‘ভ্যালু ফর মানি’, ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ কিংবা ‘প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ এ ধরনের জটিল পরিভাষা গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বুঝলেও সাধারণ মানুষ জানতে চান তাদের ওপর করের চাপ কতটা বাড়ল এবং এর প্রভাব কী হবে বলে মন্তব্য করেছেন ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. ইলিয়াস মোল্লা।
তিনি বলেন, “জনগণের কাছে সহজবোধ্য ভাষায় বাজেটের সুফল-প্রভাব তুলে ধরা জরুরি।”
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এর সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. ইলিয়াস মোল্লা এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মধুখালীর জনগণের প্রতি ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থনের কারণেই তাদের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন।”
ড. ইলিয়াস মোল্লা বলেন, “স্বাধীনতার পর উপস্থাপিত বাজেটগুলোর মধ্যে এবারের বাজেট অন্যতম দীর্ঘ। ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেটে ৩৪৬টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। বাজেটে অনেক সুন্দর ও সাহিত্যসমৃদ্ধ ভাষা ব্যবহার করা হলেও সাধারণ মানুষের কাছে অনেক বিষয় দুর্বোধ্য থেকে যায়।”
তিনি বলেন, “মানুষ জানতে চায় তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বাড়বে, করের বোঝা কতটা চাপবে। কিন্তু বাজেটে এমন অনেক পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন।”
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, “জিডিপির ২ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ধীরে ধীরে তা ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা আশাব্যঞ্জক। এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং গতবারের তুলনায় প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।”
তবে বাজেটের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের যোগফল এবং মোট বাজেটের মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার অমিল রয়েছে। ওই অর্থ কোন খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে, তা বাজেট নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।”
এ বিষয়ে তিনি অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
শিক্ষা খাতে ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ড. ইলিয়াস মোল্লা। তিনি বলেন, “শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি জরিপে দেখা গেছে, ১০০ টাকা বরাদ্দের মধ্যে মাত্র ১০ টাকা সরাসরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যয় হয়, বাকি ৯০ টাকা প্রশাসনিক খাতে চলে যায়। এতে শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি ‘মাথাভারী প্রশাসনিক কাঠামো’ তৈরি হয়েছে।”
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অর্থ না পৌঁছালে শিক্ষার মান কীভাবে উন্নত হবে এবং শিক্ষার্থীরা কীভাবে উপকৃত হবে।”
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বৈচিত্র্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “বর্তমানে দেশে ১৩ ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর বাইরে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, কেজি স্কুল এবং কওমি মাদ্রাসার মতো প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হবে, সে বিষয়ে বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা নেই।”
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “দ্বৈত কর্তৃত্ব ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। এ অবস্থার অবসান প্রয়োজন।”
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। প্রথমত, ‘সবার জন্য শিক্ষা’ নিশ্চিত করতে একটি পৃথক আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক সংকট দূর করতে দ্রুত শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান। তৃতীয়ত, মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ও কার্যকর নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।
ড. ইলিয়াস মোল্লা বলেন, “বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের স্বার্থে দ্রুত এসব পদে যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। তিনি এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেন।