দুই বছরের বেশি বন্ধ থাকার পর খুলতে যাচ্ছে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে অবস্থিত সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর। এখন শুধু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনুমোদনের অপেক্ষা।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকাল ১১টায় নৌবন্দরটি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু করার জন্য সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম বজলুর রশীদ। সভায় ভার্চুয়ালী বক্তব্য রাখেন- বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন। এছাড়াও, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরের কমকর্তা ও ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় নৌবন্দর চালু করা নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা তাদের মতামতও দেন। তবে, সবাই ছিলেন এই বন্দর চালুর পক্ষে।
নৌ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফজলে এলাহী বলেন, “নৌপথে দস্যুতা ও বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করি। সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালু হলে সেখানে আমরা থানা স্থাপন করব। বর্তমানে ওই উপজেলায় আমাদের ফাঁড়ি আছে, সেটিকে থানাতে রূপান্তর করা হবে।”
এনবিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়, এখানে বন্দর তৈরিতে বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে মাদকও আছে। এর আগে সেখানে কোনো স্থাপনা ছিল না। এখন সবকিছুই হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম বজলুর রশীদের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়
পাথর আমদানিকারক আমিনুল ইসলাম বলেন, “সড়কের চেয়ে নদী পথে পণ্য আনা নেওয়ায় খরচ কয়েকগুণ কম। অন্য দেশ থেকে জাহাজে পাথর আনতে কয়েকগুণ বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। ভারতের মায়া বন্দর থেকে পাথর নিয়ে আসলে খরচ অর্ধেকের নিচে নেমে আসবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। এই রুটে ৮০ লিটার তেলে একটি জাহাজ যাওয়া-আসা করতে পারবে।”
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হাসেন আলী বলেন, “সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালু হলে রাজশাহী অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা বেশ উপকৃত হবেন। সোনামসজিদ বন্দরের পাশাপাশি এই বন্দর ব্যবসায়ীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে। শুধু আমদানি নয়, রপ্তানি করা যাবে এই বন্দর দিয়ে। বেশ কিছু পণ্য আমরা রপ্তানি করব। এতে আমাদের কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে।”
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ইসরাত জাহান বলেন, “আমি সোমবার বন্দরটি পরিদর্শন করেছি। সেখানে সড়ক প্রশস্তের কাজ করছে পৌরসভা। এছাড়াও বন্দরের জন্য যা যা প্রয়োজন সবকিছুই আছে। ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য রাখার জন্য সড়কের পাশে জমিও ভাড়া নিচ্ছেন।”
বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, “বন্দরটি চালু করতে যা যা প্রয়োজন সবই করা হয়েছে। এখানে নতুন করে স্থাপনাও তৈরি করা হয়েছে। বন্দরের জন্য জমি ২৫ বছরের ইজারা নেওয়া হয়েছে। পদ্মার বেশ কিছু স্থানে ড্রেজিংও করা হয়েছে জাহাজ চলাচলের জন্য। এখন এনবিআর অনুমোদন দিলে এই বন্দর পূর্ণাঙ্গরূপে চালু করা সম্ভব হবে।”
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম বজলুর রশীদ বলেন, “বন্দরটি চালু হলে এখানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। ফলে অপরাধও কমে আসবে। আমরা বন্দর চালুর বিষয়ে ইতিবাচক। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এই বন্দর চালু করা হবে। এতে সবাই উপকৃত হবেন। এখন শুধু বাকি এনবিআরের অনুমোদন। তারা অনুমোদন দিলে বন্দরের কার্যক্রম শুরু করা যাবে।”
গত শুক্রবার (১৬ জুন) সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের সদস্য (পরিকল্পনা ও পরিচালন) ও যুগ্ম সচিব মো. সাজেদুর রহমান। এসময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন।
ছয় দশক আগে রাজশাহীর সুলতানগঞ্জ থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ধূলিয়ান নৌপথে বাণিজ্য চলত। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধসহ অভ্যন্তরীণ নানা কারণে নৌপথ ও নদীবন্দর বন্ধ হয়ে যায়। সেই নৌপথে আবারো বাণিজ্য চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয় দীর্ঘ ৫৯ বছর পর ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। চালু হওয়ার পর মাত্র ১০ দিন চলে কার্যক্রম। এরপর থেকে এই পোর্ট বন্ধ হয়ে আছে।
২০২৫ সালের ১ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের নৌপরিবহন উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর পরিদর্শনকালে অবকাঠামো উন্নয়ন করে দ্রুত এটি চালুর নির্দেশনা দেন। কিন্তুতা বাস্তবায়ন হয়নি।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জের সঙ্গে ভারতের মুর্শিদাবাদের মায়া নৌবন্দরের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। এই নৌপথ চালু হলে ভারত থেকে সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল, পাথর, মার্বেল, খনিজ বালু ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী বাংলাদেশে আমদানি সহজ হবে এমনটি মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ থেকে বস্ত্র, মাছ, পাট ও পাটজাত পণ্য ছাড়াও বিভিন্ন কৃষিপণ্য ভারতে যাবে।