মতামত

শবে বরাতে করণীয় ও বর্জনীয়

ইসলামি জীবন ব্যবস্থায় সময় ও কালের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ তায়ালা কিছু সময়কে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন, কিছু স্থানকে দিয়েছেন সম্মান, আবার কিছু রাতকে বানিয়েছেন রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের উপলক্ষ। তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ রজনী হলো শবে বরাত, যা শাবান মাসের পনেরো তারিখের রাত, যা আরবি ভাষায় ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ নামে পরিচিত।

ফারসি শব শব্দের অর্থ রাত আর আরবি বারাআত অর্থ মুক্তি। শবে বরাত মানে মুক্তির রাত। শবে বরাতে নিহিত রয়েছে মুমিন-মুসলমানের মুক্তি ও কল্যাণের বিভিন্ন উপকরণ, তাই এই রাতকে শবে বরাত বা মুক্তির রাত বলা হয়েছে। লওহে মাহফুজে মানুষের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবকিছু অনেক আগে থেকেই লেখা রয়েছে। এ রাতে এ বছরের কপি সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাদের হাতে অর্পণ করা হয়। মানুষের আমলনামা আল্লাহর কাছে পাঠানো হয়। এই রাতে নফল ইবাদতের আলাদা গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। একে হাদিসের পরিভাষায় ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা শাবানের অর্ধ মাসের রাত বলা হয়েছে। শবে বরাতের করণীয় সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমার কাছে শাবান মাসের রোজা অন্য মাসের তুলনায় অধিক প্রিয়। যখন তোমাদের কাছে শাবানের রাত (শবে বরাত) হাজির হবে, তখন তোমরা সেই রাতটি জাগ্রত থাকো (নামাজ পড়ে, কোরআন তেলাওয়াত করে, তাসবিহ পড়ে, জিকির করে, দোয়া করে) এবং দিনের বেলা রোজা রাখো।

কারণ, এ রাতে মহান আল্লাহ সূর্যাস্তের পর থেকে ফজর পর্যন্ত দুনিয়ার আসমানে এসে ঘোষণা করেন, আছে কি এমন কোনো ব্যক্তি যে তার গুনাহ মাফের জন্য আমার কাছে প্রার্থনা করবে? আমি তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেব। আছে কি এমন কোনো রিজিক প্রার্থনাকারী, যে আমার কাছে রিজিক প্রার্থনা করবে? আমি তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেব। আছে কি এমন কোনো বিপদগ্রস্ত, যে আমার কাছে বিপদ থেকে মুক্তি চাইবে? আমি তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করব। এভাবে সারারাত আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ঘোষণা হতে থাকে এবং বান্দাদের ওপর বৃষ্টির মতো রহমত নাজিল হতে থাকে। (ইবনে মাজাহ: ১৩৮৪, বায়হাকি: ৩৮২৩)। তাছাড়া শাবান মাসে অধিক পরিমাণ নফল রোজা রাখার কথা অনেক হাদিসে এসেছে এবং আইয়ামে বীজ তথা প্রতি চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখার বিষয়টি সহি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। (ইসলাহী খুতুবাত)

হাদিসের আলোকে এ রাতের আমল হলো, আল্লাহর কাছে তাওবা-ইস্তিগফার করা। অনাড়ম্বর ও স্বাভাবিকভাবে হলে কবর জিয়ারত করা। অনির্ধারিতভাবে নফল ইবাদত করা। পরদিন রোজা রাখা।

এ রাতে বিশেষ ধরনের অপরাধী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। কিন্তু একাগ্রচিত্তে তাওবা না করা পর্যন্ত কিছুসংখ্যক অপরাধীকে কখনই ক্ষমা করা হয় না। তারা হলো-মুশরিক, জাদুকর, গণক, ঈর্ষাপরায়ণ, অন্যের হক নষ্টকারী, গায়ক, বাদক, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদকারী, পরস্পরে শত্রুতা পোষণকারী, অত্যাচারী শাসক ও তাদের সহযোগী, মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রয়কারী, অহংকার করে পায়ের গিরার নিচে কাপড় পরিধানকারী, মদ পানকারী, পরনারীগামী, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, কৃপণ, পরনিন্দাকারী, জুয়াড়ি প্রমুখ।

সম্মিলিত কোনো আমলকে এই রাতে আবশ্যকীয় মনে করা বিদআত। এই রাতের আমলসমূহ বিশুদ্ধ মতানুসারে সম্মিলিত নয়; নিরিবিলি ইবাদতের রাত-শবে বরাত। পুরুষদের জন্য তো ফরজ নামাজ অবশ্যই মসজিদে আদায় করতে হবে। তারপর পুরুষ ও মহিলারা সাধ্যানুযায়ী নিজ নিজ ঘরে একাকী নফল ইবাদত-বন্দেগি করবেন। নফল আমলের জন্য দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হওয়ার কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হাদিসে নেই। আর সাহাবায়ে কেরামের যুগেও এর রেওয়াজ ছিল না। তবে কোনো ঘোষণা ছাড়া এমনিতেই কিছু লোক যদি মসজিদে এসে যান, তাহলে প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকবেন। একে অন্যের আমলে ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হওয়া যাবে না। আর খেয়াল রাখতে হবে, এ রাতে জাগ্রত থাকতে গিয়ে ফজরের নামাজ যেন ছুটে না যায়। শবে বরাতের সারারাতের আমলও ফজরের ফরজ নামাজের সমতুল্য হবে না।

শবে বরাতকে অস্বীকার করার যেমন সুযোগ নেই, তেমনই এতে বাড়াবাড়িও করা যাবে না। বিদআত ও কুসংস্কার থেকে বেঁচে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তরিকায় আমল করেই কেবল এই রাতের ফজিলতের অধিকারী হওয়া যাবে। কারণ দীনের ব্যাপারে সব ধরনের বিদআতই হারাম ও গোমরাহি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা দীনের মাঝে নতুন বিষয় আবিষ্কার করা থেকে বিরত থাকবে। কারণ, প্রত্যেক নতুন বিষয়ই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতের পরিণাম গোমরাহি বা ভ্রষ্টতা।’ তিনি আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের দীনের মধ্যে এমন নতুন বিষয় তৈরি করবে, যা তার অন্তর্গত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।’ অনেকে এই রাতে বিভিন্ন বিদআত ও কুসংস্কারে জড়িয়ে পড়েন। নিচে এমন কিছু বিদআত ও কুসংস্কারের উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

আলোকসজ্জা করা : শবে বরাত উপলক্ষে রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি, মসজিদ-মাদরাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আলোকসজ্জা করা হয়। এসব কাজে একদিকে লক্ষ লক্ষ টাকা অপচয় করা হয়, অন্যদিকে এগুলো অগ্নিপূজকদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। আল্লামা ইবনে নুজাইম হানাফি বলেন, ‘শবে বরাতে বিভিন্ন গলি ও বাজারে রঙ-বেরঙের আলোকসজ্জা করা বিদআত, এমনকি মসজিদে আলোকসজ্জা করাও বিদআত।’ এই কুপ্রথাটির প্রচলন বারামিকা জাতি থেকে শুরু হয়েছে। যারা মূলত: একটি অগ্নিপূজক জাতি ছিল।

মুসলমান হওয়ার পরও তারা কুসংস্কারটি সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে পারেনি। তাদের পুরনো অভ্যাস থেকে মুসলমানদের মাঝেও প্রথাটির প্রচলন ঘটিয়ে দিয়েছে। হযরত শাহ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলবি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘যেসব জঘণ্যতম বিদআত ভারতবর্ষের অধিকাংশ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে তন্মধ্যে রয়েছে [শবে বরাত প্রভৃতি উপলক্ষে] আলোকসজ্জা তথা বাসা-বাড়ি, দেয়াল-অট্টালিকা বৈচিত্র্যময় লাইট দ্বারা সজ্জিত করা, এর মাধ্যমে পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া, আগুন নিয়ে আনন্দ খেলার লক্ষ্যে দলবদ্ধ হওয়া। যেগুলোর কোনো ভিত্তি বিশুদ্ধ কিতাবাদিতে নেই। এ ব্যাপারে কোনো দুর্বল হাদিস কিংবা একটি জাল হাদিসও পাওয়া যায় না। ভারতবর্ষ ছাড়া অপরাপর [মুসলিম] এলাকাতেও এর প্রচলন নেই। হতে পারে এসব কিছু হিন্দু ব্রাহ্মণদের প্রথা থেকে ধারকৃত।’

আতশবাজি করা : কেউ কেউ শবে বরাত উপলক্ষে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে আতশবাজির ব্যবস্থা করে থাকে। অথচ ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই। এটি নিতান্তই কুসংস্কার। এতে অনেক সমস্যা বিদ্যমান। আতশবাজিতে অনেক অর্থ-সম্পদের অপচয় হয়। আর অপচয় সম্পর্কে কুরআন-হাদিসে কঠোরভাবে ঘোষণা হয়েছে যে, ‘অপচয়কারী শয়তানের ভাই’। এর কারণে সময়ও নষ্ট হয়। যে সময়টুকু আতশবাজির পেছনে ব্যয় হয় সে সময়টুকু ইবাদতে কাটালে আল্লাহ তায়ালার রেজামন্দি অর্জনে সহায়ক হতো। আর সময়ের অপব্যয় করা গুনাহর শামিল। এর কারণে অনেক সময় অপর মুসলমান ভাই কষ্টও পান। বিশেষ করে পাড়া-প্রতিবেশীরা আতশবাজির বিস্ফোরণের আওয়াজে শান্তিতে থাকতে পারে না। অথচ এক মুসলমান অপর মুসলমানকে কষ্ট দেওয়া হারাম। সর্বোপরি এ রাতে কিছু লোক নিরিবিলি পরিবেশে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করতে চান। আতশবাজির কারণে তাদের ইবাদতে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে।

হালুয়া-রুটি খাওয়া: শবে বরাত উপলক্ষে ঘরে ঘরে হালুয়া-রুটি খাওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। সেদিন গরিব মানুষও টাকা ঋণ করে হলেও এক বেলা গোশত কিনে খায়। তারা মনে করে, সেদিন যদি ভালো খাবার খাওয়া যায় তাহলে সারা বছর ভালো খাবার খাওয়া যাবে। আর হালুয়া-রুটি খাওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধে দাঁত ভাঙার পর শক্ত খাবার খেতে পারেননি। তাই তাঁর প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য এদিন ঘটা করে হালুয়া-রুটি খাওয়া হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দান্দান মোবারক শহীদ হওয়ার সঙ্গে হালুয়া-রুটি খাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।এরপর তিনি কি নরম খাবার শুধু একদিন খেয়েছিলেন? তাহলে এ কেমন ভালোবাসা? আপনি শাবান মাসের পনের তারিখে কিছু হালুয়া-রুটি খেলেন আবার কিছুক্ষণ পর গরুর গোশত তো ঠিকই আয়েশ করে চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে থাকেন।

ছবি ও মূর্তি  তৈরি : কোনো কোনো এলাকায় শবে বরাত উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন পদার্থ দ্বারা বিভিন্ন প্রকার প্রাণীর আকৃতিতে পাউরুটি, কেক, সন্দেশ ইত্যাদি বানাতে দেখা যায়। যেমন কুমির, ভোদর, গুইসাপ, মাছ ইত্যাদি। এগুলোকে শবে বরাতের বিশেষ খাবার বলে গণ্য করা হয় এবং খুব চড়া মূল্যে বিক্রি হয়। এসব কাজ সম্পূর্ণ নাজায়েয। কোনো প্রাণীর প্রতিকৃতি তৈরি করা হারাম ও কবিরা গুনাহ। হাদিস শরিফে এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে এবং প্রতিকৃতি প্রস্তুতকারীর জন্য আখেরাতে কঠিন শাস্তির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, প্রতিকৃতি প্রস্তুতকারীরা আল্লাহ তায়ালার কাছে সবচেয়ে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। শবে বরাত উপলক্ষে এ ধরনের খাবারের আয়োজন করাকে সওয়াবের কাজ মনে করা সুস্পষ্ট বিদআত ও কুসংস্কার। আর এ ধরনের প্রাণী আকৃতির খাবারের বেচাকেনাও জায়েয নয়। (বুখারি ২/৮৮০-৮৮১; শরহে মুসলিম নববী ১৪/৮১)

মৃতদের আত্মা দুনিয়াতে পুনঃআগমনের বিশ্বাস করা: শবে বরাত উপলক্ষে কোনো কোনো এলাকার নারীরা ঘর-বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে আতর সুগন্ধি লাগিয়ে পরিপাটি করে রাখে। বিশেষ করে বিধবা নারীরা এমনটি করেন। এমনকি তারা কিছু খাবার এক টুকরো কাপড়ে বেঁধে ঘরে ঝুলিয়ে রাখে। তাদের বিশ্বাস হলো, তাদের মৃত স্বামী-স্বজনদের আত্মা এ রাতে ছাড়া পেয়ে নিজ নিজ পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আসে। এমন বিশ্বাস মূর্খতা ছাড়া কিছু নয়। মানুষ মারা গেলে তাদের আত্মা আবার দুনিয়াতে ফিরে আসা মুসলমানদের আকিদা নয়।

নির্দিষ্ট নিয়মে নফল নামাজ পড়া : কোনো কোনো এলাকায় এ রাতে এক অদ্ভূত পদ্ধতিতে একশত রাকাত নামাজ আদায় করা হয়। যাকে বলা হয় সালাতুল আলফিয়া। এই নামাজে প্রতি রাকাতে সুরা ফাতেহার পর দশ বার সুরা ইখলাস পাঠ করে। একশত রাকাত নামাজে মোট এক হাজার বার সুরা ইখলাস পাঠ করতে হয়। ইসলামে নামাজ পড়ার এ ধরনের নিয়ম সম্পূর্ণ নতুন আবিষ্কৃত বিদআত। এ ব্যাপারে সব যুগের সব আলেম একমত। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং খোলাফায়ে রাশেদিন কখনো তা পড়েননি। তাছাড়া ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, সুফিয়ান সাওরি, আওযায়ি, লাইস প্রমুখ যুগশ্রেষ্ঠ ইমামের কেউ এ ধরনের বিশেষ নামাজ পড়ার কথা বলেননি। এ সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসটি মুফাসসিরদের মতে বানোয়াট ও জাল। তাই আমরা এই পুণ্যময় রাতটি বিদআত ও কুসংস্কার মুক্তভাবে এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ইবাদত-বন্দেগিতে কাটানোর চেষ্টা করব।

এ পবিত্র রাতের মাহাত্ম্য পূর্ণভাবে পেতে চাইলে আগে থেকেই দেহমন পবিত্র করে নিতে হবে। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবার হক আদায় করে দিতে হবে। কারো সঙ্গে কোনো অন্যায় করে থাকলে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। আর আল্লাহকে পেতে হলে সারা বছরই নামাজ-রোজা ইবাদত-বন্দেগি করে আল্লাহর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। শবে বরাতের ইবাদত হলো নফল ইবাদত। প্রতিদিনের ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে পালন করার পরই শবে বরাতের ইবাদতের সওয়াবের আশা করা যায়।

ফকিহ-মনীষীদের চোখে শবে বরাত ইসলামি আইনশাস্ত্রবিদদের ফকিহ বলা হয়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মতো বিভিন্ন ফকিহ-মনীষীও শবে বরাতের ফজিলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে মূল্যবান মন্তব্য করেছেন। যেমন- ফিকহে হানাফির চোখে : আল্লামা শামি, ইবনে নুজাইম, আল্লামা শরমবুলালি, শায়খ আবদুল হক দেহলবি, মাওলানা আশরাফ আলী থানবি, মাওলানা আবদুল হক লখনবি, মুফতি মুহাম্মদ শফিসহ  উলামায়ে হানাফিয়ার অভিমত হলো, শবে বরাতে শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী রাত জেগে একাকীভাবে ইবাদত করা মুস্তাহাব। তবে এর জন্য জামাতবদ্ধ হওয়া যাবে না। (আদ-দুররুল মুখতার : ২য় খ-, ২৪-২৫ পৃষ্ঠা/ আল বাহরুর রায়েক : ২য় খ-, ৫২ পৃষ্ঠা/ মারাকিল ফালাহ : ২১৯ পৃষ্ঠা)

ফিকহে শাফেয়ির চোখে: ইমাম শাফেয়ি (রহ.) এর মতে, শাবানের ১৫তম রাতে অধিক পরিমাণ দোয়া কবুল হয়ে থাকে। (কিতাবুল উম্ম : ১ম খণ্ড, ২৩১ পৃষ্ঠা)

ফিকহে হাম্বলির চোখে: ইমাম ইবনে মুফলি হাম্বলি (রহ.), আল্লামা মনসুর আল বাহুতি, ইবনে রজর হাম্বলি প্রমুখ হাম্বলি উলামায়ে কেরামের মতে শবে বরাতে ইবাদত করা মুস্তাহাব। (আল মাবদা: ২য় খণ্ড, ২৭ পৃষ্ঠা/ কাশফুল কিনা : ১ম খ-, ৪৪৫ পৃষ্ঠা)

ফিকহে মালেকির চোখে: ইবনে হাজ মালেকি (রহ.) বলেন, সালফে সালেহিনরা এ রাতকে যথেষ্ট সম্মান করতেন এবং এর জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। (আল মাদখাল : ১ম খ-, ২৯২ পৃষ্ঠা)

ইমাম ইবনে তাইমিয়ার চোখে: আবদুল আব্বাস আহমাদ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ১৫ শাবানের রাতের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক মারফু হাদিস এবং আসারে সাহাবা বর্ণিত রয়েছে। এগুলো দ্বারা এ রাতের ফজিলত ও মর্যাদা প্রমাণিত হয়। সালফে সালেহিনের কেউ কেউ এ রাতে নফল নামাজের ব্যাপারে যত্মবান হতেন। আর শাবানের রোজার ব্যাপারে তো সহি হাদিসসমূহই রয়েছে। (ইকতিযাউস সিরাতুল মুস্তাকিম : ২য় খ-, ৬৩১ পৃষ্ঠা)

মাওলানা আশরাফ আলী থানবি (রহ.) এর চোখে: হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবি (রহ.) বলেন, হাদিসে শবে বরাতের তিনটি কাজ সুন্নাত অনুযায়ী করাকে সওয়াব ও বরকত লাভের উপায় বলা হয়েছে। প্রথমতঃ ১৫ তারিখ রাতে কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া ও ইস্তেগফার করা। সঙ্গে সঙ্গে গরিব-মিসকিনদের কিছু দান করে সে দানের সওয়াবটুকু ওই মৃতদের নামে বখশে দিলে আরও ভালো হয়। সেই মুহূর্তে হাতে না থাকলে, অন্য সময় গোপনে কিছু দান করে দেওয়া উচিত। দ্বিতীয়তঃ রাত জেগে একা একা বা বিনা দাওয়াতে জড়ো হয়ে যাওয়া দু’চারজনের সঙ্গে ইবাদতে মশগুল থাকা। তৃতীয়তঃ শাবানের ১৫ তারিখ নফল রোজা রাখা।

মুফতি তাকি উসমানির চোখে: শায়খুল ইসলাম মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন, ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, নফল ইবাদত এমনভাবে করবে যে, সেখানে কেবল তুমি আছ, আর আছেন আল্লাহ। তৃতীয় কেউ নেই। সুতরাং যে কোনো নফল ইবাদতের ক্ষেত্রেই শরিয়তের অন্যতম মূলনীতি হলো, এতে জামাত করা মাকরুহে তাহরিমি ও নিষিদ্ধ। (ইসলাহি খুতুবাত : ৪র্থ খণ্ড, ২৬৮ পৃষ্ঠা)

ইমাম নাসিরুদ্দিন আলবানির চোখে: আহলে হাদিসদের ইমাম নাসিরুদ্দিন আলবানি (রহ.) তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘আস-সিলসিলাতুস সহিহাহ আল মুজাল্লাদাতুল কামিলাহ’ গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডের ১১৪৪ নম্বর অধ্যায়ের ২১৮ নম্বর পৃষ্ঠায় শবে বরাত সম্পর্কে হাদিস এনে যে মত ব্যক্ত করেছেন তা হলো-হযরত মুয়াজ বিন জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, অর্ধ শাবানের রাতে [শবে বরাতে] আল্লাহ তায়ালা তাঁর সব মাখলুকের প্রতি মনোযোগ আরোপ করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ ভাবাপন্ন ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান: হাদিস ৫৬৬৫, আল-মুজামুল আওসাত: হাদিস ৬৭৭৬, আল-মুজামুল কাবির: হাদিস ২১৫, সুনানে ইবনে মাজা: হাদিস ১৩৯০)

আলবানি (রহ.) তাঁর সিলসিলাতুস সহিহার তৃতীয় খণ্ডের ১৩৫ নম্বর পৃষ্ঠায় বলেন, ‘এই হাদিসটি সহি। এটি বিভিন্ন সূত্রে সাহাবাদের এক জামাত বর্ণনা করেছেন, যার একটি অন্যটিকে শক্তিশালী করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন মুয়াজ বিন জাবাল (রা.), আবু সালাবা (রা.), আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.), আবু মুসা আশয়ারি (রা.), আবু হুরায়রা (রা.), আবু বকর সিদ্দিক (রা.), আউফ বিন মালিক (রা.), আয়েশা (রা.) প্রমুখ সাহাবায়ে কেরাম।

উপরে বর্ণিত সবকজন বর্ণনাকারীর হাদিস আলবানি (রহ.) তাঁর কিতাবে আনার মাধ্যমে দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি বলেন, ‘সারকথা হলো, নিশ্চয়ই এই হাদিসটি এসব সূত্র পরম্পরা দ্বারা সহি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর সহি হওয়া এর থেকে কমসংখ্যক বর্ণনা দ্বারাও প্রমাণিত হয়ে যায়...। আর শায়েখ কাসেমি প্রণিত ‘ইসলাহুল মাসাজিদ’ গ্রন্থের ১০৭ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘শাবানের অর্ধ মাসের রাতের ফজিলত সম্পর্কে কোনো হাদিস নেই’ মর্মে যা বর্ণিত হয়েছে, সেই বক্তব্যের উপর নির্ভর করা যাবে না। যদি কেউ তা মেনে নেয় সে হবে ঝাঁপিয়ে পড়া (ঘাড়তেড়া) স্বভাবের, আর তার ব্যখ্যা-বিশ্লেষণ ও গবেষণা-উদ্ভাবনের কোনো যোগ্যতাই নেই...।

শবে বরাত কোনো কুসংস্কারের রাত নয়, আবার অবহেলার রাতও নয়। এটি হলো তওবা, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ। কোরআন ও হাদিসের আলোকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে এ রাতকে মূল্যায়ন করাই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে শবে বরাতের প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করে তা অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন!

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামি লেখক ফোরাম; পরিচালক, সম্পাদনা কেন্দ্র