সারা বাংলা

সাঘাটায় যমুনা তীররক্ষা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম

গাইবান্ধার সাঘাটায় যমুনা নদীর ভাঙন রোধে নেওয়া প্রায় ১০১ কোটি টাকার তীররক্ষা প্রকল্প এখন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও ঠিকাদারদের গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তদারকির দুর্বলতা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়সারা কাজের কারণে মুন্সীরহাট এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের জিও ব্যাগ, দুর্বল সিসি ব্লক, পুরাতন ছেঁড়া জিও ম্যাট, খোয়ার নামে মাটি মিশ্রিত রাবিশ এবং নিম্নমানের বালু ব্যবহার করে প্রকল্প ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়েছে। 

ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রকল্পটি ব্যর্থ হলে শুধু মুন্সীরহাট বাজার নয়, মুন্সীরহাট উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, শত শত বসতভিটা এবং বিস্তীর্ণ আবাদি জমি যমুনার গর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে যমুনা নদীর ডান তীর রক্ষায় সাঘাটা ইউনিয়নের মুন্সীরহাট এলাকায় চারটি প্যাকেজে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্যাকেজ-১ এ ২৫ কোটি ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩১১ দশমিক ৫১ মিটার, প্যাকেজ-২ এ ২৬ কোটি ৪২ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩২৭ মিটার, প্যাকেজ-৩ এ ২৪ কোটি ৩৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৯৭ মিটার এবং প্যাকেজ-৪ এ ২৪ কোটি ৯৯ লাখ ৫২ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৯৫ মিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ চলছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, আলমগীর হোসেন স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে কয়েকটি প্যাকেজের দায়িত্ব নিয়েছেন। এরপর থেকে অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের মাত্রা বেড়ে গেছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, নদীতীরে স্লোপ তৈরি করে জিও ম্যাট বিছানোর পর বালু ও ব্রিকস চিপসের স্তরের ওপর ব্লক ডাম্পিংয়ের কাজ চলছে। কিন্তু সেখানে নতুন ম্যাটের পরিবর্তে পুরাতন ও ছেঁড়া ম্যাট ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক স্থানে রাবিশ ও মাটি মিশ্রিত উপকরণের ওপর ব্লক ফেলা হচ্ছে। নদীর তীরে পড়ে থাকা অসংখ্য জিও ব্যাগে নিম্নমানের বালু ও মাটি ভরাটের দৃশ্যও দেখা গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীভাঙন রোধে ভারী ও টেকসই সিসি ব্লক ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে নিম্নমানের ব্লক ব্যবহার করা হচ্ছে। যমুনার তলদেশে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়েও মানা হচ্ছে না কোনো নিয়মনীতি। পুরো কাজেই দায়সারা মনোভাব স্পষ্ট।

মুন্সীরহাট বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইবনে সাঈদ বলেন, “বন্যা আসলেই তড়িঘড়ি করে কিছু কাজ দেখায়, আর শুকনো মৌসুমে কাজ বন্ধ থাকে। কাজের মান খুবই খারাপ। কথা বললেও কোনো লাভ হয় না।”

নদীতীরবর্তী বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, “প্রকল্পের কাজ ঠিকমতো হলে আমাদের ঘরবাড়ি রক্ষা পেত। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে কাজে গাফিলতি করা হচ্ছে। এখন আমরা সবাই আতঙ্কে আছি।”

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললেই মামলা ও হয়রানির ভয় দেখানো হয়। ফলে অধিকাংশ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পান না। তাদের দাবি, পাউবোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের রহস্যজনক নীরবতা ঠিকাদারদের অনিয়মকে আরো উৎসাহিত করছে।

প্রকল্প এলাকায় সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাজের সাইনবোর্ড পর্যন্ত লাগানো হয়নি। এতে প্রকল্পের তথ্য গোপন করে দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় দায়িত্বরত কোনো কর্মকর্তা কিংবা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে পাওয়া যায়নি।

তবে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “মুন্সীরহাট এলাকার কাজ কিছুটা দেরিতে শুরু হয়েছে, তবে কাজের গতি ঠিক আছে। নিম্নমানের কাজ হওয়ার সুযোগ নেই। নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।”