাপী তেলের দামের প্রধান মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৮৩ দশমিক ৪০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ে চিন্তিত থাকা বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বড় ধরনের স্বস্তি পাবে।
রবিবার (১৪ জুন) রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে এই চুক্তির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানান, বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ অবিলম্বে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। জাহাজ কোম্পানিগুলোর উদ্দেশ্যে ট্রাম্প লেখেন, “বিশ্বের জাহাজগুলো, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো! তেল প্রবাহিত হতে দিন!”
পরবর্তীতে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এবং পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদী চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই শান্তি চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
ইরানি সংবাদ সংস্থা ‘মেহর’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা এবং মার্কিন ব্যাংকে অবরুদ্ধ থাকা ইরানের ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইরানি হামলা ও মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে গত চার মাস ধরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ ছিল। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ-এর তথ্যমতে, এর ফলে বাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়।
চুক্তি সম্পন্ন হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস, এমনকি এক বছরও লেগে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিপিং বিশেষজ্ঞরা। মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে সরবরাহ আগের অবস্থায় নিতে সময় লাগবে।
নরওয়েজিয়ান শিপওনার্স মিউচুয়াল ওয়ার রিস্কস ইন্সুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সভেইন রিংবাক্কেন জানান, হাজার হাজার জাহাজ এখনও এই জলপথে আটকা পড়ে আছে। এছাড়া জলপথে যদি মাইন বিছানো থাকে, তবে তা অপসারণ করতেই কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিপিং কোম্পানি সেফসি গ্রুপের চেয়ারম্যান এসভি আনচান এই চুক্তি নিয়ে এখনই অতিরিক্ত আশাবাদী হতে রাজি নন। বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কাগজে কী চুক্তি হয়েছে আর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কী, তা আমাদের দেখতে হবে। মাইন অপসারণের প্রক্রিয়া এবং বীমা কোম্পানিগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।”