মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়ে জাতীয় সংসদে আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাওলানা নুরুল আমিন। তিনি বলেন, “মে মাসের বেতন এখনো না পাওয়ায় অনেক মাদ্রাসা শিক্ষক চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। এমনকি একজন শিক্ষক বেতন না পাওয়ায় তার মায়ের চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।”
মঙ্গলবার (১৬ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে অধ্যাপক মাওলানা নুরুল আমিন বলেন, “মা একটি অক্ষরের একটি শব্দ। কিন্তু পৃথিবীর সব মধুর অনুভূতি যেন এই শব্দের মধ্যেই জড়িয়ে আছে। এই সংসদে এমন অনেকেই আছেন যাদের মা নেই, আমারও মা নেই।”
তিনি বলেন, “সংসদে আসার সময় এক শিক্ষক ফোন করেছিলেন। ওই শিক্ষক জানিয়েছেন, বেতন না পাওয়ায় তিনি তার মায়ের চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারছেন না।”
নুরুল আমিন বলেন,“সরকারি চাকরিজীবীরা প্রতি মাসের এক বা দুই তারিখের মধ্যেই বেতন পেয়ে থাকেন। কিন্তু ঈদ চলে গেল, আজ মাসের ১৬ তারিখ, অথচ মাদ্রাসার কোনো শিক্ষক মে মাসের বেতন পাননি। আমার প্রশ্ন হলো, যদি আমরা মাসের শুরুতেই বেতন দিতে পারি, তাহলে তাদের ক্ষেত্রেও তা কেন সম্ভব হবে না?”
তিনি বলেন, “আমার মা নেই, ওই শিক্ষকের মাও একদিন পৃথিবীতে থাকবেন না। কিন্তু তিনি যেন অন্তত এই সান্ত্বনা পান যে তিনি তার মায়ের চিকিৎসা করতে পেরেছিলেন।”
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করে তিনি দ্রুত বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি মাদ্রাসা সরকারি করার বিষয়টিও বিবেচনার অনুরোধ করেন।
এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বক্তব্যের জবাবে বলেন, “জাতীয় সংসদ সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধির আলোকে পরিচালিত হয়। সংসদের ৩৫০ জন সদস্যই নির্বাচিত প্রতিনিধি। কেউ সরাসরি, কেউ পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। সবারই বক্তব্য দেওয়ার অধিকার রয়েছে, তবে তা নির্ধারিত নিয়ম মেনেই করতে হবে।”
স্পিকার বলেন, “বাংলাদেশে সমস্যার শেষ নেই।এর মধ্যেও সংসদ একটি নির্দিষ্ট আইন-কানুন ও বিধি অনুসারে পরিচালিত হয়। পয়েন্ট অব অর্ডার কোন বিষয়ে এবং কখন উত্থাপন করা যাবে, তা কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্ধারিত রয়েছে।”
তিনি উল্লেখ করেন,“এর আগে সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান যে পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপন করেছিলেন, তা চলমান কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল এবং বিধিসম্মত ছিল। কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতনের বিষয়টি মানবিক ও গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হওয়ার পর বা যথাযথ নোটিশের মাধ্যমে উত্থাপন করা অধিকতর উপযুক্ত ছিল।”
স্পিকার বলেন, “আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলেছেন। গরিব কর্মচারী ও শিক্ষকদের দুর্দশার কথা বলেছেন। কিন্তু সবকিছুরই একটি নির্ধারিত সময় আছে। সাধারণত প্রশ্নকাল শেষ হওয়ার পর পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপনের সুযোগ থাকে।”
তিনি বলেন, “বাজেট অধিবেশন চলাকালে সাধারণত পয়েন্ট অব অর্ডার গ্রহণ করা হয় না, কারণ এ সময় দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হয় এবং এটি সংসদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন।”
স্পিকার সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, “যখন ইচ্ছা দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিয়ে দেওয়া সংসদের রীতি নয়। কিছু মনে করবেন না। ভবিষ্যতে সময় অনুসারে কথা বলবেন। আপনারা দাঁড়ানোর অনেক বৈধ কারণ রয়েছে, তবে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুসরণ করতে হবে।”
তিনি বলেন, “সংসদ মূলত নোটিশভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। কোনো বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করতে হলে লিখিত নোটিশ দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে নোটিশ দেওয়া হলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা উপযুক্ত আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনার সুযোগ থাকত।”
শেষে স্পিকার সংসদ সদস্যদের ভবিষ্যতে কার্যপ্রণালি বিধি মেনে সংসদে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান।