লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় শিশু নন্দিনী রায় (৭) হত্যার ঘটনায় দায় স্বীকার করেছেন গ্রেপ্তার হওয়া যুবক বিধান চন্দ্র (২২)। এদিকে, ঘটনাটি সুষ্ঠু তদন্তের জন্য জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান।
নিহত নন্দিনী রায় আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামের নলিনী কান্তের মেয়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত সোমবার বিকেলে নিখোঁজ হয় নন্দিনী। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে নিজ বাড়ির পাশের একটি ভুট্টা ক্ষেতের গর্ত থেকে নন্দিনীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ নিজেদের হেফাজতে নেয়।
এ ঘটনায় এলাকাবাসী ঘাতক সন্দেহে বিধান চন্দ্রকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা ‘মব’ সৃষ্টি করে বিধানের বাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে এবং তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। এতে পুলিশ বাধা দিলে বিক্ষুব্ধ জনতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চড়াও হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান, পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, জেলা পরিষদ প্রশাসক এ.কে.এম মমিনুল হক এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমামসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে আসামিকে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। স্থানীয়দের হামলায় পুলিশ সুপার ও ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। বিক্ষুব্ধ জনতা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের গাড়িসহ সরকারি ৭টি গাড়ি ভাঙচুর করে।
এ ঘটনার জেরে মঙ্গলবার আদিতমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাজমুল হককে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তীতে বুধবার (১৭ জুন) আদিতমারী থানার নতুন ওসি হিসেবে সদর থানার ওসি (তদন্ত) নাজমুস সাকিব সজিবকে পদায়ন করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, নিহত নন্দিনীর বাবা নলিনী কান্ত বাদী হয়ে বিধান চন্দ্র, তার বাবা রনজিৎ এবং মা সাবিত্রীকে আসামি করে আদিতমারী থানায় হত্যা মামলা করেন। সেই মামলায় বিধান ও তার বাবাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বুধবার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও পরবর্তীতে আদালতেও বিধান রায় হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
এদিকে, পুরো ঘটনা তদন্তে দুটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক। এই কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে আহ্বায়ক করে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করেছেন পুলিশ সুপার। তাদের আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, “গ্রেপ্তার বিধান চন্দ্র শিশু নন্দিনীকে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। পারিবারিক দ্বন্দ্বের ক্ষোভ থেকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। আদালতে বিধান চন্দ্র স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ায় নতুন করে রিমান্ডের আবেদন করা হয়নি। শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি না- তা আসামির অস্বীকৃতির পরও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও চূড়ান্ত তদন্তের পরেই নিশ্চিত হওয়া যাবে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।”
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, “হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা এবং সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার অভিযোগে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি মামলার প্রস্তুতি চলছে।”