অর্থনীতি

৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন শর্ত বহালের দাবি বিটিএমএর

ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন (ভ্যালু এডিশন) শর্ত প্রত্যাহারের প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।

তারা বলছে, এই শর্ত বাতিল করা হলে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বাড়বে এবং দেশীয় বস্ত্রশিল্প কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে।

শনিবার (২০ জুন) রাজধানীর গুলশান ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএর নেতারা এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, সাবেক পরিচালক রাজীব হায়দার, সাবেক সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন এবং বিজিএপিএমইএর সভাপতি মো. শাহরিয়ার।

বিটিএমএ বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের সিদ্ধান্ত স্থানীয় সুতা ও কাপড় উৎপাদন শিল্পের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে।

সংগঠনটির মতে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। তাই বিদ্যমান ৩০ শতাংশ শর্ত বহাল রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে তা আরো বৃদ্ধি করার বিষয় বিবেচনা করা উচিত।

সংবাদ সম্মেলনে বস্ত্রশিল্পের সুরক্ষায় সরকারের কাছে চারটি দাবি তুলে ধরে বিটিএমএ।

প্রথম দাবি, ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত বহাল রাখতে হবে। সংগঠনটির মতে, এতে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ অব্যাহত থাকবে এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

দ্বিতীয় দাবি, বস্ত্র খাতের করপোরেট করহার কমিয়ে ১২ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানানো হয়। বিটিএমএর ভাষ্য, বর্তমানে পোশাক রপ্তানিকারকদের করহার ১২ শতাংশ হলেও প্রাথমিক বস্ত্র খাতের কার্যকর করহার প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশ, যা বৈষম্যমূলক। তারা ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বস্ত্র খাতের জন্য ১২ শতাংশ করহার বহাল রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

তৃতীয় দাবি, পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার আমদানির ওপর প্রস্তাবিত ৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। বিটিএমএর মতে, বিশ্ববাজারে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও বাংলাদেশ এখনও মূলত তুলাভিত্তিক পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। এ অবস্থায় কৃত্রিম তন্তুর কাঁচামালের ওপর শুল্ক আরোপ উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে।

চতুর্থ দাবি, রপ্তানির নগদ সহায়তার ওপর আরোপিত উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। যদিও প্রস্তাবিত বাজেটে এ কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে, তবুও বর্তমান তারল্য সংকট বিবেচনায় সাময়িকভাবে তা শূন্য শতাংশ করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কথা বলেছে। তবে এই অর্থ কোন খাতে, কীভাবে এবং কোন নীতিমালার ভিত্তিতে বিতরণ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো রূপরেখা পাওয়া যায়নি।”

তিনি বলেন, “যেসব খাতে চাহিদা কম বা উৎপাদন সক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে, সেখানে পরিকল্পনাহীন প্রণোদনা কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। বরং উৎপাদনমুখী ও সংকটে থাকা শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।”

বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার সুতা আমদানি করা হয়েছে, যার বড় অংশ দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব ছিল। সংগঠনটির দাবি, ২০১৯ সালের পর থেকে ২৩৪টি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেক কারখানা বর্তমানে সক্ষমতার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে উৎপাদন করছে।

এ কারণে বস্ত্র খাতকে প্রণোদনা প্রদানের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান বিটিএমএ নেতারা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিকস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিক, চামড়াজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, মোটরসাইকেল, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী খাত ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা পেয়ে থাকে।

সরকার বলছে, রপ্তানি বহুমুখীকরণে সহায়তা দিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, মূল্য সংযোজনের শর্ত তুলে দেওয়া হলে স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার কমে যাবে এবং দেশীয় শিল্প আরো বড় প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে।