মতামত

২৯ এপ্রিল প্রশ্ন রেখে যায়, উপকূল কতটা সুরক্ষিত?

রফিকুল ইসলাম মন্টু : ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে কথা তো কম হলো না। সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে আলোচনাও হলো বিস্তর। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে এ বিষয়ে ঝুলিতে অভিজ্ঞতাও জমেছে অনেক। কিন্তু কাজের কাজ কতটা হলো? ঘূর্ণিঝড়ের দিন এলে কিংবা নতুন করে কোনো ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে ঘুরেফিরে প্রসঙ্গ একটাই- নিরাপত্তাহীন উপকূল; অরক্ষিত উপকূল। পাশের দেশ কিংবা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের বেড়িবাঁধ ব্যবস্থাপনার কলাকৌশল দেখে আমরা কেন উপকূলের বেড়িবাঁধ টেকসই করতে পারছি না? কেনই বা ‘বাঁশের নিরাপত্তা’দিয়ে বেড়িবাঁধ টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে? প্রশ্নগুলোর জবাব মেলে না। উপকূলের নাজুক বেড়িবাঁধ কিংবা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কথা বলা হয়েছে বহু বার। মাঠ ঘুরে এমন চিত্রটাই আসলে বার বার চোখে পড়ে। এবার ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় দিবসেও সেই কথাটাই বলতে হচ্ছে। ওই বছরের ২৯ এপ্রিল পূর্ব-উপকূলের ওপর দিয়ে এই ঝড় বয়ে যায়। ‘ম্যারি এন’নামের এই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার হলেও বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা দ্বিগুণ। মারা যায় ২০ লাখ গবাদি পশু। গৃহহারা হয়েছিলেন ৫০ লাখ মানুষ। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে লণ্ডভণ্ড হয়েছিল মহেশখালী, কুতুবদিয়া, বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, কক্সবাজার, চট্টগ্রামের ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। ঘূর্ণিঝড়ের দিন এলে উপকূলের সুরক্ষার তাগিদ ওঠে। নতুন করে আলোচনা হয়; বহুমূখী দাবি ওঠে। উপকূল ঘুরে দেখি, যে স্থানে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ঘূর্ণিঝড় আঘাত করেছিল; সে স্থানে বাঁশের বেড়া আর বালুর বস্তা ফেলে কোথাও বেড়িবাঁধ রক্ষার চেষ্টা চলছে। আবার কোথাও যথাযথ কাজ না হওয়ায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও বাঁধ টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। কোথাও খুব নাজুকভাবে মাটি ফেলে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্র সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। বহু গ্রাম থেকে সাইক্লোন শেল্টার অনেক দূরে। কোথাও আশ্রয় নেওয়ার জন্য একটা শেল্টার নির্মাণ করা হলেও সেখানে পৌঁছানোর মতো রাস্তা হয়নি। আবার অনেক স্থানে নেই সবুজবেষ্টনীর নিরাপত্তা। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল দেশের পূর্ব-উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার চিত্র এমনটাই। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, কাঠগড়, সীতাকুন্ড, সন্দ্বীপ, কুমিরা, বাঁশখালী, কক্সবাজারের চকরিয়া ঘুরে মিলেছে মানুষের সংকটের চিত্র। সেই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের ২৭ বছর পরেও উপকূলের মানুষের বিপন্নতা কাটেনি। কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় শক্ত ও উঁচু বেড়িবাঁধের দাবিতে কিছুদিন আগে মানবন্ধন হয়েছে। তাদেরও একটি কথা, বড় ধরনের ঝড় এলে ধসে যাবে নাজুক বাঁধ। যেসব স্থানে বাঁধ নেই সেসব স্থানের মানুষ আবারও ভাসবে। ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ে এই এলাকাটি ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। দুই বছর আগে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু আবারও মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় কুতুবদিয়ার একাংশ। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের মানুষেরা ঝুঁকির মুখে থাকেন দুর্যোগ মৌসুমে। পশ্চিমে রহমতপুর ইউনিয়নের প্রায় চার কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ থাকলেও মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। গত বর্ষায় সন্দ্বীপের একাধিক স্থানে বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষতি হয়। একই অবস্থা চোখে পড়ে সন্দ্বীপের বাংলাবাজার, সারিকাইত, আজমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায়। সন্দ্বীপের চারিদিকে বেড়িবাঁধ পুনঃনির্মাণের একটি বৃহৎ কর্মসূচি শুরু হলেও কাজ চলছে ধীর গতিতে। বাঁধ পুনঃনির্মাণ প্রকল্প শুরু হওয়ায় কয়েকটি স্থানে বাঁধের বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবারের বর্ষায় তাদের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করবে। পূর্ব থেকে আমরা যদি পশ্চিমে চোখ ফেরাই, সেখানে একই অবস্থা। পশ্চিম-উপকূলের সিডর বিধ্বস্ত জনপদ শরণখোলার মানুষ কিন্তু এখনো পুরোপুরি নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারছে না। এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে তাদের মাঝে। তাফালবাড়িয়া ও বগী এলাকার বেশকিছু মানুষের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারি, তারা বেশ ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। সিডরের পর অনেক কাজ এখানে হয়েছে। উপজেলার চারিদিকে বৃহৎ বাঁধ নির্মাণ পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু এই কাজ যে কবে নাগাদ শেষ হবে, তা কেউ বলতে পারছেন না। অন্যদিকে বাঁধ নির্মাণকালেই একাধিকবার ধসে পড়েছে। নদীশাসন না হওয়ায় বাঁধ নির্মাণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু বাঁধের কথাই বা বলি কেন, দুর্যোগের ছোঁবল থেকে উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় নেই প্রয়োজনীয় বন। ২৯ এপ্রিলের প্রলয় যেখানে আঘাত করেছিল; সে এলাকায় এমন চিত্র পাওয়া যায়। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত থেকে মুসলিমাবাদ পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে কিছু গাছ রয়েছে। পরবর্তী আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় কোনো বনায়ন নেই। হালিশহর আনন্দবাজার এলাকায় কিছু বনায়ন থাকার পর কাট্টলী এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে কিছু বনায়ন রয়েছে। আর বাকি সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় সবুজবেষ্টনীর চিহ্নমাত্র নেই। কক্সবাজারের চকরিয়ার বদরখালী, পেকুয়ার উজানটিয়া, কুতুবদিয়ার তাবালরচর, ধূরুং এলাকায়ও খুব একটা গাছপালা চোখে পড়ে না। অথচ ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে এ এলাকা বিরান হয়ে গিয়েছিল। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় ছিল চকরিয়া সুন্দরবন। কিন্তু কালের বিবর্তনে বনটি উজাড় হয়ে যাওয়ায় ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়টি ওই এলাকায় প্রচণ্ডভাবে আঘাত করে। তখন ওই বনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এলাকার মানুষ। বদরখালী বাজারে আলাপকালে অনেকেই বলছিলেন, ওই বনটি থাকলে ঘূর্ণিঝড়ে এই এলাকার এত ক্ষতি হতো না। প্রলয়ংকরী সেই ঘূর্ণিঝড়ের ২৭ বছর পরেও উপকূলের মানুষ দুর্যোগ থেকে বাঁচার নিরাপত্তা চেয়েই সরকারের কাছে দাবি তুলেছেন। সন্দ্বীপ, সীতাকুন্ড, পতেঙ্গা, চকরিয়া, কুতুবদিয়া এলাকার ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত মানুষদের কাছে এখনো নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দাবিটাই প্রধান হয়ে আছে। তারা বলেন, যা হারিয়েছি, তা কেউ ফেরত দিতে পারবে না। বাকি জীবনটা বেঁচে থাকার নিরাপত্তা চাই। শুধু ঘুর্ণিঝড়ের আগে-পরে নয়, সারা বছরই সরকারের সুনজর চাই। উপকূলের মানুষকে দুর্যোগ থেকে বাঁচাতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে প্রতিবছরই বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করা হয়। দিনটি উপলক্ষে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে পালিত হয় বিভিন্ন কর্মসূচি। উপকূল নিয়ে কর্মরত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ট্রাস্ট প্রতি বছরের মতো এবারও কর্মসূচি পালন করছে। এ সংগঠন থেকে বেশকিছু দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: দুর্যোগ ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, জাতিসংঘ সংস্থা ও আইএনজিওদের সরাসরি প্রকল্প পরিচালনা থেকে সরে আসতে হবে এবং স্থানীয় এনজিওদের নেতৃত্বের সুযোগ দিতে হবে, চরের মানুষের উপযোগী জীবিকায়ন কর্মকাণ্ডে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে, চর এবং উপকূলীয় এলাকায় বেশী সংখ্যক কমিউনিটি রেডিও অনুমোদন দিতে হবে, দুর্যোগকালে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে হবে, লোনা পানির অনুপ্রবেশ রোধ এবং মিঠা পানির বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমিয়ে ভূউপরিস্থ পানির সঞ্চয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সকল কাজে জনঅংশগ্রহণ সুযোগ বাড়াতে হবে, কুতুবদিয়া ও ভোলা দ্বীপের জমি ও মানুষের সুরক্ষায় অগ্রাধিকারভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে, কংক্রিট ব্লক/ সি-ডাইক পদ্ধতিতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে হবে, রোহিঙ্গা আগমনে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠির জন্য ক্ষতিপূরণ বাজেট দিতে হবে, ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে কার্যকর করতে হবে, উপজেলা প্রশাসনকে কর্তৃত্ব দিয়ে জেলে নৌকার রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করতে হবে। আসুন, আমরা আরো সজাগ হই, সচেতন হই। উপকূল জুড়ে স্বজনহারা মানুষের জীবনব্যাপী কান্না হয়তো থামানো যাবে না। তবে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সহানুভূতিটুকু জানানো যাবে। যে মানুষটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্বজনদের হারিয়ে নির্বাক পথে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই মানুষটিকে অন্তত এই শান্ত্বনাটুকু দেওয়া যেতে পারে, এভাবে আর কারো কান্না তাকে দেখতে হবে না। শক্ত, উঁচু, টেকসই বেড়িবাঁধ উপকূলের মানুষের অধিকার। নিরাপদে নিশ্চিন্তে বসবাস তার অধিকার। তার অধিকারটুকু ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগী হই। লেখক : উপকূল-সন্ধানী সাংবাদিক রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ এপ্রিল ২০১৮/রফিক