ক্যাম্পাস

সিট সংকটে ভোগান্তি পাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবিপ্রবি) আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিটের জন্য একাধিকবার আবেদন করেও অনেক শিক্ষার্থী হলে আসন পাচ্ছেন না। ফলে কেউ গণরুমে, আবার কেউ বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে মেসে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

গণিত বিভাগের ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইজাজুল হোসেন হলে সিট পাওয়ার জন্য তিনবার আবেদন করেছেন। দেড় বছর ধরে গণরুমে অবস্থান করলেও এখনো কোনো সিট পাননি।

ইজাজুল জানান, হলের ভাইভায় গণরুমে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করার পরও তাকে সিট দেওয়া হয়নি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “গণরুমে থাকার মতো পরিবেশ নেই। এখানে ঠিকমতো পড়াশোনা করা যায় না, নিরাপত্তারও অভাব রয়েছে। রান্নার ব্যবস্থা নেই, আর একাধিকবার চুরির ঘটনা ঘটলেও হল প্রশাসন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।”

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম বলেন, “আমি চারবার হলে সিটের জন্য আবেদন করেছি। বাবা না থাকায় পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। নিয়মিত খরচ জোগানো সম্ভব হয় না। তাই বড় ভাইয়ের একটি বেডে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি।”

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের ৫ জুন মাত্র ১৮০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পাবিপ্রবির যাত্রা শুরু হয়। তখন স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকায় পাবনার টিচার্স ট্রেনিং সেন্টারে (টিটিসি) কার্যক্রম পরিচালিত হতো। ২০১০ সালে ৩০ একর জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জায়গা বরাদ্দ পায় বিশ্ববিদ্যালয়টি। পরে ২০১৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়।

২০১৮ সালে ৪৮০ কোটি টাকার ‘দ্বিতীয় উন্নয়ন প্রকল্প’ শুরু হলেও নানা বিতর্ক ও ধীরগতির কারণে প্রকল্পটির কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, আগের প্রকল্পের কাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বুঝে না পাওয়ায় নতুন হল বা একাডেমিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি অনুষদের ২১টি বিভাগে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। বিপরীতে আবাসিক সিট রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭৫০টি, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৫০ শতাংশ। ফলে প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৫ জনকে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস বা ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে।

হলভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতা হলে ৫০০টি, জুলাই-৬ ও গণতন্ত্র হলে এক হাজারটি করে এবং মাতৃভাষা হলে ২৫০টি সিট রয়েছে। বর্তমানে স্বাধীনতা ও মাতৃভাষা হলে একটি করে গণরুম চালু আছে। ৫ আগস্টের পর স্বাধীনতা হলের একটি গণরুম বন্ধ করা হলেও এখনো দুটি হলে গণরুম সংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে আবাসন সুবিধা বাড়েনি। অতীতে সিট বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগও ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দ্বিতীয় উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুটি নতুন হল চালু হলেও আবাসন সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি।

স্বাধীনতা হলের গণরুমে থাকা শিক্ষার্থী দ্বীপ সাহা বলেন, “আর্থিক সমস্যার কারণে গণরুমে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু এখানে ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের নিরাপত্তা নেই। প্রায়ই চুরির ঘটনা ঘটে।” জুলাই-৬ হলের শিক্ষার্থী তাসনিম রহমান জানান, “জানুয়ারিতে হলে ওঠার সময় সব লিফট সচল ছিল। এখন মাত্র দুটি লিফট চালু আছে। ফলে নিচে নামতে বা ওপরে উঠতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। মাঝেমধ্যে ওয়াশরুমেও পানির সংকট দেখা দেয়।”

আরেক শিক্ষার্থী ফাতিহাতুল রিমঝিম বলেন, “ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে ক্লাস করতে আসতে যানজট ও পরিবহন সংকটের কারণে সময় এবং খরচ—দুটোই বেড়ে যায়।”

স্বাধীনতা হলের প্রভোস্ট মো. আল ফাহাদ ভূঁইয়া বলেন, “গণরুম নিয়ে আমাদেরও উদ্বেগ রয়েছে। প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে সবাইকে রুমে সিট দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আশা করি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে।”

গণতন্ত্র হলের প্রভোস্ট লায়লা আরজুমান্দ বানু বলেন, “ক্যাম্পাসে নতুন ভবন নির্মাণের মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তাই অবকাঠামো সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট সমাধানে জমি অধিগ্রহণই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে। এটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া হলেও দ্রুত বাস্তবায়ন হলে আবাসন সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছি।”