পরিবেশ

পরিবেশ রক্ষায় নাগরিকের মামলা করার অধিকার চান গবেষক-পরিবেশবিদরা

পরিবেশ ধ্বংস, নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকদের সরাসরি আদালতে মামলা করার সুযোগ তৈরি করতে বিদ্যমান আইন সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন গবেষক, পরিবেশবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, বর্তমান আইনি কাঠামোয় পরিবেশগত ক্ষতির বিরুদ্ধে নাগরিকদের সরাসরি আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ সীমিত, যা পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুক্রবার (১৯ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। ‘অস্তিত্বের সংকটে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ: উত্তরণের উপায় অনুসন্ধান’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটি।

সংবাদ সম্মেলনে লেখক ও নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, “দেশের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বিদ্যমান আইনকে যুগোপযোগী করা জরুরি। তিনি পরিবেশ সংক্রান্ত আইন সংশোধনের মাধ্যমে নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।”

তিনি অভিযোগ করেন, “সরকারের নদী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে ‘নদীখনন’ না বলে ‘খালখনন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তার দাবি, কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহল ও ভূমি সংশ্লিষ্ট স্বার্থগোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করতেই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, “আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিবণ্টন ইস্যুতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক জলপ্রবাহ বিষয়ক কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করা প্রয়োজন। এ সনদ ভাটির দেশগুলোর অধিকার সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।”

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি পরিকল্পনাবিদ মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “নগর এলাকায় জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে গ্রামীণ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে।”

তিনি দেশের নদ-নদীর সংখ্যা, গভীরতা, আয়তন ও সীমানা সম্পর্কিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানান। পাশাপাশি জলাশয় দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ, পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং কৃষিজমি, মাঠ, পার্ক ও নদী রক্ষায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণার দাবি জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সবুর আহমেদ বলেন, “দেশে মাটিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তার মতে, অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।”

বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. আবদুল জলিল শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পরিবেশবিষয়ক মৌলিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, “দূষণের কারণে দেশের অনেক নদীর পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।”

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “গত কয়েক দশকে দেশের প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের উল্লেখযোগ্য অবক্ষয় ঘটেছে। শিল্পায়ন ও নগরায়নের প্রভাবে পরিবেশের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।”

সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার, প্রাকৃতিক কৃষি গবেষক দেলোয়ার হোসেনসহ বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংগঠনের মুখপাত্র ইবনুল সাঈদ রানা।