একটি আত্মঘাতি গোল কেড়ে নিয়েছিলো একটি তরতাজা প্রাণ। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে শিরোপা জিতেছিলো ব্রাজিল। সেলেসাওদর সাম্বায় মুখোর ছিলো দেশটির প্রতিটা রাজপথ। ব্রাজিল যখন উৎসবের রঙে রঙিন, তখন কলম্বিয়ায় লেখা হয়েছিলো এক কলঙ্কিত অধ্যায়।
সালটা ১৯৯৪। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপকে ঘিরে কলম্বিয়া ফুটবল দলকে নিয়ে ছিলো ফুটবল বিশ্বে তুমুল উন্মাদনা। বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনাকে ৫-০ গোলে হারিয়ে তারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। টানা ২৫ ম্যাচ অপরাজিত থাকা এই দলটিকে নিয়ে খোদ ফুটবল কিংবদন্তি পেলে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে, কলম্বিয়াই হতে পারে এবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। বুকভরা স্বপ্ন আর কোটি ভক্তের প্রত্যাশার চাপ নিয়ে কলম্বিয়া পা রেখেছিল আমেরিকার মাটিতে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় সেই রঙিন স্বপ্ন খুব দ্রুতই এক ভয়ানক দুঃস্বপ্নে রূপ নিতে শুরু করে।
গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই রোমানিয়ার কাছে ৩-১ গোলে হেরে বসে কলম্বিয়া। এই আকস্মিক পরাজয় পুরো দলের ওপর মানসিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তখনকার কলম্বিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল ও সহিংস। পুরো দেশ জুড়েই ছিল মাদক চক্র, ড্রাগ কার্টেল এবং অবৈধ জুয়াড়িদের একচ্ছত্র আধিপত্য। ফুটবল সেখানে স্রেফ একটা খেলা ছিল না, বরং অপরাধ চক্রের অর্থ খাটানো এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। প্রথম ম্যাচ হারার পর থেকেই খেলোয়াড় এবং কোচদের কাছে অজ্ঞাতনামা স্থান থেকে প্রাণনাশের হুমকি আসতে থাকে।
এমন এক চরম আতঙ্ক ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে ২২ জুন স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে মাঠে নামে কলম্বিয়া। ম্যাচের বয়স তখন মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিট। আমেরিকার মিডফিল্ডার জন হার্কসের একটি ক্রস ঠেকাতে গিয়ে কলম্বিয়ার রক্ষণভাগের ভরসা, ২৭ বছর বয়সী ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার স্লাইড করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বলটি তার পায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে সরাসরি কলম্বিয়ার নিজেদের জালেই জড়িয়ে যায়। একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম ট্র্যাজিক এই আত্মঘাতী গোলের ধাক্কা সামলাতে পারেনি কলম্বিয়া। ম্যাচটি তারা ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় এবং টুর্নামেন্ট থেকে তাদের বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায়।
দেশজুড়ে ক্ষোভ আর জুয়াড়িদের অর্থ হারানোর উন্মাদনার মাঝে বন্ধুরা এসকোবারকে পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমেরিকায় থেকে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত বিনয়ী ও ইতিবাচক মানসিকতার এই ফুটবলার নিজের দেশের মানুষকে ভালোবাসতেন। তিনি মেডেলিনের একটি স্থানীয় পত্রিকায় কলাম লিখে দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছিলেন, “জীবন এখানেই শেষ নয়, আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।” এই বিশ্বাস নিয়ে তিনি নিজের শহর মেডেলিনে ফিরে আসেন।
কিন্তু নিয়তি তার জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। দেশে ফেরার মাত্র ১০ দিন পর, ২ জুলাই রাতে মেডেলিনের একটি নাইটক্লাবে বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে যান এসকোবার। সেখানে ড্রাগ কার্টেলের সাথে যুক্ত গ্যাঁলোন ভাইদের সাথে এসকোবারের কথাকাটাকাটি ও তর্কাতর্কি হয়। রাত প্রায় তিনটার দিকে এসকোবার যখন পার্কিং এলাকায় নিজের গাড়িতে গিয়ে বসেন, তখন গ্যাঁলোন ভাইদের গাড়িচালক ও বডিগার্ড হুমবার্তো কাস্ত্রো মুনিয়োজ এসকোবারকে লক্ষ্য করে পরপর ছয়টি গুলি করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ফুটবল ধারাভাষ্যকারদের অনুকরণ করে খুনি প্রতিটি গুলি করার সময় উপহাসের ছলে ‘গোল’ শব্দটি উচ্চারণ করেছিল। রক্তাক্ত এসকোবারকে হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ধারণা করা হয়, বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বিদায়ের কারণে জুয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থ হারানো অপরাধচক্রের আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন তিনি।
এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো ফুটবল বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলো তখনো চলছিল, কিন্তু কলম্বিয়াবাসীর কাছে ফুটবল তখন তার সব আনন্দ হারিয়ে ফেলেছে। এসকোবারের শেষকৃত্যে মেডেলিনের রাস্তায় প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার সাধারণ মানুষ চোখের জল ফেলে তাদের প্রিয় ফুটবলারকে বিদায় জানাতে সমবেত হয়েছিলেন। খুনিকে পরবর্তীতে ৪৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও, কলম্বিয়ার বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মাত্র ১১ বছর পর সে কারাগার থেকে মুক্তি পায়। খুনি মুক্তি পেলেও, ফুটবল ইতিহাসের এই নির্মম ট্র্যাজেডি আজো কোটি ফুটবল ভক্তের হৃদয়ে গভীর ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে।