সাতসতেরো

খামার বাড়িতে ফলের ঘ্রাণে জিভে জল, স্বাদের খোঁজে ক্রেতার ভিড়

রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (কেআইবি) পাশের রাস্তা দিয়ে এগোতেই পাকা ফলের সুঘ্রাণ নাকে এসে লাগল। ঘ্রাণের টানে কেআইবি চত্বরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল ফলের মেলা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চাষীরা নিজস্ব বাগানের ফল নিয়ে এসেছেন। সুসজ্জিত স্টলে ফলগুলো বিক্রি হচ্ছে। 

খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আয়োজনে ৬৭টি স্টলে তিন দিনব্যাপী জাতীয় ফল মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আজ শনিবার ফল মেলার শেষ দিন। ফলে  ক্রেতাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকে সপরিবারে এসেছেন ফল কিনতে, অনেকে এসেছেন প্রদর্শনীর দুর্লভ ফলগুলো একনজর দেখতে; সন্তানদের চেনাতে। অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা চেনা-অচেনা, জনপ্রিয় আর বিরল সব ফলের সমাহার দেখতে ও স্বাদ নিতে মেলা প্রাঙ্গণে আসছেন মানুষ। ‌

এবারের জাতীয় ফল মেলার মূল আকর্ষণ নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী ‘ঘোড়াশাল’ আনারস আর জাপানি জাতের বিশ্বখ্যাত ‘মিয়াজাকি’ আম। এ ছাড়া হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি আর ব্যানানা ম্যাঙ্গোর স্টলগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় ছিল বেশি। অনেকেই চাহিদা মতো ফল নিয়ে বাসায় ফিরছেন।

জাতীয় ফল মেলা থেকে পছন্দের ফল নিতে এসেছেন ধানমন্ডির বাসীন্দা গৃহিণী তাহমিনা আক্তার মিলি। তিনি বলেন, ‘‘বাজারে এখন ফরমালিন বা কেমিক্যালের ভয়ে বাচ্চাদের ফল কিনে দিতে ভয় পাই। এখানে সরাসরি চাষিদের স্টল থেকে আম, কাঁঠাল, জাম ও আনারস কিনলাম। ফলগুলো দেখে যেমন সতেজ লাগছে, তেমনি ঘ্রাণেই বোঝা যাচ্ছে এগুলো খাঁটি। দামটাও বাজারের চেয়ে বেশ সাধ্যের মধ্যে। আমি প্রতিবছর এই মেলা থেকে ফল নেই। এই মেলাটি তিন দিনের না হয়ে সাত দিনের হলে ভালো হয়। কারণ ঢাকায় মানুষ সহজে এমন ফরমালিন ছাড়া ফল পায় না।’’

অনেকে আমার মতো পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পাকা ফলের  সুঘ্রাণে মেলার ঢুকে পড়েছেন। এমনই একজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাসিম সিকদার। তিনি বলেন, ‘‘আমি আসলে এই রাস্তা দিয়ে ফার্মগেটের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম। কেআইবি চত্বরের বাইরে পর্যন্ত পাকা আমের এমন সুন্দর ঘ্রাণ আসছিল যে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। ভেতরে এসে তো চোখ ছানাবড়া! এত জাতের ফল একসাথে এর আগে কখনো দেখিনি। পকেটে খুব বেশি টাকা ছিল না, তাও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে খাওয়ার জন্য কিছু আম্রপালি আর একটা ঘোড়াশাল আনারস কিনলাম। সত্যি বলতে, ফলের ঘ্রাণ আমাকে টেনে এনেছে।’’

আরেক ক্রেতা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসীন্দ মো. মোসলেহ উদ্দিন খানকে দেখা গেল আমের ক্যারেট নিয়ে রিকশায় জন্য অপেক্ষা করতে। প্রতি বছরই এই মেলার জন্য তিন উন্মুখ হয়ে থাকেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি প্রতি বছর ফল মেলার অপেক্ষায় থাকি। এখানে বাজারের চেয়ে কম দামে ভালো মানের ফল পাওয়া যায়। এবারও বেশি করে আম কিনলাম, কিছু বাসায় নিয়ে যাব আর বাকিটা আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের দেব। মেলা থেকে ফল কেনার আনন্দই আলাদা।’’ 

মেলায় নরসিংদী থেকে আনারস নিয়ে এসেছেন নরসিংদী ফল ভান্ডারের রাসেল আফরাদ। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের নরসিংদীর আনারসের স্বাদ আর সুঘ্রাণ অতুলনীয়। স্থানীয় বাজারে তো এর ব্যাপক নামডাক, এবার এই মেলার মাধ্যমে ঢাকার বড় বাজারে আমাদের এই ঐতিহ্য আরও ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছি। ক্রেতাদের ভালো সাড়া পাচ্ছি। আনারস মুখে দিয়েই তারা তৃপ্তির হাসি হাসছেন।’’

মেলায় আলহামদুলিল্লাহ এগ্রো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির সহকারী পরিচালক মুরাদ শেখ বলেন, ‘‘আমরা দিনাজপুর থেকে বিভিন্ন বিদেশি জাতের আম নিয়ে এসেছি। আমাদের ‘থ্রি টেস্ট’ আম কাঁচা অবস্থাতেও মিষ্টি এবং খোসাসহ খাওয়া যায়, আর পাকলে তো স্বাদ আরও খোলতাই হয়। আমাদের আম প্রায় শেষ হয়ে গেছে। আজ মেলার শেষ দিন, তাই সকাল থেকেই ক্রেতাদের চাপ বেশি। বাজারে যে ব্যানানা ম্যাঙ্গো ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, আমরা তা মাত্র ১০০ টাকায় দিচ্ছি। লাভ কম হলেও ক্রেতাদের মুখে খাঁটি ফলের স্বাদ তুলে দিতে পারছি, এটাই আমাদের সার্থকতা।’’

আমের বাজারে এবার আভিজাত্যের ছোঁয়া এনেছে বদু মিয়ার কৃষি খামারে ‘মিয়াজাকি’ আম। হবিগঞ্জের বাগানে উৎপাদিত এই জাপানি জাতের আম প্রতি কেজি ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চাহিদাও আকাশচুম্বী। এই খামারের স্বত্বাধিকারী বদু মিয়া বলেন, ‘‘আজকে মেলার শেষ দিন তাই ২০০ টাকা কেজিতে ছেড়ে দিচ্ছি। এবার মেলাতে এই জাতের আম ভালো সাড়া ফেলেছে।’’