মতামত

আমার বাংলা ভাষা

‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’- এক সময় সরাসরি বাংলা ভাষাকে কেড়ে নিতে এসেছিলো, এখন কেড়ে নিচ্ছে কৌশলে। নীরবে একটু একটু করে মৃত্যু ঘটছে বাংলা ভাষার। শুধু বাংলা ভাষা নয়, অনুন্নত দেশগুলোর প্রায় সব ভাষারই একই অবস্থা। গ্লোবালাইজেশনের দোহাই দিয়ে যে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চলছে, তারই ফলস্বরূপ বিলুপ্ত হচ্ছে অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের ভাষাগুলো।

ইংরেজি, হিন্দি এবং আরবি এই তিনটি ভাষার আগ্রাসনে এমনিতেই জর্জরিত বাংলা ভাষা। তার ওপর চলছে নিজেদের শব্দকে বিকৃত করে উচ্চারণ কিংবা ব্যাকরণ না-মানা। ভাষা প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকে এবং পাঁচশো বা এক হাজার বছর পরে তা একেবারে আলাদা হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও এটা হবে। তবে ভাষার গঠনপ্রণালী পরিবর্তন হলে কিংবা ক্রিয়ার কাল বা পুরুষভেদে শব্দ প্রয়োগ এলোমেলো হলে ভাষার সৌন্দর্য আর থাকে না। থাকে না স্বাভাবিক গঠন পদ্ধতিও। তাই বলা যায়, ব্যাকরণ না মানলে ভাষার সৌন্দর্য নষ্ট হয়। এ কারণে বর্তমানে বাংলা ভাষার অবস্থা সত্যিই শোচনীয়!   

রাজনীতি প্রতিটি মানুষের জীবন চালিয়ে এসেছে এবং চালাচ্ছে। রাজনৈতিক কারণেই ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা এবং সকলে এই ভাষা শিখতে আগ্রহী। বর্তমানে চাকরি পাওয়ানোর আশায় কিংবা বিদেশে পাঠানোর আশায় কিংবা জাতে তোলার আশায় একদিনের বাচ্চার সঙ্গে ইংরেজি শব্দ দিয়ে কথা শুরু করেন মা এবং পরিবারের সবাই (ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে)। তারা আবার পুরো বাক্য ইংরেজিতে বলছেন না, বাংলা বাক্যের মধ্যে কয়েকটি ইংরেজি শব্দ বলছেন। ভাষা ব্যবহারে শিশু এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। তাই অনেক বাংলা শব্দ সে শিখছেই না। হয়তো মিষ্টি একটি শিশু ‘মিষ্টি’ শব্দটিই জানতে পারছে না, সুইট অথবা কিউট শিখছে। এক সময় বাংলাদেশের মানুষ বয়সভেদে ভাই, চাচা, কাকা, মুরুব্বি, আপা, খালাম্মা, ফুপুআম্মা, চাচিআম্মা ইত্যাদি সম্বোধন করতো, এখন আংকেল-আন্টি হয়ে গেছে। এমনকি নিজের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দেরও এভাবে ডাকছে। এ এক অদ্ভুত সংস্কৃতি এসে ভর করেছে আমাদের দেশের উপর। প্রেমিক-প্রেমিকারা নাকি আজকাল নিজেদেরকে ‘বেবি’ বলে ডাকে! কী আশ্চর্য ব্যাপার! এটাকে কি বিদেশি ভাষার আগ্রাসন বলবো, নাকি ঔপনিবেশিকতা বলবো, তা গবেষণার বিষয়। 

এক সময় ছিলো প্রিয়, প্রিয়ে, প্রেয়সী, প্রিয়তম, প্রিয়তমা, বন্ধু, আত্মা; কতো মধুর সব ডাক! নতুন প্রজন্ম এই ডাকগুলো জানেই না অথবা জানলেও অবজ্ঞা করে। আবার পুরোনোরা নিজেদের আধুনিক প্রমাণ করতে নতুনদের এই ‘বেবি’তে আত্মসমর্পণ করছেন! বন্ধুকে ‘ভাই’ ডাকা কতো আন্তরিক ছিলো, এখন ডাকছে ‘ব্রো’। অ্যান্ড, বাট, সো, অলসো, লাইক, অ্যাকচ্যুয়ালি, এনিওয়ে ইত্যাদির কথা তো বলাই বাহুল্য। অথচ, আমাদের শব্দগুলো কী মধুর!- এবং বা ও, কিন্তু, সুতরাং, এটাও-ওটাও-এমনও, যেমন ধরো-মনে করো, সাধারণত-আসলে-প্রকৃতপক্ষে, যাই হোক ইত্যাদি। 

এই শব্দগুলো তো আমাদের ‘কানের সদর থেকে মনের অন্দরে পৌঁছায়’। আর আগের শব্দগুলো বাংলা ভাষাকে দূষিত করে। আরও রয়েছে আরবি-ফারসির আধিক্য। আধিক ছিলো তো আগেও, যা বাংলা আত্মীকরণ করেই নিয়েছে। কারণ বাংলাদেশ মুসলিম-প্রধান দেশ। প্রয়োজনীয় শব্দগুলো স্বাচ্ছন্দেই নিয়েছে বাংলা। যেমন, নামাজ, রোজা, যাকাত, আযান, জানাজা ইত্যাদি। কিন্তু জাজাকাল্লাহ, ইনসাফ, আসতাগফেরুল্লাহ ইত্যাদি শব্দ নতুন করে ঢুকছে। এ শব্দগুলো শূন্য দশকের প্রথম দিকেও ছিলো না। বাংলাদেশের মানুষ আল্লাহর নাম নিয়ে তাদের সুখ-দুঃখ প্রকাশ করে এসেছে। কিন্তু সেটা বাংলার মতো করে। সেটা ছিলো বাংলার সৌন্দর্য। যেমন, দুঃসংবাদে বলেছে ‘হায় আল্লাহ!’ খুশি হয়ে বলেছে, ‘আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন।’ কিন্তু এখন সব কিছুই একটু অতিরিক্ত, যা ভাষার নিজস্বতার প্রতি আঘাত।  

এবারে আসা যাক ব্যাকরণ নিয়ে আলোচনায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভাষা নষ্ট করবার অন্যতম স্থান। ভুল ব্যাকরণের অভয়ারণ্য ফেসবুক। আর এর কল্যাণে সাধারণ মানুষের ভাষা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারপর সাহিত্যিকের হাতে তা গ্রহণযোগ্যতার সার্টিফিকেট পাচ্ছে। ফেসবুকে লিখিত কিছু শব্দ এবং বাক্য বাংলা ভাষার ব্যাকরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। প্রভাব এতো দূর পর্যন্ত পৌঁছেছে যে, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার খাতায় পর্যন্ত লিখছেন। নতুন লেখকরা অনেকে গল্প উপন্যাসেও লেখা শুরু করেছেন। যেমন ধরা যাক, ‘চেনা’ শব্দ দিয়ে একটি পরিচিত বাক্য ‘আপনি কি তাকে চেনেন?’ ফেসবুকে এ বাক্যটি অনেকে লিখছেন- ‘আপনি কি তাকে চিনেন?’ চেনেন হয়ে যাচ্ছে চিনেন। ‘চেনা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘চিহ্ন’ শব্দ থেকে। তাই ‘চি’ ধ্বনি আসা স্বাভাবিক। তবে তা ব্যাকরণের ‘পুরুষ’ ভেদে আসা উচিত। যেমন, উত্তম পুরুষের বাক্যে হবে- ‘আমি তাকে চিনি।’ মধ্যম পুরুষে হবে- ‘তুমি তাকে চেনো।’ নাম পুরুষে হবে- ‘সে তাকে চেনে।’ অর্থাৎ বিশেষ্য ও সর্বনাম পদভেদে ক্রিয়া পদের রূপের পরিবর্তন ঘটেছে: চিনি, চেনো, চেনে। 

এখানে সবগুলো শব্দ ই-কার দিয়ে লেখা যাবে না। শব্দের এই সূক্ষ্ম বিভেদ বর্তমানে অনেকেই মেনে চলছেন না।  আবার চেনা শব্দ দিয়ে কিছু অভ্যস্ত সমাসবদ্ধ পদ রয়েছে যেমন, চেনাজানা, চেনাশোনা ইত্যাদি। এগুলো যদি চিনাজানা বা চিনাশোনা হয়ে যায়, তাহলে শব্দ তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যও হারাবে। এ রকম আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে- ‘বোঝা’ শব্দটির ব্যবহার নিয়ে। বোঝা শব্দটি অনেকে লিখছেন ‘বুঝা’। যেমন, আমরা লিখে আসছি- ‘সে আমাকে বোঝে না!’ এখন লেখা হচ্ছে- ‘সে আমাকে বুঝে না!’ অথবা ‘তুমি বোঝো না’ না বলে বলছে ‘তুমি বুঝো না।’ কিংবা ‘তুমি কি আমার কথা বুঝো না?’ এখানে বোঝা শব্দের অর্থ অনুভব করা বা অনুধাবন করা। শব্দটি উ-কার দিয়ে লেখা হয় তখন, যখন বাক্যটি হয়- ‘বিষয়টি বুঝিয়ে বলো’ বা ‘বিয়ষটি বুঝিয়ে লেখো’ এ রকমভাবে। 

অর্থাৎ একজন কী অনুভব বা অনুধাবন করলেন তা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে কারো সামনে উপস্থাপন করবেন। একটি নিজের অনুভব- বোঝা, আরেকটি নিজের অনুভব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে অন্যের সামনে তুলে ধরা- বুঝিয়ে বলা বা বুঝিয়ে লেখা। পুরুষভেদে হবে- ‘আমি বুঝি’, ‘তুমি বোঝো’, ‘সে বোঝে’। সুতরাং ও-কার এবং উ-কারের যে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান, তা আমরা ভুলতে বসেছি। আবার ‘শোনা’ শব্দটির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটছে। যেমন, ‘তুমি আমার কথা শোনো’ না বলে বলছে ‘তুমি আমার কথা শুনো।’ বর্তমানে ‘উ-কার’ প্রীতি কানে এবং মনে সত্যিই জিজ্ঞাসার সৃষ্টি করছে। 

উপরের বাক্যে ‘শোনো’ বর্তমান কাল। ‘শুনো’ বললে হয়- ‘ভবিষ্যতে শুনে চলো’ এ রকম। আরেকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও একটু স্পষ্ট হতে পারে। যেমন, ‘ওঠা’ হয়ে গেছে ‘উঠা’। ‘এখন ঘুম থেকে ওঠো।’- বর্তমান কাল। অন্যদিকে ‘আগামীকাল সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে উঠো।’- ভবিষ্যৎ কাল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ‘উঠো’কেই বর্তমান কালে ব্যবহার করা হচ্ছে- ‘এখন ঘুম থেকে উঠো।’ ব্যাকরণের নিয়মানুযায়ী এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এ রকম অনেক শব্দই দেখা যাচ্ছে যেগুলো ‘ভবিষ্যৎ কালে’র শব্দ ‘বর্তমান কালে’ ব্যবহার হচ্ছে। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা, বর্তমান অনুজ্ঞা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। 

ফেসবুকে ঘুরে বেড়ানো ‘আনএসপেকটেড হাসব্যান্ড’ নামের একটি গল্পে লেখা রয়েছে, ‘মেয়েটি হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে।’ বাক্যটি পড়ে মনে হয় বাক্যটি শেষ হয়নি। ব্যাকরণের ভাষায় যাকে বলে অসমাপিকা ক্রিয়া। ঘরে ঢুকে কোনো ক্রিয়া সম্পন্ন করবে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু লেখক এখানে বাক্য শেষ করেছেন। তাই বাক্যটি হওয়া উচিত ছিলো- ‘মেয়েটি হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢোকে।’ আরেকটি গল্প ‘প্রিয় ডাক্তার সাহেব’ এর দ্বিতীয় বাক্য- ‘কথাটি শুনতেই চমকে উঠে বাড়ি সদ্য লোক।’ এখানে ‘উঠে’ না হয়ে ‘ওঠে’ লিখলে ঠিক হতো। আর ‘বাড়ি সদ্য’ তো হবেই না হবে ‘বাড়িসুদ্ধ’। এই গল্পেই শুরুর দিকে এক জায়গায় রয়েছে, ‘সে তো গ্রামে আসতেই চাইনি।’ বোঝাই যাচ্ছে এখানে চাইনি-এর স্থানে হবে ‘চায়নি’। কারণ আমি-র সঙ্গে চাইনি হবে। সে-র সঙ্গে হবে চায়নি। আরেক জায়গায় লেখা আছে, ‘আমার ক্ষিদে পাইনি।’ আমরা বুঝতেই পারছি লেখক লিখতে চেয়েছেন, ‘আমার ক্ষিধে বা ক্ষুধা পায়নি।’ এ শব্দগুলো আঞ্চলিক শব্দ হিসেবে আসছে না। সত্যিই অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো বর্তমানের ‘ই’ এবং ‘য়’- এর  এরকম ব্যবহার। 

উপরের চাইনি এবং পাইনি এ সাক্ষ্য দিচ্ছে। আরেকটি শব্দ ‘এটাই’ হয়ে গেছে ‘এটায়’। অর্থের পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। যদি বলা হয় ‘এটাই নাও’, তাহলে বোঝা যাচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট কিছু নিতে বলা হচ্ছে। কিন্তু যদি বলা যায় ‘এটায় নাও’ তাহলে মনে হবে কোনো পাত্রে করে নিতে বলা হচ্ছে। অর্থ আলাদা হচ্ছে, যাচ্ছে। আরেকটি ক্রিয়াপদের ব্যবহারে আসি। যেমন, ‘যাওয়া’ দিয়ে বাক্যগুলো এমন হওয়ার কথা- ‘আমি যাই’, ‘তুমি যাও’, ‘সে যায়’। অথচ কেউ কেউ নির্দ্বিধায় লিখছেন, ‘সে যাই।’ কিংবা ‘অতীত মিথ্যে হয়ে যায় না’ বাক্যটিকে লিখছেন এভাবে- ‘অতীত মিথ্যে হয়ে যাই না।’ এখানে কেবল ব্যাকরণই বিঘ্নিত হচ্ছে না, এর সঙ্গে বাক্যটিও অর্থহীন হয়ে পড়ছে অথবা অন্য অর্থ প্রকাশ করছে। প্রথম বাক্যে অতীতের কোনো ঘটনাকে নির্দেশ করছে, দ্বিতীয় বাক্যে অতীত হিসেবে বক্তা নিজে দাঁড়িয়েছেন। সুতরাং এরা অর্থগতভাবে ভিন্ন। বোনা শব্দটিকে দেখতে পাচ্ছি বুনা হয়ে যাচ্ছে। বীজ বোনা বা তাঁতে বোনা। লেখা হচ্ছে ‘তাঁতে বুনা’ কাপড়। সংস্কৃত বপন থেকে বোনা শব্দ এসেছে। এটাকে বুনা বললে কানে লাগে। আমাদের ভাষায় বুনন শব্দটি রয়েছে। যেমন, কাপড়ের বুনন ভালো- এরকম। অর্থাৎ কাপড়টি কতোটা নিখুঁত এবং সুন্দরভাবে বোনা হয়েছে, তা বলা হয়েছে। এমনি আরেকটি ক্রিয়া মোছা; বলা হচ্ছে ‘মুছা’। বাক্যে প্রয়োগে আসতেই পারে ‘জায়গাটা মুছে ফেলো।’ কিন্তু যদি বলা হয়- ‘জায়গাটা মুছোনি?’ তাহলে ব্যাকরণগত ভুল হয়। বলতে হবে- ‘জায়গাটা মোছোনি?’ এ রকম আরেকটি শব্দ ওনার না বলে ‘উনার’ বলাটাও সমীচীন নয়। আপনি বা সম্মান বোঝাতে ‘উনি’ শব্দটি আমরা বলবো; যেমন, উনি ভালো মানুষ। কিন্তু যখন পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি, তখন বলবো, ওনার নাম (করিম)। এখানেও ‘ও’ এবং ‘উ’ এর পার্থক্য রয়েছে।

শব্দের অর্থগত পরিবর্তন হতেই পারে। কানে লাগলেও আমরা আস্তে আস্তে মেনে নেই। যেমন, ‘অস্থির’ শব্দটি। বর্তমানে এ শব্দটি ব্যবহার হচ্ছে ‘অতি উচ্ছ্বাস’ বোঝাতে। যেমন, কারো সাজ-গোজ দেখে বলছে, ‘তোমাকে যা লাগছে! অস্থির।’ আমাদের ছোটো বয়সে ‘অস্থির’ বলা হতো- যে বাচ্চা বা যে মানুষ সবসময় ছোটাছুটি করে বা স্থির নয় অর্থাৎ ছটফট করে, তাকে। এই ‘ছটফট’ অর্থে রবীন্দ্রনাথ ১৮৮০ সালে প্রথম ‘অস্থির’ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। এরপর ১৯৩৫ সালে ‘গতিশীল’ অর্থে ব্যবহার করেছেন। এই দুটো অর্থেই আমরা ছোটো বেলায় ব্যবহার করেছি। আরও একটি ব্যবহার পেয়েছি ‘পরিশ্রান্ত’ অর্থে। বাক্যটি এমন ছিলো- ‘কাজ করতে করতে অস্থির হয়ে গেছে। তাকে একটু বিশ্রাম নিতে বলো।’ এ ব্যবহার এখনও আছে। এছাড়া প্রথম মালাধর বসু ১৫০০ সালে ‘অস্থির’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন ‘ছত্রভঙ্গ’ অর্থে। লিখেছিলেন, ‘লড়িল তাড়নে দৈস্য করিল অস্থির।’ আরও যে সব অর্থে ‘অস্থির’ ব্যবহার হয়েছে সেগুলো হলো- কাতর, অপ্রস্তুত, চঞ্চল, অধৈর্য, উদ্বিগ্ন, অতিষ্ঠ, ব্যস্ত, ব্যস্তব্যাকুল, এলোমেলো, আকুল, চিন্তিত, বিচলিত, পরিবর্তনশীল, কুটিকুটি (হাসির বিশেষণ), প্রলুব্ধ, প্রবল ইত্যাদি। 

এর মধ্যে অনেকগুলো অর্থই কাছাকাছি, অনেকগুলো একেবারে উল্টো অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানের অর্থটি একেবারে আলাদা। সংস্কৃত স্থির (স্থির এসেছিলো স্থা থেকে) এর নেতিবাচক বোঝাতে অস্থির এসেছিলো। বর্তমানে ইতিবাচক অর্থে রূপান্তরিত হলো। আবার, অনুবাদ শব্দটি ১৫৫০ সালে চণ্ডীদাস ব্যবহার করেছিলেন প্রতিকূলতা অর্থে। এর বর্তমান অর্থ তরজমা বা ট্র্যানস্লেশন। এই শব্দার্থ শুরু করেছেন অক্ষয় কুমার দত্ত, ১৮৪২ সাল থেকে। এ ভাবে অর্থের বিবর্তন আমরা মেনে নিচ্ছি। কিন্তু ব্যাকরণ পরিবর্তনের বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। আমরা যদি কোনো শিশুকে কিংবা কোনো বিদেশিকে বাংলা ভাষা শেখাতে শুরু করি, তাহলে ভাষার গঠন তাকে শেখাতে হবে। তখন এ বিষয়গুলো প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। প্রচলিত ব্যাকরণের সাথে ভাষা মিলবে না।

এ বিষয়ে নতুন করে নিয়ম তৈরি করা যাবে কিনা- তাও জানি না। কারণ ব্যাকরণ না মেনে যে শব্দগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে, সেগুলো নতুন কোনো নিয়ম মেনে পরিবর্তিত হচ্ছে না। পরিবর্তনের ভিত্তি হলো আঞ্চলিক ভাষা এবং এক ধরনের ফুটানি দেখানো। অনেকটা এ রকম যে, আমি এভাবে উচ্চারণ করি- আমি একটু ইংরেজি ঘেষা। কিন্তু এতে বাংলা ভাষার বারোটা বেজে যাচ্ছে।      

১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষাকে পঞ্চম বৃহৎ ভাষা বলে উল্লেখ করেছিলো। এবং ২০০০ সালে ইউনেস্কো বাংলাকে বিশ্বের সবচেয়ে শ্রুতিমধুর ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা হিসেবে ফ্রেঞ্চকে ধরা হতো। তারপর গবেষণায় দেখা গেলো বাংলা ভাষা শুনতে সবচেয়ে মিষ্টি, সুন্দর এবং ব্যঞ্জনাময়। তাছাড়া প্রমিত বাংলা উচ্চারণে শব্দের প্রতিটি ধ্বনি পৃথকভাবে উচ্চারিত হয়। এগুলোর বিবেচনায় বাংলা ভাষার মাধুর্য তুলনামূলকভাবে বেশি। এটা উচ্চারণের উপর ভিত্তি করে মূল্যায়ণ করা হয়েছে। 

দুঃখের বিষয় হলো বাংলা ভাষা উচ্চারণের যে বিশেষ সুর আছে, তা-ও অনেকে অবজ্ঞা করছেন। ইংরেজি ভাষার অনুকরণে বাংলা ভাষা উচ্চারণ করছেন। প্রত্যেক ভাষার ধ্বনিরই আলাদা আলাদা সুর আছে। এই সুর সেই ভাষার প্রাণ। আমরা একজনের কথা শুনে কোন অঞ্চলের মানুষ তা বলে দিতে পারি। প্রমিত বাংলার সেই মধুর সুরটিও বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে।  

আমি মনে করি দুষ্টুমি করেও শব্দ বিকৃত করা উচিত নয়। যেমন, পিও (প্রিয়), এক্টু (একটু), উপ্রে (উপরে), বিম্পি (বিএনপি) ইত্যাদি লেখা হচ্ছে, বলা হচ্ছে। আমাদের ভাষার জন্য এটাও এক সময় ক্ষতিকর হয়ে উঠবে। তাই এখনই সাবধান হওয়া জরুরি। 

আমাদের অবশ্যই ভাষার গঠন এবং সৌন্দর্যের দিকে নজর দেওয়া উচিত। দেশ এবং জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে, নিজের ভাষার ওপর দায়বদ্ধতা থাকলে মানুষ এমনভাবে ভাষাকে দূষিত করতে পারতো না। দায় শিল্পী-সাহিত্যিকদেরও নিতে হবে। কারণ তাঁদের থেকেই দেশের মানুষ ভাষা শেখেন। 

পরিশেষে বলতে চাই অন্য ভাষা শেখা খুব ভালো, কিন্তু নিজের ভাষাকে অবজ্ঞা করে নয়। নিজের ভাষা যদি ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তাহলে সাথে সাথেই সেটা রোধ করবার জন্য সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আমরা নিজেদের ভাষা সম্পর্কে সচেতন হই। আজ শহিদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এই হোক অঙ্গীকার। 

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়