সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ, দেশ থেকে বিপুল অর্থ পাচার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ, ধর্ষণ ও দুর্নীতির বিচার প্রশ্নে সরকারের অবস্থান— ইত্যাদি ইস্যুতে উত্তপ্ত জাতীয় সংসদ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৬ হাজার ১১৮ কোটি টাকার সম্পূরক বাজেট পাস হলেও জাতীয় সংসদে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দেশের অর্থনীতির চাপ, ব্যাংক খাতের সংকট, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহির প্রশ্ন। বিরোধী ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সমালোচনার মুখে সরকার অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের আশ্বাস দিয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সপ্তম বৈঠকে সম্পূরক বাজেট কণ্ঠভোটে পাস হয়। তবে বাজেটের চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার, ডিসি নিয়োগ এবং নতুন ইউনিয়নের নামকরণ বিতর্ক।
খেলাপি ঋণ ও অর্থনীতি নিয়ে প্রশ্ন
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ভয়াবহভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে অর্থ পাচার, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের সংকট এবং বৈদেশিক ঋণের সুদের চাপ অর্থনীতিকে নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেন, সম্প্রতি বিভিন্ন জেলায় নিয়োগ পাওয়া জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) অধিকাংশই রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে ডিসিদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চান।
পাবনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য আলী আছগারও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে মিতব্যয়িতা ও আর্থিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আয় অনুযায়ী ব্যয়ের পরিকল্পনা করা গেলে সম্পূরক বাজেটের প্রয়োজন অনেকাংশে কমে আসত।
সরকারের ব্যাখ্যা
সমাপনী বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি জানান, মূল বাজেটের তুলনায় সংশোধিত বাজেটে সরকারি নিট ব্যয় ২ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে রাখা সম্ভব হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধ, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের আসল ও সুদ মওকুফ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণের কারণে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হয়েছে।
ধর্ষণ ও দুর্নীতিতে কোনো ভেদাভেদ নয়
দুর্নীতি দমন কমিশনের বাজেট ও ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দুর্নীতির যেমন ছোট-বড় কোনো সংজ্ঞা নেই, তেমনি ধর্ষণের ক্ষেত্রেও ছোট-বড় কোনো বিভাজন হতে পারে না। তিনি বলেন, সব ধর্ষণই সমান অপরাধ। একটি ঘটনার বিচার হবে আর আরেকটির বিচার হবে না এমন দ্বৈত মানদণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। সব অপরাধের ক্ষেত্রেই সমান বিচার নিশ্চিত করা হবে।
দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতার কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতে লুটপাট ও রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া ঋণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ বিদেশে চলে গেছে। এসব অর্থ ফিরিয়ে আনতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউনিয়নের নাম নিয়ে বিতর্ক
সংসদে নতুন ইউনিয়নের নামকরণ নিয়েও বিতর্ক হয়। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ অভিযোগ করেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকায় গঠিত কয়েকটি ইউনিয়নের নাম তার পরিবারের নামের সঙ্গে মিল রেখে রাখা হয়েছে। তার বক্তব্যে উঠে আসে ‘মীরবাড়ি’, ‘দিগন্ত’ ও ‘সীমান্ত’ নামের ইউনিয়নের প্রসঙ্গ। তিনি দাবি করেন, এর মধ্যে দুটি নাম প্রতিমন্ত্রীর দুই সন্তানের নামের সঙ্গে মিলে যায়।
জবাবে মীর শাহে আলম বলেন, ইউনিয়নগুলোর নামকরণ সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার ভিত্তিতে করা হয়েছে। স্থানীয় জনগণের মতামত এবং গণশুনানির মাধ্যমে নামগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, এটি কেবলই কাকতালীয় যে আমার সন্তানদের নামের সঙ্গে ইউনিয়নের নামের মিল রয়েছে। সরকারি গেজেটে কোনো পারিবারিক পরিচয় ব্যবহার করা হয়নি।
দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনা নিয়ে আলোচনা
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে দিল্লির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা বসিয়ে রাখার ঘটনা সংসদে উত্থাপন করেন জামায়াতের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি বলেন, যথাযথ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পরও কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, তা তদন্ত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংসদে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
স্পিকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন।
প্রশ্নোত্তর পর্বে যা জানালেন মন্ত্রীরা
প্রশ্নোত্তর পর্বে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর জানান, আপাতত সরকারি খাতে নতুন কোনো পাটকল স্থাপনের পরিকল্পনা নেই। বরং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করে পাটশিল্পের সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৪টি সরকারি পাটকল ইজারা দেওয়া হয়েছে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন জানান, ঢাকা মেডিকেলসহ দেশের সাতটি বিভাগীয় ল্যাবে এ পর্যন্ত ৪১ হাজার ৫৫৫টি নমুনার ডিএনএ প্রোফাইলিং সম্পন্ন হয়েছে। নতুন আইনে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের মামলায় ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সড়ক পরিবহন, সেতু ও রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত বৈধ মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো চিহ্নিত করে সংস্কার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, পুরোনো রেললাইন নিলামে বিক্রি না করে বাঁধ সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণে পুনঃব্যবহার করা হচ্ছে।
সম্পূরক বাজেট পাসের মধ্য দিয়ে দিনের কার্যসূচি শেষ হলেও খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন নিয়ে সংসদে ওঠা প্রশ্নগুলো দেশের অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থার সামনে বিদ্যমান বড় চ্যালেঞ্জগুলোকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।