জাতীয়

নানা ইস্যুতে উত্তাল জাতীয় সংসদ

বাজেট অধিবেশনের দিন সাধারণত অর্থনীতি, রাজস্ব, মূল্যস্ফীতি কিংবা উন্নয়ন পরিকল্পনাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। কিন্তু রবিবার (১৪ জুন) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বাজেটকে ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে রাজনীতি, বিতর্ক এবং উত্তেজনা। একের পর এক সংবেদনশীল ইস্যুতে বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য এবং প্রতিবাদে কয়েক দফায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ কক্ষ।

অধিবেশনের শুরুতেই কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ ধারায় বিশেষ বিবৃতি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি সংসদকে অবহিত করেন। বিষয়টি নিয়েই যখন সংসদ সদস্যদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তখন তিনি আরো একটি বিশেষ বিবৃতির অনুমতি চান।

সেখানে তিনি ছাত্রশিবিরের বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ জিসান মিয়া প্রধানকে ঘিরে আলোচিত ঘটনার বর্ণনা দেন। কুমিল্লা জেলা পুলিশের তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি দাবি করেন, এক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ, গর্ভধারণ এবং পরবর্তী সময়ে জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটানোর অভিযোগ রয়েছে জিসানের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই সংসদ কক্ষে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

বিরোধী দলের আপত্তি, নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ

বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানান। তার অভিযোগ, কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ ধারার অপপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং বিচারাধীন একটি বিষয় সংসদে এনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “সংসদ কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অভিযুক্ত করার মঞ্চ নয়। যদি কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে থাকেন, তাহলে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। সংসদে এভাবে একতরফা বক্তব্য উপস্থাপন নজিরবিহীন।”

একপর্যায়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়। আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ, টেবিল চাপড়ানো এবং উচ্চস্বরে বাক্যবিনিময়ে কয়েক মিনিটের জন্য কার্যত অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হয়।

পোশাক নিয়ে মন্তব্যে নতুন বিতর্ক জিসান ইস্যুর উত্তাপ তখনও পুরোপুরি কমেনি। এর মধ্যেই অন্য এক সংসদ সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করতে গিয়ে নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক ও পর্দা নিয়ে মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যের পর মুহূর্তেই বিরোধী দলের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

সংসদ কক্ষে আবারও হট্টগোল শুরু হয়। বিরোধী সদস্যরা মন্তব্যটিকে ব্যক্তিগত, অশোভন এবং সংসদীয় রীতিনীতির পরিপন্থী বলে আখ্যা দেন।

ডেপুটি স্পিকার পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে বলেন, “সংসদ জনগণের সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান। এখানে ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা কারো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে মন্তব্যের সুযোগ নেই।”

প্রতিবাদের মুখে ওই সংসদ সদস্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং নিজের বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানান। পরে তা এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

জান্নাতের টিকিট মন্তব্যে নতুন আলোচনা বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার ধর্মীয় বক্তব্যের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জিসান প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “যারা মানুষকে জান্নাতের টিকিটের প্রতিশ্রুতি দেন, তারা কীভাবে এমন অপরাধের সঙ্গে জড়িত হতে পারেন।”

একই বক্তৃতায় তিনি বিরোধী দলের প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটেরও সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, ছায়া বাজেট শুনতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

শিক্ষা নিয়ে উদ্বেগ

অধিবেশনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল পরিকল্পনা এবং মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির কারণে শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী না হলে উচ্চ শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।”

সরকার নতুন কারিকুলাম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়নের চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, এ বছর দেশের ১৮৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি, যা শিক্ষা খাতের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা।

সীমান্ত ইস্যুতে ক্ষোভ ভারত সীমান্তে পুশইন ও সীমান্ত হত্যা নিয়ে উত্থাপিত একটি সাধারণ প্রস্তাব হঠাৎ স্থগিত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান।

তিনি বলেন, “সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নটি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। তাই, বিষয়টি আলোচনার সুযোগ না পাওয়া হতাশাজনক।”

জবাবে ডেপুটি স্পিকার জানান, বাজেট অধিবেশনের সময়সীমা এবং কার্যসূচির চাপের কারণে বিষয়টি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ দেওয়া হবে।

বাজেটে দুই ভিন্ন অবস্থান প্রস্তাবিত ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সুস্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা যায়।

সরকারি দলের সদস্যরা বাজেটকে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণে সহায়ক বলে দাবি করেন। তাদের মতে, অর্থনীতির বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় এটি একটি বাস্তবসম্মত বাজেট।

অন্যদিকে, বিরোধী দলের সদস্যরা বাজেটকে ঋণনির্ভর, উচ্চাভিলাষী এবং সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টিকারী বলে আখ্যা দেন। তারা কর ব্যবস্থার সংস্কার, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানান।

গুরুত্বপূর্ণ দুই স্থায়ী কমিটি: উত্তপ্ত আলোচনা ও হট্টগোলের মধ্যেও সংসদ দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটি গঠন করে। অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ।

দিনশেষে সংসদের কার্যক্রমে যেমন ছিল বাজেট নিয়ে আলোচনা, তেমনই ছিল রাজনৈতিক মেরুকরণ, বিতর্ক এবং তীব্র বাকযুদ্ধ। বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার থেকে জিসান বিতর্ক, পোশাক নিয়ে মন্তব্য থেকে সীমান্ত প্রশ্ন বিভিন্ন ইস্যুতে উত্তপ্ত ছিল জাতীয় সংসদের অধিবেশন।