সারা বাংলা

বিশ্বকাপের রঙিন বাজারে পতাকা বিক্রেতা উসমান 

বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই বদলে যায় দেশের চেনা দৃশ্য। অলিগলি, বাজার, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম— সবখানেই ছড়িয়ে পড়ে ফুটবল উন্মাদনা। কারও ঘরে উড়ে আর্জেন্টিনার পতাকা, কারও ছাদে ব্রাজিলের। সেই উন্মাদনার রঙ ছড়িয়ে দিতে গাজীপুরের কালীগঞ্জের পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এক পতাকা বিক্রেতা। কাঁধে বিশ্বের নানা দেশের পতাকা, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে জায়গা করে আছে একটাই পতাকা- বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। 

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে কালীগঞ্জ থানা গেটের সামনে এবং বিকেলে রিফাত গার্মেন্টসের ৪ নম্বর গেট এলাকায় দেখা মেলে উসমান আলীর। কাঁধভর্তি বিভিন্ন দেশের পতাকা নিয়ে তিনি হাঁটছেন এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন বিশ্বকাপের ছোট্ট এক চলমান প্রদর্শনী।

শেরপুরের নালিতাবাড়ীর সন্তান উসমান আলী বর্তমানে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন গাজীপুরের টঙ্গীতে। বছরের বেশিরভাগ সময় তিনি ফেরি করে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন। তবে জাতীয় দিবস কিংবা বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো বড় আয়োজন সামনে এলে তার ব্যবসার প্রধান পণ্য হয়ে ওঠে বিভিন্ন দেশের পতাকা।

বিশ্বকাপ ঘিরে এবারও তিনি সংগ্রহ করেছেন নানা দেশের পতাকা। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে। কথা বলতে বলতে একসময় আবেগী হয়ে ওঠেন উসমান।

তিনি বলেন, “অনেক দেশের পতাকা বিক্রি করি, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি বাংলাদেশের পতাকা। জাতীয় পতাকা মানুষের হাতে তুলে দিতে পারলে আলাদা একটা তৃপ্তি কাজ করে। সত্যি বলতে, লাভের কথা চিন্তা করলে জাতীয় পতাকা বিক্রি করে বড় কিছু পাওয়া যায় না। তবু এটা আমার কাছে ব্যবসার চেয়ে দায়িত্ব বেশি।”

তার মতে, দেশের পতাকা শুধু কাপড়ের একটি টুকরো নয়, এটি স্বাধীনতা, আত্মত্যাগ ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক।

পাঁচ সদস্যের সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে। প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে পথে পথে ঘুরে যা আয় করেন, তা দিয়ে সংসার চলে। জীবনসংগ্রামের ব্যস্ততার মধ্যেও দেশের প্রতি ভালোবাসা তাকে আলাদা করে চেনায়।

বিশ্বকাপ নিয়ে কথা উঠতেই উসমান জানান, আগের তুলনায় এবার ফুটবল উন্মাদনা কিছুটা কম। আগে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই মানুষ পতাকা কিনতে ভিড় করত। এবার সেই চাপ নেই। তবে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার চাহিদা এখনো সবচেয়ে বেশি। 

তিনি আরও জানান, ৪৮ দলের এই বিশ্বকাপে নতুন অনেক দেশের নাম শুনছেন মানুষ। ফলে সেসব দেশের পতাকার বাজার এখনো তৈরি হয়নি।

“যারা এবার নতুন দলগুলোকে দেখছে, তাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত আগামী চার বছরে ওই দেশের সমর্থক হয়ে যাবে। তখন সেই দেশের পতাকারও চাহিদা বাড়বে।” বলেন উসমান।

কোন দলের সমর্থক তিনি-এমন প্রশ্নে মুচকি হেসে কৌশলী উত্তর দেন এই পতাকা বিক্রেতা। “আমি যদি আর্জেন্টিনার কথা বলি, ব্রাজিলের সমর্থকরা মন খারাপ করবে। আবার ব্রাজিল বললে আর্জেন্টিনার ভক্তরা রাগ করবে। তাই আমি নিরপেক্ষ থাকি। আমার সমর্থনের কথা আমার মনই জানে।”

এরপর হাসতে হাসতে যোগ করেন, “তবে আর্জেন্টিনার খেলার দিন মনে হয় পৃথিবীর বাকি সবাই এক দলে, আর অন্য পাশে শুধু আর্জেন্টিনা!”

বিশ্বকাপের উন্মাদনা শুধু পতাকা বিক্রেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও।

কালীগঞ্জ আরআরএন পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাশেদ্বীন সরকার জানায়, তার প্রিয় দল আর্জেন্টিনা।

“মেসির জন্যই আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসি। ম্যারাডোনার খেলা সরাসরি দেখিনি, কিন্তু তার গল্প ও ভিডিও দেখেছি। মেসি আর ম্যারাডোনার কারণে আর্জেন্টিনা আমাদের কাছে শুধু একটি দল নয়, একটি আবেগ।” বলে সে।

স্থানীয় কাপড় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান মিজান বলেন, বিশ্বকাপ মানেই তাদের জন্য বাড়তি ব্যবসার সুযোগ।

“চার বছর পরপর বিশ্বকাপ আসে। আমরা জার্সি, পতাকা ও ক্রীড়াসামগ্রী বিক্রির জন্য অপেক্ষা করি। তবে এবার আগের মতো বিক্রি হচ্ছে না। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল ছাড়া অন্য দলের জার্সির চাহিদা খুবই কম।” বলেন তিনি।

পুরাতন ব্যাংক মোড়ের শাকিল স্পোর্টসের স্বত্বাধিকারী শাকিল হোসেন মনে করেন, বিশ্বকাপ মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়। তার ভাষায়, “ভিন্ন দলের সমর্থক হলেও সবাই শেষ পর্যন্ত ফুটবলের সৌন্দর্য উপভোগ করে। এটাই বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর দিক।”

অন্যদিকে তুহিন স্পোর্টসের স্বত্বাধিকারী তুহিন হোসেন বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে বিশ্বকাপ শুধু খেলা নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানারও একটি সুযোগ।

বিশ্বকাপ শেষ হবে, নতুন চ্যাম্পিয়নের হাতে উঠবে সোনালি ট্রফি। ধীরে ধীরে কমে যাবে জার্সি-পতাকার বিক্রি। শহরের মোড়গুলোও ফিরে যাবে স্বাভাবিক চেহারায়।

কিন্তু তারপরও হয়ত কালীগঞ্জের কোনো ব্যস্ত সড়কে দেখা যাবে উসমান আলীকে। কাঁধে জীবিকার সংগ্রাম, মুখে হাসি, আর হৃদয়ে লাল-সবুজের প্রতি অবিচল ভালোবাসা নিয়ে তিনি হাঁটবেন নিজের পথেই।

পৃথিবীর বহু দেশের পতাকা বিক্রি করলেও উসমান আলীর কাছে সবচেয়ে প্রিয় পতাকা একটাই- বাংলাদেশ। আর সেই ভালোবাসার রঙ লাল-সবুজ।