দীপংকর গৌতম‘আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,রহিমুদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।’পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘সুচয়নী’ কাব্যগ্রন্থের ‘আসমানী’ কবিতাটিতে এভাবেই আসমানীর বর্ণনা দিয়েছিলেন কবি। এই কবিতা গ্রামবাংলা অথবা শহর- সব ধরনের পাঠকের অপঠিত কিংবা অজানা নয়। আসমানী মারা গেছেন এক বছর হলো, কিন্তু সাহিত্যে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। এমনই এক সাহিত্য নির্মাতা কবি জসীমউদ্দীন- বাংলা সাহিত্যেও এক বিস্ময়কর প্রতিভা। জসীমউদ্দীনের লেখা কবিতার আবেদন এতো বেশি যে, আজও তাঁকে সবাই শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করেন। তাঁর লেখা ‘কবর’, ‘নিমন্ত্রণ’ আজও সবার মুখে মুখে ফেরে। ‘আসমানী’ কবিতা পড়ার পর আমি শুনেছিলাম আসমানী নামের একটি মেয়েকে দেখেই তিনি এ কবিতাটি লিখেছেন। আমি যখন ‘সমকাল’ পত্রিকায় কাজ করি তখন গিয়েছিলাম আসমানীর বাড়িতে। ফরিদপুরের অদূরে শিবরামপুর স্টেশন থেকে রিক্সা নিয়ে রওনা হই রসুলপুর গ্রামে। সেখানে আসমানীর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমৃত্যু কবির কাছে ঋণী থাকবেন বলে আমাকে জানিয়েছিলেন। তিনি কবির বর্ণনা দিয়েছিলেন এভাবে- বিশালকায় মানুষ, পাজামা ও পাঞ্জাবী পড়া, বগলে বই-খাতা; আমাদের তখন অভাব যেন ফুরায় না। কবি আমাকে ডেকে নিলেন আমাদের ঘর থেকে। শুনলেন আমাদের দুঃখ-সুখের কথা। তারপর উঠানে একটা চেয়ার পেতে বসে লিখলেন কবিতা। সেই কবিতা লেখার পর থেকেই আমাকে সবাই দেখতে আসে। কত লোকে টাকা দিয়ে যায়। ফরিদপুরেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাকে ডাকে। জসীমউদ্দীনের কবিতার বুনন ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। গল্প, উপন্যাস, নাটক, গান ও প্রবন্ধেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। খুব কম সাহিত্যিকই শিশুসাহিত্যে সাফল্য পেয়েছেন, এখানেও তিনি ব্যতিক্রম। তিনি অনেক শিশুসাহিত্য রচনা করেন যেগুলোর মাধ্যমে গ্রাম বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্যের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটে। তিনি যেন পাঠককে মনে করিয়ে দেন শেকড়ের কথা। তেমনি নানান গঠনমূলক ও নীতিকথার পাঠ আমরা সেখান থেকে পাই। ‘আট কলা’ নামে রহিম শেখের চরিত্রের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজের পুরুষ যেভাবে নারীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করত তার একটি নিপুণ চিত্র অঙ্কন করেছেন তিনি। পাশাপাশি অধিকাংশ নারীরা কোনো রকম প্রতিবাদ ছাড়াই সব নির্যাতন সহ্য করে এবং সমাজ ধরেই নিত নারীদের কোনো বুদ্ধি নেই- এসবের প্রতিবাদী চিত্র আমরা তাঁর সাহিত্যে পেয়েছি। এ ক্ষেত্রে জসীমউদ্দীন দেখিয়েছেন নারীরা অনেক বুদ্ধিমতী। তাদের হেয় প্রতিপন্ন করা ঠিক নয়। এমনকী গল্পের প্রেক্ষাপটে রহিম শেখ একদিন হুঁকায় পানি দিতে দেরি হওয়ায় বউকে বেদম পিটুনি দেয়। এ ঘটনায় বউ ক্ষুব্ধ হয়ে হুমকি দেয়, ফের যদি রহিম শেখ এমন অন্যায় আচরণ করে তবে তাকে আট কলার এক কলা দেখাবে, যাতে রহিম শেখের শিক্ষা হয়। রহিম শেখ এমন হুমকিতে বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে বউকে আবার পেটায়। আর তখুনি বউ সিদ্ধান্ত নেয় স্বামীকে উচিৎ শিক্ষা দেয়ার। এবং এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রহিম শেখের বউ একদিন কৌশলে জেনে নিল পরের দিন রহিম শেখ কোন জমিতে হাল চাষ করবে। এক টাকার বিনিময়ে একটি বড় শোল মাছ সংগ্রহ করে রহিম শেখ জমিতে লাঙ্গল চালাবার আগেই বউ মাটির নিচে মাছটি পুঁতে রেখে আসে। হাল চাষের এক পর্যায়ে মাছটি জমি থেকে বেরিয়ে আসায় রহিম শেখ খুব খুশি হয়। সে আনন্দে বাড়ি এসে বউকে মাছের ঝোল রান্না করার হুকুম দেয়। কিন্তু রহিম শেখ যখন খেতে বসে তখন দেখতে পায় বউ শুধু তাকে মরিচ ভর্তা দিয়েছে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বউকে আবার পেটানোর সময় বউ উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে আশপাশের মানুষ জড়ো করে।আগত জনতা রহিম শেখের এমন আচরণের কারণ জিজ্ঞাসা করলে রহিম শেখ জানায় সকালে ‘ইটা-ক্ষেত’ থেকে একটি মাছ ধরে এনেছে, কিন্তু তার বউ একাই পুরোটা খেয়ে তাকে মরিচ ভর্তা দিয়ে খেতে দিয়েছে। রহিম শেখের এমন জবাবে সবাই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে কারণ ‘ইটা-ক্ষেত’ সব সময় শুকনা থাকে, তাই সেখানে মাছ পাবার প্রশ্নই ওঠে না। ফলে সবাই রহিম শেখের মস্তিষ্ক বিকৃত হয়েছে ধরে নিয়ে তাকে বেদম পিটানোর পর গাছের সাথে বেঁধে রেখে চলে যায়। সবাই যাবার পর রহিম শেখকে মুক্ত করে শোল মাছের ঝোল দিয়ে খেতে দেয় তার বউ। শোল মাছের ঝোল দেখে রহিম শেখ ভয়ে আঁতকে ওঠে এবং বুঝতে পারে তার বউয়ের পরিকল্পনা। সাথে সাথে তার আট কলার এক কলা বুদ্ধির কাছে পরাস্ত হয়ে রহিম শেখ মাফ চেয়ে নেয় এবং তারা সুন্দরভাবে বসবাস করতে শুরু করে।‘বোকা সাথী’ নামক আরেক গল্পে সমাজের ভিন্ন একটি বিষয়বস্তু পল্লীকবি তুলে ধরেছেন। এখানে কোন এক গ্রামের জোলা ও নাপিত গ্রাম ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ তাদের বউয়ের অসহনীয় চাহিদা মেটাতে না পারায় প্রায়ই দুজনকে হেনস্থা হতে হয়। দেশ ছেড়ে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এক রাজ্যে এসে রাজার কাছে দুজন কাজ চায়। পরে নাপিতের চালাকিতে সবাইকে বোকা বানিয়ে রাজকন্যাদের বিয়ে করে নাপিত ও জোলা। কিন্তু বাসর রাতে জোলা ভয় পেয়ে সব সত্য বলে দেয়। সত্য প্রকাশের পর দুজনকেই রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। এই গল্পে জসীমউদ্দীন দুটি কাজ করেছেন। এক, সমাজের কূটকৌশল ও চালাকীকে ঘৃণা করেছেন। দুই, সকল নারীদের প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এটিকে নিছক গল্প হিসেবে নয়, শিক্ষামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও দেখতে হবে।তাঁর ‘পুতা লইয়া যাও’ গল্পে বিশেষ কোনো নীতি কথা না থাকলেও সমাজে কিছু প্রতারক কতভাবে যে প্রতারণা করে তা ফুটে উঠেছে। বিশেষত তার ‘আয়না’ গল্পটি একটি ভিন্নমাত্রার গল্প। গ্রামীণ সমাজে পিতার প্রতি পুত্রের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা দেখে অবাক হতে হয়। অবাক হতে হয় কবির রচনাশৈলী দেখেও। সাহিত্যে তাঁর সার্থকতা এখানেই। তাছাড়া গল্পগুলোর চরিত্র সৃষ্টির রহস্যের বড় দিক হলো, এই গল্পগুলোর মধ্যে যেমন সিংহ, বানর, কুমির, শেয়াল রয়েছে তেমনি রয়েছে এ সমাজেরই বিভিন্ন চরিত্র তাঁতী, নাপিত, জেলে, কৃষকসহ আরও অনেক পেশাজীবী মানুষ। শিল্পকলার বহুমাত্রিক এই প্রতিভা ‘পল্লীকবি’ নামেই খ্যাত হয়েছেন। তাতে আধুনিক সাহিত্যের ব্যাত্যয় ঘটেনি। কবি জসীমউদ্দীন ১৯০৩ সালের পহেলা জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম আনসার উদ্দিন মোল্লা। তিনি পেশায় স্কুল শিক্ষক ছিলেন। মা আমিনা খাতুন ওরফে রাঙাছুট। জসীমউদ্দীন ফরিদপুর ওয়েলফেয়ার স্কুল, ও পরবর্তীতে ফরিদপুর জেলা স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন মাটি ও মানুষের কবি। গ্রামের হাওয়া আর ধূলিকণার সাথে তাঁর কবি মন সর্বদা ভেসে বেড়িয়েছে। প্রাণবন্ত ও সহজ উচ্চারণে মানুষের মনের কথাগুলো তিনি সাজিয়েছেন; পাঠক মাত্রই স্বীকার করবেন সে কথা। তাঁর লেখা যেন আমাদের গ্রামের অনুরূপ। কবিতার মধ্য দিয়ে কবি তাঁর শহুরে বন্ধুদের নিয়ে গেছেন পল্লী মায়ের কোলে। গ্রামের আকর্ষণীয় মায়াবী রূপ কবিকে উতালা করেছে বারবার। পল্লী সংগীতের সুরে রচিত তাঁর গানগুলো এ দেশের মানুষকে মাতিয়েছে। জসীমউদ্দীন ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘সোজন বদিয়ার ঘাট’, ‘বালুচর’, ‘রঙিলা নায়ের মাঝি’ প্রভৃতি কাব্য লিখে সমাদৃত ও পাঠকপ্রিয় হয়েছেন। আজ কবির জন্ম দিবসে তাঁর স্মৃতির প্রতি প্রণতি জানাই।রাইজিংবিডি/ঢাকা/১ জানুয়ারি ২০১৫/তাপস রায়