মহাসিন আলী, মেহেরপুর : বানরের ডাক্তার ডাক্তার খেলা। রোগ নির্ণয়ে ডাক্তার যেমনটা করেন, এই বানর অনেকটা তা-ই করে। পথেঘাটে সচরাচর বানরের যে খেলা দেখা যায়, এই খেলা তার ব্যতিক্রম। বানরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে রোগী দেখার।
তবে অভিযোগ আছে, বানরের প্রভু এমরান হোসেন (৩২) এভাবে রোগী দেখার নামে লোকজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকেন এবং তাবিজ-কবচ দেন।
বানরের ডাক্তার ডাক্তার খেলার সংলাপ এ রকম :
দর্শক : তোমার বানর খেলা দেখাবে বুঝি ?
বানরের প্রভু এমরান : না স্যার। সে রোগ নির্ণয় করে। বিনিময়ে ১০ টাকা করে নেয়। যদি সে রোগ নির্ণয় করতে রাজি থাকে তবেই টাকা ধরে; অন্যথায় ধরে না।
দর্শক : আচ্ছা! তোমার বানর কোন মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করেছে? তা ডাক্তারি যখন পাস করেছে তখন রাস্তায় কেন ? সরকারি চাকরি কিংবা ক্লিনিক খুলে বসে থাকলে তো অনেক রোজগার হতো?
এমরান : স্যার লজ্জা দেবেন না। বানর বনের পশু হলেও সে সবকিছু বোঝে। আসুন স্যার দেখুন! সে যার চিকিৎসা করে টাকা নিতে চাইবে; আমি কেবল তার টাকাই ধরি। নইলে টাকা ধরি না। আর টাকা ধরলে বানর আমাকে কামড়ে দেবে। আমার জামাকাপড় ছিঁড়ে দেবে।
বানরের ডাক্তার ডাক্তার খেলার এই দৃশ্য মেহেরপুর শহরের বাসস্ট্যান্ড পাড়ার জনবসতি গলির। ওই পাড়ার বাসিন্দা ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র হিরোক দর্শকদের মাঝে দাঁড়িয়ে ১০ টাকা নিয়ে বানরের সামনে মেলে ধরে। বানর সে টাকা নেয় না।
এ সময় বানরের প্রভু এমরান বলেন, ‘দেখুন স্যার, আমার বানর টাকা নেবে না। তবে ডাক্তারের মতো রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করবে এবং সে ক্ষেত্রে টাকা নেবে। আপনি আগ্রহী হলে সে ডাক্তারের মতো আপনার চিকিৎসা করার চেষ্টা চালাবে।’
হিরোক রাজি হওয়ায় শুরু হলো বানরের রোগী দেখার পালা-এমরান বানরের উদ্দেশে বললেন, ‘এ মণির চিকিৎসা করবে?’
বানর হাত উঁচু করে জানান দিল করবে।
এমরান বললেন হিরোককে, ‘হ্যাঁ, বানর তোমার চিকিৎসা করবে।’
মালিকের হাঁক, ‘এ মণির হাত মাটিতে রাখ। হাত দেখ। বল, এর কী রোগ আছে?’
বানর নিজের হাত তুলে নিজের মাথায় রাখল। মালিক বললেন হিরোককে, ‘তোমার মাথা ঘোরে?’
হিরোকের জবাব, ‘হ্যাঁ।’
বানরের উদ্দেশে বললেন, ‘এ মনির চিকিৎসা দিতে পারবে? না, কী করতে হবে? বড় ডাক্তার দেখাতে হবে?’
এরপর ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী মিম বানরের সামনে ১০ টাকা ধরল। এবারও বানর টাকা নিল না।
এমরান হাঁক ছাড়ল মিমের উদ্দেশে, ‘এই মণি, তোমার অভিভাবকদের ডাক।’
মিমের দাদি এসে দাঁড়ালেন দর্শকদের মাঝে। তার কাছ থেকে মিমের চিকিৎসার অনুমতি চেয়ে নিল এমরান। এরপর বানরের উদ্দেশে হাঁক ছাড়ল...। বানর শুরু করল রোগ নির্ণয়ের খেলা। সে অঙ্গভঙ্গি করে দেখাল, মিমকে বড় ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। নামাজ পড়ে মিমের জন্য দোয়া করতে হবে।
শেষ হয়ে গেল বানরের এই ডাক্তার ডাক্তার খেলা। দর্শক যারা ছিলেন তারা আনন্দ নিয়ে ফিরলেন।
কিন্তু কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে এমরান হোসেন বানর দিয়ে চিকিৎসার নামে অনেক বেশি টাকা নিয়ে থাকেন। নিজের কাছে তাবিজ-কবচ রেখে এমরান মানুষকে দিয়ে টাকা নেয়। স্থানীয় বউ-ঝিরা জানান, আগের দিন রোগের চিকিৎসার নামে এমরান ১০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন। দিয়ে গেছেন কিছু তাবিজ। বিশ্বাস করে সেই তাবিজ কেউ হাতে, কেউ গলায় ঝুলিয়েছেন। অনেকে আবার কোমরে বেঁধে নিয়েছেন।
এমরান হোসেন ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাশিপুর গ্রামের মিন্টু মিয়ার ছেলে। এমরান জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হওয়ার পর তার আর লেখাপড়া করা সম্ভব হয়নি। বাপ-দাদারা এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি নিজেও ১৭-১৮ বছর ধরে বানরের খেলা দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এমরান অস্বীকার করেছেন।
তার বানরের বয়স কত জিজ্ঞাসা করলে এমরান জানান, এটি তার বাবার আমলের বানর। এত বছর ধরে খেলা দেখায়, তাই এর অভিজ্ঞতা অনেক!
রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ অক্টোবর ২০১৪/মহাসিন/শাহনেওয়াজ/এএ