আরবি ভাষা জানা থাকায় এক বড়ো ভাই কিছুদিন আগে ‘সিলসিলা’ শব্দের অর্থ জানতে চাইলেন। আমি বললাম, এটা দরবারি শব্দ। যার অর্থ আধ্যাত্মিক পরম্পরা। তিনি হেসে বললেন, ‘আমাদের উত্তরবঙ্গে সিলসিলার অর্থ মসৃণ, যেমন: সিলসিলা রাস্তা।’
২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। পরিচিত এক ছোটো ভাই ফেসবুকে পোস্ট করল: ‘আমি আমার শত্রুর সাথেও ইনসাফ করতে চাই।’ এটা ওসমান হাদীর বক্তব্য। আমি সেখানে মন্তব্য করলাম: ‘এই ভাষা দিবসেও তুই ‘ইনসাফ’ করছিস! ‘ন্যায়’টা করতে পারলি না?’ সে হাসির ইমোজি দিয়ে বলল, ‘রোজার মাস তো ভাই!’ আমি বললাম, ‘রোজা তো আরবি শব্দ না। বল, রামাদ্বান মাস।’ সে আবার হাসল।
এই হাসির মনোলোগে লুকিয়ে আছে আমাদের ভাষা-মনস্তত্ত্বের এক গভীর দ্বন্দ্ব। সাধারণ বাঙালি মুসলমান ধর্মীয় আবেগে এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে সত্য, কিন্তু মনে আসলে অন্যটা। আমার ছোটো ভাইটিও জানে যে আমি তাকে জুম্মার মুসল্লি হিসেবে চিনি শুধু, প্রতিদিনের নামাজি হিসেবে না। বাঙালি মুসলমানের এমন ধর্মীয় ভাবনা কিছু মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। তাদের এই আবেগ আমাদের এক শ্রেণীর রাজনীতিকরা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে। তারা আমাদের বহুল ব্যবহৃত আরবি-ফারসি শব্দগুলোর রাজনীতীকরণ করছে।
সাতচল্লিশের দ্বিজাতিত্ত্ব নির্ভর আমাদের ভাষাগত দ্বন্দ্ব বায়ান্ন সালেই শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন চব্বিশকে সেই সুতোয় গাঁথা মানে পশ্চাদগামী হওয়া। যেভাবে কয়েকটি রাজনৈতিক দল গণঅভ্যুত্থানকে ‘যুদ্ধ’ বলছে তাতে পরিষ্কার হয়ে যায় তারা ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’, আর ‘ইনসাফ’ এই জাতীয় শব্দগুলো অন্য দশটা আরবি ফারসি শব্দের মতো নয়। ধনী, গরিব, খবর, কবর, দরকার, কারবার- কত আরবি শব্দই না আমরা ব্যবহার করি প্রতিদিন। আমাদের তখনি বোঝা উচিত ছিল ‘জুলাই আন্দোলনকারী’র পরিবর্তে তারা যে ‘জুলাইযোদ্ধা’ শব্দটা ব্যবহার করে তার পেছনেও রয়েছে রাজনীতির ঐতিহাসিক প্রতিশোধ। দুঃখজনক যে অনেক সচেতন মানুষও জুলাইয়ের আবেগের কারণে এই শব্দগুলোর দিকে এতোটা নজর শুরুতে দেননি। এখন শব্দগুলো যখন রাজনৈতিক মোড় নিচ্ছে, অনেকেরই টনক নড়ছে। কিন্তু পূর্বের যে শব্দগুলো ব্যবহার করে ফেলেছেন, তারা সে অভ্যাস এখনও ত্যাগ করতে পারছেন না।
১৯৪৭-৭১ সালের মধ্যে পাকিস্তানি রাষ্ট্র বাংলাভাষীদের ওপর উর্দু চাপিয়ে দেওয়া, বাংলা শিক্ষাকে সীমিত করা, রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করা, কাজী নজরুলের কবিতার মুসলমানিকরণ, সরকারি নথি-লিখন ও সম্প্রচার ব্যবস্থায় উর্দু প্রাধান্য দেওয়া- এসব পদক্ষেপ ছিল ভাষা ও পরিচয় দমন করার জন্য। আমাদের এই ভূখণ্ডের মতোই আয়ারল্যান্ডে ইংরেজরা আইরিশ বা গ্যালিক ভাষার ওপর দমনমূলক নীতি প্রবর্তন করেছিল। নগুগি ওয়া থিয়োং ‘ডিকোলোনাইজিং ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড আদার রেভুলেশনারি আইডিয়াজ’ প্রবন্ধে দেখান:
‘‘১৩৬৬ সালে লন্ডনভিত্তিক ইংরেজ সরকার কিলকেনিতে জারি করা ‘কিলকেনি বিধিমালা’র মাধ্যমে ইংরেজি ভাষার প্রাধান্য জোরদার করেছিল এবং আইরিশ ভাষার ব্যবহারকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখায়। এ ধরনের পদক্ষেপ কেবল ভাষাকে প্রান্তিক করার জন্যই নয়, আইরিশ জনগণের আত্মপরিচয় ও প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যেও পরিচালিত হয়েছিল। পদ্ধতিটি পরে ব্রিটিশদের অন্যান্য উপনিবেশ, যেমন ভারত, আফ্রিকা ও কেনিয়ায় প্রয়োগ করা হয়েছিল, যেখানে মাতৃভাষা বিচ্ছিন্নকরণ এবং ঔপনিবেশিক ভাষার প্রবর্তনকে আধিপত্য স্থাপনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।’’
সময়ের কারণে, স্থানের কারণে ভাষার অর্থ বদলায়।রাজনীতিতে বিষয়টি আরও বেশি লক্ষণীয়। ভাষাতাত্ত্বিক ফার্দিনাঁ দে সোস্যুর তার Course in General Linguistics-এ দেখিয়েছেন যে, কোনো শব্দের অর্থ স্বাভাবিক বা চিরস্থায়ী নয়; তা নির্ধারিত হয় ভাষার ভেতরের পার্থক্য ও সামাজিক ব্যবহারের মাধ্যমে। ফলে ‘বিপ্লব’, ‘আজাদি’ বা অন্য যে কোনো স্লোগান- এসবের অর্থ নির্ভর করে কোন সমাজে, কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এবং কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার হচ্ছে তার ওপর। ভাষা নিজে নিরপেক্ষ নয়; অর্থ তৈরি হয় সামাজিক প্রয়োগ ও সম্পর্কের ভেতর দিয়ে।
একটি শব্দের ঐতিহাসিক উৎস আর তার বর্তমান রাজনৈতিক অর্থ এক নয়। ভাষা কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। শব্দ তার ব্যবহারের ইতিহাস বহন করে। পাকিস্তান আমলের এসব শব্দ ধর্মভিত্তিক রাজনীতির আবহে নতুন অর্থ পাচ্ছে এখন। আমরা অনুধাবন করতে পারছি, কাওয়ালির মতো জনপ্রিয় একটি সাংস্কৃতিক মাধ্যমকে কোন অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে, অথচ বিষয়টি উচ্চরণ করতে পারছি না। কারণ কাওয়ালির বিরোধীতা করা মানে একটা ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির বিরোধীতা করা। এ যেনো শাখের করাত আমাদের। ভয়াবহ বিপদের কথা হলো অনেক বামপন্থী, গণমানুষের সমর্থন পাওয়ার জন্য বর্তমানে ‘আজাদি’ ‘মজলুম’ ‘ইনকিলাব’ বা ‘ইনসাফ’ শব্দগুলো ব্যবহার করছেন।
‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ উপমহাদেশের উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের স্লোগান। ইনকিলাব অর্থ বিপ্লব, জিন্দাবাদ অর্থ দীর্ঘজীবী হোক। ফলে অর্থ দাঁড়ায়- বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। ১৯২১ সালে মাওলানা হাসরত মোহানী প্রথম এই স্লোগান ব্যবহার করেন। মোহানীর পর বিপ্লবী ভগবৎ সিং আদালতে দাঁড়িয়ে এই স্লোগানটি দেন।
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক- এর ইংরেজি ‘লং লিভ দ্য রেভল্যুশন’ ইউরোপীয় বিপ্লবী ঐতিহ্য থেকে এসেছে। ফরাসি বিপ্লবে ম্যাক্সিমিলিয়ান রোবসপিয়ের সময় ব্যবহৃত ‘ভিভ লা রেভল্যুসিওঁ’র ইংরেজি অনুবাদ এটি। রুশ বিপ্লবে ভ্লাদিমির লেনিন বলশেভিক আন্দোলনে রুশ স্লোগান ‘দ্য জ্দ্রাভস্তভুয়েত রেভল্যুৎসিয়া’ ব্যবহৃত হতো, যার ইংরেজি প্রতিরূপ ‘লং লিভ দ্য রেভল্যুশন’। কিউবার বিপ্লবে ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার মুখে শোনা যেত স্প্যানিশ ‘ভিভা লা রেভলুসিওন’, আন্তর্জাতিক পরিসরে যার অনুবাদও একই। অর্থাৎ ভিন্ন ভাষায় ভিন্ন উচ্চারণ হলেও ধারণাটি এক- বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।
এখানেই দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে, কেউ যদি ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ভেতরে নতুন প্রজাতন্ত্র গড়ার কথা বলে, তবে তার স্লোগান কি ভাষাগত আত্মপরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত নয়? বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক- এই বাংলা বাক্য কি কম শক্তিশালী? এই বাক্য কি কেউ ব্যবহার করেনি? বাংলা গান গেয়ে কি চব্বিশের অভ্যুত্থান হয়নি? কত কত পুরনো গান এই অভ্যুত্থানে ফিরে এসেছে। ‘এই শিকল পরার ছল মোদের’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ ‘কারার ওই লৌহ কপাট’, ‘মুক্তিরও মন্দিরে সোপানও তলে’ ‘ধনধান্য পুষ্পে ভরা’- এর মতো গানগুলো কি আমাদের প্রেরণা যোগায়নি?
২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- রাষ্ট্রের ভিত্তি ভাষা। পাকিস্তান উর্দুকে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল; বাংলার মানুষ রক্ত দিয়ে প্রতিরোধ করেছে। তাই ভাষা-সংবেদনশীলতা কেবল আবেগ নয়; এটি রাজনৈতিক দায়িত্ব।
রাজনীতির ভাষা নিয়ে আরেকটি প্রশ্নও জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে ‘ইনকিলাব’ শব্দের সঙ্গে কখনো কখনো যুক্ত হচ্ছে অশালীন বা আক্রমণাত্মক উচ্চারণ। বিপ্লবে যদি গালির ভাষায় প্রকাশ পায়, তবে তার নৈতিক উচ্চতা হারায়। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হান্না আরেন্ট বলেছিলেন, রাজনীতি হলো যুক্তি ও মর্যাদার পরিসর। সেখানে ভাষা যদি প্রতিপক্ষকে অবমাননার অস্ত্র হয়, তবে গণতন্ত্র দুর্বল হয়।
আরেকটি বড় প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় সার্বজনীনতা নিয়ে। সব ধর্মের মানুষ ভোট দিয়ে সরকার গঠন করে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতীকে যদি একধর্মীয় ভাষা বা আচার প্রাধান্য পায়, তবে অন্যরা কোথায় দাঁড়াবে? আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ইউরোপের ধর্মযুদ্ধ অতিক্রম করে নাগরিকত্বকে ধর্মের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সেই প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ ছিল- ফল আমরা ইতিহাসে দেখেছি। তাই ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বিতর্ক কেবল একটি স্লোগানের প্রশ্ন নয়। এটি ভাষা, ইতিহাস, রাজনীতি ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। ব্যক্তিগত জীবনে আমরা বহুভাষিক হতে পারি; কিন্তু জাতীয় প্রতীকে ভাষা হয়ে ওঠে আমাদের আত্মঘোষণা।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো তাঁর গ্রন্থ Discipline and Punish (১৯৭৫) এবং The Archaeologz of Knowledge (১৯৬৯)- এ দেখিয়েছেন, ভাষা কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; ভাষা নিজেই ক্ষমতার কাঠামো নির্মাণ করে। তার ডিসকোর্স ধারণা অনুযায়ী, যে শব্দগুলো জনপরিসরে বারবার উচ্চারিত হয়, সেগুলো ধীরে ধীরে সত্যের মর্যাদা পায় এবং মানুষের চিন্তার সীমানা নির্ধারণ করে। অর্থাৎ ইনকিলাব, আজাদি, ইনসাফ যদি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আবহে ক্রমাগত ব্যবহৃত হয়, তবে সেগুলো কেবল শব্দ থাকে না, পশ্চাদগামী ট্রেনে চড়ে এটি একটি বিশেষ ক্ষমতাবিন্যাসের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে ভাষা নির্বাচন কখনোই নিরীহ নয়; এটি রাজনৈতিক অবস্থানও নির্ধারণ করে।
এখানে কেউ যদি বলে, আমাদের ইসলাম ফোবিয়া আছে তাহলে সে ভুল করবে। আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, আমাদের ইসলাম ফোবিয়া নেই। আমাদের ফোবিয়া ইসলামের রাজনীতিকরণে।
অন্যদিকে জার্মান দার্শনিক ইউর্গেন হাবারমাস তার The Structural Transformation of the Public Sphere (১৯৬২) এবং Theorz of Communicative Action (১৯৮১)- এ বলেছেন, গণতন্ত্র টিকে থাকে যুক্তিনির্ভর যোগাযোগের ওপর। জনপরিসরে ব্যবহৃত ভাষা যদি অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়, তবে সেখানে বিকৃতি সৃষ্টি হয় এবং নাগরিক ঐকমত্য দুর্বল হয়ে পড়ে। তার মতে, একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক ভাষা এমন হওয়া উচিত যা সব নাগরিকের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। সুতরাং রাষ্ট্রীয় বা দলীয় স্লোগানের ক্ষেত্রেও ভাষা এমন হওয়া প্রয়োজন, যা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক গোষ্ঠীর একচেটিয়া চিহ্ন হয়ে না দাঁড়িয়ে সার্বজনীন নাগরিকতার অনুভূতি জাগায়।
ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া আমার সেই ছোটো ভাইয়ের হাসি হয়তো নির্দোষ। কিন্তু তার ভেতরেই আছে এক অচেতন সরে যাওয়া- ‘ন্যায়’ থেকে ‘ইনসাফ’-এ, ‘মুক্তি’ থেকে ‘আজাদি’-তে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই সরে যাওয়াকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নেব, নাকি ভাষার ভেতরে আমাদের নিজস্ব ভিত্তি খুঁজে নেব? একুশ আমাদের শিখিয়েছে- শব্দের ভেতরেই ভবিষ্যৎ বাস করে। তাই শব্দ বেছে নেওয়ার সময় ইতিহাস, নৈতিকতা ও রাষ্ট্রচিন্তার দায় এড়ানো যায় না।
লেখক: গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা