ভ্রমণ

প্যারিস ও প্যারিসের বাইরে ১৯৮৪

আমরা লোয়ার নদীর এপার থেকেই ওপারের টিলার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শ্যাটু আম্বোয়াজের রাজসিক উপস্থিতি অনুভব করলাম। সেই অনুভবে মিশে থাকল দা ভিঞ্চির প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধা আর শিল্পরসিক ও পৃষ্ঠপোষক সম্রাট প্রথম ফ্রাঁসোয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা।

দা ভিঞ্চি মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে আসার সময় স্কট বলল, এই ভিজিট রাউন্ড অফ করার জন্য আমরা এখন ক্লো লুসের কোনো একটা ক্যাফে বা ব্রাসারিতে বসে লাঞ্চ করব। আমি অদূরে বয়ে যাওয়া লোয়ার নদীর দিকে তাকিয়ে বললাম, ওই ছবির মতো সুন্দর নদীতীরে কোনো ক্যাফে নেই? স্কট হেসে বলল, এবার তুমি শুধু সেন্টিমেন্টাল নও, রোমান্টিকও বটে। তারপর গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল, থাকাটাই স্বাভাবিক। চলো, গ্রামের সেন্টারে যাই। খোঁজ নিয়ে দেখা যাক।

ক্লো লুস গ্রামের কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, বেশ কয়েকটা ক্যাফে আর ব্রাসারি রয়েছে সেখানে। সবগুলোর নামের সঙ্গেই শিল্প জড়িত। একটা ক্যাফে তো রাখঢাক না করে ‘ক্যাফে লিওনার্দো’ নামকরণ নিয়ে ট্যুরিস্টদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। আরেকটার নাম ‘ক্যাফে দে আর্ট’। তাকে টেক্কা দিয়ে পাশেই নাক খানিকটা উঁচু করে জানান দিচ্ছে সে ‘মাস্টার আর্ট’। এমনকি ‘মুড ক্যাফে সেরামিক’ সাইনবোর্ডেই ঘোষণা দিয়ে বলছে, তার ভেতরে ‘ক্রিয়েটিভ ভাইব’ রয়েছে। আমরা যখন রিভারসাইড ক্যাফের কথা জিজ্ঞেস করলাম, কফিশপের মালিকরা কিছুটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই বলল, আছে তবে সেখানে গাড়ি যায় না, হেঁটে যেতে হবে। শুনে আমরা নিরুৎসাহিত না হয়ে যেতে উদ্যত হতেই তারা মুখ বেজার করল।

পায়ে হেঁটে নদীতীরে পৌঁছাতে আমাদের বিশ মিনিট লাগল। আমরা ব্রুনোকে রেখে এলাম গ্রামের কোনো একটা ক্যাফে বা ব্রাসারিতে লাঞ্চ করে সেখানকার মালিকদের কনসোলেশন প্রাইজ দেওয়ার জন্য। ব্রুনোর লাঞ্চের খরচ স্কটই দেবে। তবে সে তাকে অতিরিক্ত মদ্যপান করতে নিষেধ করল, কেননা তাকে গাড়ি চালাতে হবে।

আমি ঢালু পথে নদীতীরে নামতে নামতে বললাম, ব্রুনো কি খুব মদ খায়? স্কট বলল, শুধু ব্রুনো কেন? সব ফরাসিই মদ খায় পানির মতো। ইট ইজ দেয়ার ন্যাশনাল বেভারেজ। কোনো মিলই মদ ছাড়া সম্পূর্ণ হয় বলে তারা মনে করে না। লোয়ার নদীতীরে এসে হাঁটতে হাঁটতে আমি নদীর দিকে তাকালাম। ওই তীর ক্রমে খাড়া হয়ে কয়েকটা টিলা তৈরি করেছে। একটা টিলার ওপরে শ্যাটু আম্বোয়াজ দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। নদী বেশ খরস্রোতা। মাঝেমধ্যে সাদা চর মুখ উঁচিয়ে স্রোত ঘুরিয়ে দিয়ে যেন নকশা এঁকেছে। কান পেতে রাখলে নদীর স্রোতের ভেজা, তরল শব্দ শোনা যায়। এপ্রিলের আকাশে সূর্য এখন প্রবল প্রতাপে কিরণ ছড়াচ্ছে, কিন্তু নদীর বুক ছুঁয়ে যে বাতাস আসছে, তার স্পর্শ আরামদায়কভাবে শীতল।

আমরা প্রথমে ‘কে দ্য জেনারেল দ্য গল’ ক্যাফে দেখতে পেলাম। নাম দেখে রাজনীতির গন্ধ পেয়ে স্কট পাশের ‘ল্য কেয়ার অঁ ফুঁই আম্বোয়াজ’ ব্রাসারিতে ঢুকল। ব্রাসারিটি একেবারে নদীতীরে; ভেতরে বসে বাইরের চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়। অন্য সব বাড়িঘরের মতো এই ব্রাসারিও পাথরখণ্ড দিয়ে তৈরি। নদী থেকে আসা বাতাস আর পাথরের শীতলতা মিলিয়ে ভেতরে বেশ ঠান্ডা আবহ।

স্কট বলল, কী খাবে? কোনো বিশেষ পছন্দ? আমি বললাম, তুমিই ঠিক করো। স্কট মেনু দেখে বলল, লোকাল কুইজিন। ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকার মানুষ তাদের রেসিপি নিয়ে গর্ব করে। মাছ-মাংস সব জায়গাতেই এক, কিন্তু ইনগ্রেডিয়েন্ট ব্যবহারের তারতম্য স্বাদে ভিন্নতা আনে। এই ইনগ্রেডিয়েন্ট স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় বলে অন্য এলাকার পাচকরা নকল করতে পারে না।

আমার ক্ষিধে পেয়েছে। আমি স্কটকে বললাম, বুঝলাম। এখন অর্ডার দাও তো দেখি। স্কট বুঝতে পেরে মেনু দেখে গারসোঁ—ওয়েটারকে বলল, কান্ট্রি ব্রেড, গোট চিজ, ভেজিটেবল অ্যান্ড রোস্ট বিফ ফর টু। ওয়েটার জানতে চাইল, খাবারের সঙ্গে কী ওয়াইন দেবে। স্কট তাকে বলল, আমরা একটু পর ভিনইয়ার্ডে যাচ্ছি। সেখানে ওয়াইন টেস্টিং হবে। তাই এখন পেরিয়ের ওয়াটারই যথেষ্ট। ওয়েটার বিজ্ঞের মতো বলল, যে খাবারের অর্ডার দিয়েছেন, তার পূর্ণ স্বাদ পেতে হলে ওয়াইন অপরিহার্য।

স্কট বলল, কী সাজেস্ট করতে চাও তুমি? ওয়েটার অভিজ্ঞ ভঙ্গিতে বলল, রিজিওনাল রোজে অথবা লোকাল তুরেন রেড ওয়াইন। ওয়েটার চলে যাওয়ার পর স্কট বলল, এ দেশে না চাইলেও মদ খেতে হয়। পার্ট অব দ্য রিচুয়াল।

তিন আমরা আবার এ-১০ নম্বর হাইওয়ে দিয়ে যাচ্ছি। সূর্য এখন পশ্চিমে নেমে গেছে। রোদের কড়া তেজ নেই। ব্রুনো গাড়ির স্কাইরুফ খুলে দিয়েছে। বাতাস নাতিশীতোষ্ণ। দুপাশে ঢেউখেলানো সবুজ মাঠ। দূরে গ্রামের বাড়িঘর আর গির্জার চূড়া দেখা যাচ্ছে।

একটু পর আমরা তুর নামের শহর পার হলাম। স্কট বলল, এটা এই এলাকার সবচেয়ে বড় শহর। এরপর এলো লোয়ার নদীতীরবর্তী লঁজে নামের ছোট শহর। কিছু পর দক্ষিণে দেখা গেল আরেকটা ছোট শহর—সাইনবোর্ড অনুযায়ী তার নাম শিনোঁ। স্কট দেখে বলল, ফেমাস ওয়াইন টাউন। আমি অবাক হয়ে বললাম, কী করে জানলে তুমি? স্কট বলল, ভিনইয়ার্ড কেনার আগে এসব এলাকা চষে বেরিয়েছি। পনেরো মিনিট পর আমরা সওমুর পৌঁছালাম। পাশেই লোয়ার নদী। নদীতীর ঘেঁষে চলে গেছে ভিনইয়ার্ড। শেষ প্রান্তে ছোট আকারের একটা শ্যাটু।

গাড়ি থেকে নেমে স্কট বলল, দিস ইজ মাই ভিনইয়ার্ড। আর ওই যে দেখছ শ্যাটু, সেটাও আমার। আমি তাকিয়ে দেখলাম, এই এলাকায় আরও ভিনইয়ার্ড রয়েছে। দূরে গ্রামের ঘরবাড়ি দেখা যায়। গ্রামীণ রাস্তা আর নদীতীরবর্তী এলাকায় সারি দিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো যে পপলার, তা আমার এখন জানা হয়ে গেছে।

কাঠের গেট খুলে আমরা দুজন ভেতরে ঢুকলাম। ব্রুনো গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে আমাদের পেছনে এলো। দুদিকে মাচার ওপর আঙুরগাছ লতিয়ে উঠেছে। ছোট আকারের আঙুর দেখা যাচ্ছে। স্কট কয়েকটা খেয়ে বলল, এসিডিক। বড় হলে সুগার কনটেন্ট বাড়বে। নাও, তুমিও খেয়ে দেখ। ওয়াইন না—ফ্রুট। তোমার খেতে আপত্তি হওয়ার কথা না।

আমি হাঁটতে হাঁটতে মাচা থেকে অপরিপক্ব আঙুর খেতে থাকলাম। আমার বেশ ভালো লাগছে। আমি খেতেই থাকি। দেখে স্কট মুচকি হাসে। আমি স্কটকে জিজ্ঞাসা করি, এই বাগানটাই কিনলে কেন? স্কট বলল, এটা খুব বড় না, আবার ছোটও না। আমার বাজেটের সঙ্গে মিলে গেছে। কিন্তু বড় কারণ হলো—এই বাগানের মাটি বোর্দো এলাকার মতো, যার জন্য অ্যাপেলাসিওঁ-এ ‘বোর্দো’ লেবেল ব্যবহার অনুমোদিত হবে।

পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব: প্যারিস ও প্যারিসের বাইরে ১৯৮৪