ঠাকুরগাঁও মুন্সিরহাটে রাস্তার পাশে দেখা মেলে বাটিতে করে সাজানো রয়েছে বোঁটা ছাড়ানো লাল টকটকে পাকা লিচু। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন কোনো মিষ্টির দোকানে লাল মন্ডা সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
লিচু বলতেই সাধারণত আমাদের চোখে ভেসে ওঠে— লাল টকটকে ফলের থোকা, যা কাঁচা পাতার ডালসহ আঁটি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মুন্সিরহাটে দেখা মিলবে সম্পূর্ণ উল্টো এক চিত্র। এখানে রাস্তার পাশে টেবিলে সারি সারি সাজানে থাকে লিচুর বাটি। কোনো ডাল-পালা নেই। এখানে বাটিতে করেই বিক্রি হয় লিচু।
স্থানীয়দের কাছে এটি ‘বাটির লিচু’ বা ‘ঝরা লিচুর বাজার’ নামে পরিচিত। পরিমাণ ও গুণগত মান বিবেচনা করে প্রতি বাটি লিচু মাত্র ৩০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
এই ব্যতিক্রমী বাজার গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে বিশেষ কারণ। মুন্সিরহাটের ঠিক পাশে অবস্থিত অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও বিশাল ‘বড়বাড়ি লিচু বাগান’। বিঘার পর বিঘা জুড়ে বিস্তৃত এই বাগানগুলোতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ লিচুর ফলন হয়। তবে লিচু পাকার এই মৌসুমে প্রায়ই কালবৈশাখী ঝড় বা তীব্র বাতাসে প্রচুর পরিপক্ক লিচু গাছ থেকে মাটিতে ঝরে পড়ে। এছাড়া গাছ থেকে লিচু তোলার সময় অসাবধানতাবশত অনেক লিচু বোঁটা থেকে আলগা হয়ে যায়। যেহেতু বড় পাইকাররা বোঁটা ছাড়া বা ডাল ছাড়া লিচু কিনতে চান না, তাই বাগানের মালিক ও শ্রমিকেরা সেই ঝরে পড়া তাজা লিচুগুলো কুড়িয়ে নেন। পরে সেগুলো নষ্ট হতে না দিয়ে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে দেন। আর সেই লিচুগুলোই ধুয়ে-মুছে সুন্দর করে বাটিতে সাজিয়ে বিক্রি করা হয় এই হাটে।
সরেজমিন বাজারে দেখা যায়, ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখর চারপাশ। কিশোর কিশোরী থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ, বিভিন্ন বয়সের মানুষ এখানে বাটির লিচু নিয়ে বসেছে। ছোটো বাটিগুলোতে ২৫ থেকে ৩০ লিচু থাকে, যা বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ টাকায়। চিনামাটি, প্লাস্টিক কিংবা মেলামাইনের বাটিতে সযত্নে সাজানো থাকে দৃষ্টিনন্দন এ সব লিচু। লিচুর পরিমাণ ও মান বিবেচনায় প্রতিটি বাটি বা লিচুর ভাগা বিক্রি হচ্ছে।
লাল রঙের টি-শার্ট পরা বিক্রেতা আব্দুর রহমান (৪৫) এক বাটিতে বড় সাইজের লিচু উঁচিয়ে ধরে বলেন, ‘‘হামরা এইলাক ঝরা লিচু কহি। বড়বাড়ির বাগান থাকি এইলা কুড়ায় আনা হয়। বোঁটা নাই দেখে বড় পাইকাররা লিবা চায় না, কিন্তু লিচুর সোয়াদ (স্বাদ) একদম বাগানের টাটকা লিচুর মতোই। হামরা বাটি হিসাবে বিক্রি করি। এতে গরিব-দুঃখী ছোট-বড় সবাই নিজের মতো কিনবা পারে। দিনে ভালোই বিক্রি হচে, আলহামদুলিল্লাহ।’’
একটু দূরেই মাথায় গোলাপি ওড়না জড়িয়ে বাটি সাজিয়ে বসে ছিলেন বয়োবৃদ্ধা মোসাম্মৎ মরিয়ম বেগম। তিনি জানান, ‘‘সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই বাজার জমে থাকে। বিশেষ করে ঝড়ের পরের দিনগুলোতে লিচুর আমদানি বেশি হয় এবং দামও ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে থাকে।’’
মুন্সির হাটের এই রাস্তার পাশের বাজারটি এখন শুধু স্থানীয়দের প্রয়োজনেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং ঠাকুরগাঁও শহর থেকে আসা দর্শনার্থীদের জন্য এক দারুণ আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। বিকেল হলেই এখানে মোটরসাইকেল কিংবা রিকশা থামিয়ে লিচু কেনার ধুম পড়ে যায়।
মোটরসাইকেল থামিয়ে তিন বাটি লিচু কিনছিলেন ঠাকুরগাঁও শহরের বাসিন্দা ও পেশায় শিক্ষক রফিকুল ইসলাম (৩৫)। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, ‘‘আমি প্রতি বছরই এই মৌসুমে এখান থেকে বাটির লিচু কিনে বাড়ি ফিরি। বোঁটা নেই বলে অনেকে ভাবতে পারেন এগুলো বাসি বা পচা, কিন্তু আসলে তা নয়। এগুলো ঝড়ে পড়া একদম ফ্রেশ লিচু। বাটিতে সাজানো থাকে বলে আলাদা করে বাছতে হয় না, ঠকারও ভয় নেই। যাদের একবারে বেশি খরচ করে লিচু কেনার সামর্থ্য নেই, তারা সহজে ৫০-১০০ টাকায় এক বাটি কিনে পরিবারের মুখে তুলে দিতে পারেন।’’
রিকশায় যাওয়ার পথে নীল রঙের মাস্ক পরা এক নারী ক্রেতা, মোসাম্মৎ নাজমিন নাহার (২৮) বলেন, ‘‘বাটির লিচুগুলো দেখতে এত সুন্দর লাগে যে না কিনে থাকা যায় না। বাচ্চাদের জন্য দুই বাটি নিলাম, বোঁটা ছাড়ানো হলেও বেশ ভালো আছে। আমার বাচ্চারা লিচু খুবই পছন্দ করে।’’
ঠাকুরগাঁও প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক মনসুর আলী এই বাজার নিয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘‘ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যখন তাদের জমানো ১০-২০ টাকার কয়েন দিয়ে আধ-বাটি লিচু কিনে লাফাতে লাফাতে বাড়ি ফেরে, তখন নিজের শৈশবের স্মৃতিতে পরম তৃপ্তির ছবি ফুটে ওঠে। তাছাড়া বোঁটা না থাকায় এই লিচুগুলো কেনার পর আর আলাদা করে ছাড়ানোর ঝামেলা থাকে না। অনেকে কিনে রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে টপাটপ মুখে পুরে দিতে শুরু করে, যা এই বাজারের এক নিয়মিত ও চেনা দৃশ্য।’’
প্রকৃতির দুর্যোগ যেখানে বাগানিদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, ঠাকুরগাঁওয়ের মুন্সিরহাটের মানুষ যেন সেই ক্ষতিকেই এক নান্দনিক উৎসবে রূপান্তর করেছে। ‘বাটির লিচু’ কেবল একটি সাশ্রয়ী বাজারই নয়, এটি অপচয় রোধের এক দারুণ উদাহরণ এবং নিম্নবিত্ত মানুষের ফল কেনার স্বপ্নপূরণের মাধ্যম।
ঝরে পড়া ফলও যে এভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করতে পারে এবং দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করতে পারে, তা মুন্সিরহাটের এই ব্যতিক্রমী বাজার না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। লাল মণ্ডার মতো সাজানো এই লিচুর বাটিগুলো যেন একাধারে প্রকৃতির উপহার এবং গ্রামীণ মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক।