আন্তর্জাতিক

ভারতে বিজেপি নেতাসহ তিনজনকে জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যা

ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যে দেশটির ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক নেতাসহ অন্তত তিনজনকে জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় একটি পক্ষের সঙ্গে বালু উত্তোলন নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ওই তিনজনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার (১৭ জুন) দিবাগত রাতে রাজ্যের কোরিয়া জেলার সোনহাত থানার নওগাইন গ্রামে এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে। একাধিক ট্রাকের মাঝে একটি ফরচুনার এসইউভি গাড়িকে আটকে রেখে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আগুন নেভার পর দেখা যায়, স্থানীয় বিজেপি নেতা ও সাবেক জনপদ পঞ্চায়েত সভাপতি ভারত সিং ওরফে লাল্লা সিংসহ তিনজন মারা গেছেন।

নিহত বিজেপি নেতার পরিবার বলেছে, বালুমহাল পরিচালনা সংক্রান্ত একটি বিরোধের মীমাংসা করতে গিয়েছিলেন ভারত সিং। তবে তিনি আসলে সুপরিকল্পিত ফাঁদে পা দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বজনরা।

পুলিশ এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় চারজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন- অক্ষত ত্রিপাঠী, বিশাল ত্রিপাঠী, সত্যপ্রকাশ ত্রিপাঠী এবং মন্নু ত্রিপাঠী। বাকিদের খোঁজে তল্লাশি চলছে। এ ঘটনায় ৯ জনের নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যার চেষ্টার মতো গুরুতর ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এই সহিংসতার পর পুরো কোরিয়া জেলাজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকার বালু উত্তোলনের চুক্তি ভারত সিংয়ের পরিবার পেয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, এরপর থেকেই সোনহাত, কৈলাশপুর, তেলিমুদা, বেলিয়া এবং ছিংগুরা এলাকায় বালু পরিবহন এবং এর সঙ্গে যুক্ত ‘অবৈধ’ অর্থ আদায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র বিরোধ শুরু হয়। ভারত সিংয়ের পক্ষ এবং আরেক বিজেপি নেতা মনোজ ত্রিপাঠীর পরিবারের মধ্যে এই বিরোধ কয়েক মাস ধরে চলছিল।

বৈকুণ্ঠপুরে বালু পরিবহনের জন্য ত্রিপাঠী পরিবারের বেশ কিছু টিপার ট্রাক ছিল। বালু তোলার নিয়ন্ত্রণ ও পাওনা টাকা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ আরো তীব্র হয়। একপর্যায়ে এই ব্যবসায়িক বিরোধ রূপ নেয় আধিপত্য বিস্তার ও হুমকির লড়াইয়ে।

মঙ্গলবার রাতে এই সংঘাত সবচেয়ে নৃশংস রূপ ধারণ করে।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ভারত সিং ও তার সহযোগীরা যে ফরচুনার গাড়িতে ছিলেন, সেটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলা হয়। অভিযোগ উঠেছে, গাড়ির সামনে এবং পেছনে ট্রাক দাঁড় করিয়ে পালানোর সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পরপরই গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

ভারত সিং গাড়ির ভেতরেই জ্যান্ত পুড়ে মারা যান। এই হামলায় নিহত অন্য দুজন হলেন বীরেন্দ্র সিং এবং নগেন্দ্র সিং। হামলায় গুরুতর আহত মায়াঙ্ক সিং নামের আরেকজন হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার মাথা ও মুখে গুরুতর আঘাত লেগেছে।

ভারত সিং একসময় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ভূপেশ বাঘেল সরকারের আমলে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন।

এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ভারত সিং প্রায়ই হুটার লাগানো ফর্চুনার এসইউভিতে চলাফেরা করতেন। স্থানীয়দের মতে, এটি ওই অঞ্চলের বালু সিন্ডিকেটের ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রতীক ছিল।

নিহতের পরিবার এই ঘটনার সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে বলেছে, এই হামলাটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তাধীন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুরেশা চৌবে জানান, প্রাথমিক তদন্তে ত্রিপাঠী ও ভারত পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের বালুমহাল নিয়ে বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। এরই মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য অভিযুক্তরা পলাতক এবং তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে।

সোনহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিনোদ পাসওয়ানও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, একপক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন ভারত সিং, অন্যপক্ষে ছিল ত্রিপাঠী পরিবার। এর আগেও এই বিরোধ নিয়ে মামলা হয়েছিল।

ওসি জানান, ভারত কিছুদিন অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ রেখেছিলেন, তবে সম্প্রতি তা আবার শুরু হয়। এই ঘটনার কয়েক দিন আগে মায়াঙ্ক সিং ত্রিপাঠী পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়েছিলেন বলে একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছিল।

এদিকে, এ ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। 

স্থানীয় বিধায়ক ভাইয়ালাল রাজওয়াড়ে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, কোরিয়া জেলার ইতিহাসে এমন ভয়াবহ ঘটনা নজিরবিহীন। দুই পক্ষের মধ্যে আগের বিরোধের কথা জানা থাকলেও, পরিস্থিতি এতটা নৃশংস রূপ কেন নিল তা তদন্তের পরেই পরিষ্কার হবে।

সাবেক বিধায়ক গুলাব কামরো এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তির দাবি করেছেন।

এদিকে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাই বলেছেন, কোরিয়ার ঘটনাটি তার নজরে আনা হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত চলছে ও যারা দোষী প্রমাণিত হবে তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।