ফিলাডেলফিয়ার সবুজ গালিচায় যখন ব্রাজিলের হলুদ জার্সিধারীরা মাঠে নামল, তখন তাদের কাঁধে ছিল মরক্কোর বিপক্ষে সেই হতাশাজনক ড্রয়ের গ্লানি। সেলেসাওদের ছন্দহীন ফুটবলের মাঝে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, সাম্বার সেই চিরচেনা ধার কোথায়? ঠিক সেই মুহূর্তে মঞ্চে আবির্ভাব ঘটল ম্যাথিউস কুনিয়ার। ফিলাডেলফিয়ার রাতটি যেন কেবলই রূপকথা লেখার জন্য সাজানো হয়েছিল তার নিজের পায়ে।
এতদিন যাকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের উইং ধরে ক্ষিপ্র গতিতে ছুটতে দেখে অভ্যস্ত ছিল ফুটবল বিশ্ব, কার্লো আনচেলত্তি তাকেই দাঁড় করিয়ে দিলেন আক্রমণের একেবারে কেন্দ্রে। উইংয়ের চেনা চিলতে সীমানা ছেড়ে কুনিয়া যখন সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ডের বিশাল গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিলেন, তখন অনেকেই হয়তো সংশয়ে মেতেছিলেন। কিন্তু কুনিয়া জানতেন, এই সংশয় ভাঙার মোক্ষম সুযোগ এটাই। মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে বেঞ্চে বসে থাকার যে চাপা জেদ বুকের ভেতর পুষে রেখেছিলেন, তা যেন বারুদ হয়ে জ্বলে উঠল হাইতির বিপক্ষে।
ম্যাচের শুরু থেকেই প্রথাগত স্ট্রাইকারদের মতো গোলবক্সে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেননি কুনিয়া। বরং মাঝমাঠ পর্যন্ত নেমে এসে খেলা তৈরি করছিলেন, বলের জোগান দিচ্ছিলেন রাফিনিয়া ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে। তার এই গতিশীল মুভমেন্ট হাইতির রক্ষণভাগকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত করে দেয়। আর সেই সৃজনশীলতার হাত ধরেই আসে ম্যাচের প্রথম গোল। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ বুনে হাইতির ডিফেন্ডার হ্যানেস ডেলক্রোয়ার প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে যখন বল জালে জড়ালেন, তখন গ্যালারিজুড়ে শুধুই কুনিয়ার নাম। এটি শুধু একটি গোল ছিল না, এটি ছিল উইঙ্গার থেকে একজন জাত স্ট্রাইকার হিসেবে তার রাজকীয় রূপান্তরের ঘোষণা।
প্রথম গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হলো কুনিয়া-ম্যাজিকের দ্বিতীয় অঙ্ক। দুর্বল হাইতিয়ান রক্ষণভাগের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে এক চিলতে ফাঁক গলে চিতার গতিতে বক্সে ঢুকে পড়লেন তিনি। এরপর বাঁ পায়ের এক জোরালো, নিখুঁত শটে পরাস্ত করলেন প্রতিপক্ষ গোলরক্ষককে। দুই গোলের এই অবিশ্বাস্য প্রদর্শনীতে ম্যাচ তখন ব্রাজিলের মুঠোয়। কুনিয়ার তৈরি করে দেওয়া সেই মনস্তাত্ত্বিক সুবিধার ওপর দাঁড়িয়েই পরে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র দলের তৃতীয় গোলটি করেন।
এই ম্যাচটি ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের স্ট্রাইকার সংকটের আকাশে যেন এক ঝলক আশার আলো। কুনিয়ার পজিশনিং ও বুদ্ধিদীপ্ত মুভমেন্ট ভিনিসিয়ুস ও রাফিনিয়ার জন্য মাঠে যে অফুরন্ত জায়গা তৈরি করে দিয়েছিল, তাতেই প্রাণ ফিরে পেয়েছিল সেলেসাওদের আক্রমণভাগ। যদিও হাইতির মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই জয়কে অনেকে সহজ মনে করতে পারেন, তবে ব্রাজিলের জার্সিতে কুনিয়ার এই ঝলক দলটির নতুন এক দিগন্তের সূচনা করেছে।