মতামত

ঈদকে ঘিরে অর্থনীতি

মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে দুটি ঈদ আমাদের জীবনে বিভিন্নভাবে প্রভাব রাখে। এর মধ্যে ঈদুল ফিতর ঘিরে হয়তো আনন্দের মাত্রা একটু বেশি থাকে। রমজানজুড়ে ঈদকে উপলক্ষ্য করে অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের উৎপাদন, সরবরাহ এবং ভোগ— তিনটি প্রধান অর্থনৈতিক স্তম্ভই সক্রিয় হয়ে ওঠে। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র এ অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। পোশাক, খাদ্যপণ্য, প্রসাধনী, পরিবহন, আতিথেয়তা, ই-কমার্স, রেমিট্যান্স সব কিছুতেই ঈদ এক বিশেষ গতি নিয়ে আসে। রাজধানী ঢাকার বড় শপিংমল থেকে কুড়িগ্রামের সাপ্তাহিক হাট— সবখানে একটাই চিত্র— কেনাকাটার উৎসব। এ লেখায় ব্যবহৃত তথ্য-উপাত্তসমূহ মূলত পত্রপত্রিকা এবং প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত। 

এ বছরের ঈদকে ঘিরে দেশের ব্যবসায়ী মহল ২ লাখ কোটি টাকার বেশি বাণিজ্যের প্রত্যাশা করছেন। অর্থনীতিকে ঘিরে মানুষের এ প্রত্যাশার গুরুত্ব অনেক। নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসায় সম্ভাব্য স্থিতিশীলতাই এর নেপথ্যে কাজ করছে। তাছাড়া, এ বিশাল সংখ্যাটি কোনো অতিরঞ্জন নয়। কারণ এর পেছনে রয়েছে বোনাস, রেমিট্যান্স, মৌসুমী বিক্রি, পোশাক শিল্পের চাকার ঘোরা এবং কোটি মানুষের একযোগে ভোগ্যপণ্য কেনার তাড়না এবং ভ্রমণ। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ঈদকেন্দ্রিক বাজারের আকার ছিল যথাক্রমে ১.৭ লাখ কোটি ও ১.৯৬ লাখ কোটি টাকা। 

বাংলাদেশের মোট জিডিপি যেখানে ৪৬০ বিলিয়ন ডলার সেখানে ঈদ কেন্দ্র করে এ বিশাল অস্থায়ী ভোগ ব্যয় অর্থনীতিতে সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধিতে কাজ করবে। এ চাহিদার প্রভাব ব্যাপক। কারণ বছরে এ দুটি ঈদ ঘুরে ঘুরে আসে এবং ব্যবসায়ীরা এর জন্য আলাদা পরিকল্পনা করেন।

মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভোগ্যপণ্যের চাহিদায়ও বৈচিত্র্য এসেছে। ঈদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এতদিন পোশাক আর জুতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন মানুষ ইলেকট্রনিক পণ্য যেমন কিনছে, তেমনি উপহার দিচ্ছে। বেড়েছে অনলাইনে ব্যবসা, আবার দেশে-বিদেশে ভ্রমণেও যাচ্ছে। এছাড়া, আগে যেখানে পরিবারের সদস্যের একটি পোশাক দিয়ে ঈদ হতো এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একের অধিক পোশাক কেনার প্রবণতা লক্ষণীয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ঈদ অর্থনীতি দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগ ব্যয়কে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। এ সময়ে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও কিছুটা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে, খুচরা বিক্রেতারা তাদের পণ্য মজুদ বাড়াতে এবং দোকান সাজাতে বিনিয়োগ করেন। ঈদের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো উৎসব বোনাস। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের কর্মীরা বছরে দুটি ঈদে উৎসব ভাতা বা বোনাস পান। সরকারি কর্মচারীরা মূল বেতনের ১০০ শতাংশ হারে উৎসব বোনাস পান। দেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখের উপরে।

এদের বোনাসের মোট পরিমাণ আনুমানিক ১২ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি খাতে ন্যূনতম বোনাসের পরিমাণ মূল বেতনের সমান হলেও বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে বেশিও দেয়। পোশাক শিল্পে ৪০ লাখের অধিক শ্রমিক কর্মরত। তারা ঈদের আগে বোনাস পেয়ে থাকেন। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব বোনাস শুধু নিজেদের ভোগ ব্যয়ে ব্যবহার না করে সমাজের অন্য সকল পেশাজীবী যারা বোনাস পান না তাদের দেওয়া উচিত। যেমন, রিকশাসহ অন্যান্য পরিবহন শ্রমিক, দিন-মজুর, নাপিত, দারোয়ান, ইত্যাদি। আমি বিশ্বাস করি, যারা বোনাস পেয়ে থাকেন তাদের ঈদের আনন্দ এসব পেশার মানুষের সাথে বোনাস শেয়ার করার মাধ্যমেই পরিপূর্ণ হবে। ঈদকে ঘিরে ঢাকায় অস্থায়ীভাবে ভিক্ষাবৃত্তির জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের আগমন ঘটে যারা মূলত ফিতরা ও যাকাত নিতে আসেন। এসব মানুষকেও এ বোনাসের টাকা দেওয়ার জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে।  

কালের পরিক্রমায় বাংলাদেশের ঈদ আনন্দে দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়েছে। এ বাস্তবতায় আমাদের ঈদ অর্থনীতির বর্তমান রূপটি একদিনে তৈরি হয়নি। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ঈদের কেনাকাটা ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং অত্যন্ত সীমিত। তখন মানুষ কেবল নতুন পোশাক ও বিশেষ খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু আশির দশকের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি এবং তৈরি পোশাক শিল্পের প্রসারের ফলে মানুষের হাতে নগদ টাকার প্রবাহ বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের দশকে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের আগমনে মানুষের ফ্যাশন সচেতনতা বাড়ে এবং ভারতীয় ও পাকিস্তানি পোশাকের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। তবে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে দেশিয় ব্র্যান্ডের উত্থানের ফলে দেশিয় পোশাকের প্রতি মানুষের আগ্রহ অনেকটাই ফিরে আসে।

ঈদের বাজারে সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে পোশাক খাত। রমজান মাস শুরু হওয়ার সাথে সাথে দেশের সব বড় শহর থেকে মফস্বল এমনকি গ্রামের বাজার পর্যন্ত পোশাকের দোকানগুলো সেজে ওঠে বিশেষ ঈদ কালেকশনে। দেশিয় ব্র্যান্ডগুলো ঈদের জন্য বিশেষ মার্কেটিং করে থাকে। পত্রিকার খবরে প্রকাশ, এবার বিদেশি ব্র্যান্ডের পাশাপাশি দেশিয় ব্র্যান্ডগুলো ভালো অবস্থানে রয়েছে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারে সুতার দাম বৃদ্ধির কারণে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ হতে আমদানিকৃত পোশাকের দাম এ বছর বেশ বেড়েছে। তবে দামের এ ঊর্ধ্বগতি ক্রেতাদের দেশিয় পোশাকের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করছে যা দেশিয় পোশাক শিল্পের জন্য একটি বড় সুযোগ। এটি একটি ইতিবাচক প্রবণতা, কারণ এতে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও মূল্য সংযোজন বাড়বে। বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক রপ্তানিতে মনোযোগী থাকলেও ঈদকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ বাজারও গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠছে।

দেশে সাড়ে চার হাজারের মতো ফ্যাশন হাউস আছে যার বেশির ভাগই ঢাকা ও চট্টগ্রামে। এখানে বছরে ১৮-২০ হাজার কোটি টাকার পোশাকের বেচাকেনা হয় যার ৩০-৪০ শতাংশই বিক্রি হয় রমজান মাসে। তবে ইদানিং দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহর এমনকি জেলা পর্যায়েও এসব ফ্যাশন হাউস দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। দেশে প্রতিবছর আনুমানিক ২০ কোটি জোড়া পাদুকা বিক্রি হয়। পাদুকার স্থানীয় বাজারে বছরে আনুমানিক ৪ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় যার ৩০ শতাংশই বিক্রি হয় ঈদুল ফিতরে। সে হিসাবে, ঈদকে ঘিরে পাদুকার বাজারের আনুমানিক মূল্য ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। 

মুদ্রাস্ফীতি যেমন সমাজের ধনী শ্রেণিকে প্রভাবিত করতে পারে না, তেমনি ঈদের কেনাকাটার অনেক সামগ্রীর সাথে এ শ্রেণির হয়তো প্রত্যক্ষ সংযোগ নাই। এর একটি হতে পারে ইলেকট্রনিক্স পণ্য। আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সাথে সাথে ঈদের কেনাকাটায় ইলেকট্রনিক্স পণ্যের অন্তর্ভুক্তিও বেড়েছে। বিশেষকরে, ফ্রিজ, টেলিভিশন এবং এয়ার কন্ডিশনারের চাহিদা এ সময় তুঙ্গে থাকে। অনেক পরিবার ঈদের বোনাস বা জমানো টাকা দিয়ে ইলেকট্রনিক্স পণ্য কিনে থাকেন। এছাড়া, স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের বাজারও এ সময় বেশ চাঙ্গা থাকে। ইলেকট্রনিক্স খাতের লেনদেন প্রায় ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। ঈদের সময় খাদ্যপণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ঈদের দিনের বিশেষ রান্নার জন্য পোলাও চাল, মাংস, মশলাপাতি, মিষ্টান্ন — সবকিছুর চাহিদাই বাড়ে। প্রতি বছরই ঈদের আগে এসব পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

ঈদুল ফিতরের আগে ও পরে বাংলাদেশের পরিবহন খাতে এক ভয়ানক চাপ সৃষ্টি হয়। ঢাকাকে হয়তো আমরা নিজের শহরই মনে করি না! তাই ঢাকায় বসবাসকারী প্রায় ২ কোটি মানুষ ঈদে নিজের গ্রামে ফিরে যান। এ বিশাল মানবস্রোত সামলানো দেশের রেল, সড়ক ও নৌপথের জন্য বার্ষিক চ্যালেঞ্জ। পরিবহন খাতে ঈদ অর্থনীতিতে প্রায় ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার লেনদেন করে। এ খাতটি কেবল যাত্রী পরিবহনই নয়, বরং এর সাথে জড়িত জ্বালানি, মেরামত, টোল এবং বিভিন্ন সার্ভিসিং খাতের অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করে তোলে। পরিবহন শ্রমিক, টিকিট বিক্রেতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এ সময়ে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পান। শহর থেকে মানুষের গ্রামে ফিরে যাওয়াকে অর্থনীতিবিদরা ‘রিভার্স মাইগ্রেশন’ হিসেবে অভিহিত করেন। এ বিশাল জনস্রোত শহর থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রামে নিয়ে যায়। এর ফলে গ্রামীণ বাজারগুলোতে কেনাকাটা ও লেনদেন কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবমতে, সারাদেশে প্রায় ২৫-২৮ লাখ দোকান (মুদি দোকান থেকে কাপড়ের দোকান) রয়েছে। এসব দোকানে বছরের বাকী সময় প্রতিদিন ৩ হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হলেও রোজার মাসে ঈদ উপলক্ষ্যে সেটি তিনগুণ বেড়ে ৯ হাজার কোটি টাকায় উত্তীর্ণ হয়। গড় হিসাবে এসব দোকানে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার ওপরে ভোগ্যপণ্য বিক্রি হবে। যদিও এর পুরাটা ঈদকে কেন্দ্র করে নয়, তবে এর একটি বড় অংশ ঈদকে ঘিরেই পরিচালিত। এবারের ঈদে সরকার কর্তৃক ঘোষিত ছুটি অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় ঈদের ২/৩ দিন আগে থেকেই ঢাকা শহর শান্ত হয়ে গিয়েছে। ফলে জিনিসপত্রের দামও অনেকক্ষেত্রে কম পরিলক্ষিত হচ্ছে।

দৃশ্যমান রূপান্তরের আরেকটি দিক হচ্ছে এখন মানুষ ঈদের ছুটিতে বিভিন্ন পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রেও ভ্রমণ করছেন। এতে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও স্থানীয় শিল্পকলার বাজার প্রসারিত হচ্ছে। পর্যটন খাতের এ মৌসুমি লেনদেন প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা স্থানীয় ছোট উদ্যোক্তা ও গাইডদের কর্মসংস্থানে সরাসরি ভূমিকা রাখে। আশার বিষয়, কক্সবাজার, সিলেট, পার্বত্য এলাকা এবং সুন্দরবনের মতো পর্যটন অঞ্চল ছাড়াও দেশের অন্যান্য নতুন নতুন এলাকা পর্যটন কেন্দ হিসেবে বিকশিত হচ্ছে। 

বাংলাদেশের ঈদ অর্থনীতিতে গত এক দশকে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো নারী উদ্যোক্তাদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। বিশেষ করে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নারী উদ্যোক্তাগণ তাদের নিজস্ব ফ্যাশন হাউস ও বুটিক ব্যবসা পরিচালনা করছেন যা ‘এফ-কমার্স (Facebook Commerce)’ এর ফলেই সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ঈদের সময় মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। মানুষ কেবল কেনাকাটাই নয়, বরং গ্রামে থাকা স্বজনদের টাকা পাঠাতে কিংবা বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করতে এমএফএস ব্যবহার করে। ঈদের আগে এটিএম বুথগুলোতেও নগদ টাকা তোলার হিড়িক পড়ে যায়। ব্যাংকগুলো এ সময় এটিএম বুথগুলোতে পর্যাপ্ত নগদ টাকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়। এছাড়া, অনলাইন ব্যাংকিং এবং ইন্টারনেট পেমেন্ট গেটওয়েগুলোও এ সময় সক্রিয় থাকে যা ঈদ অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করছে। ডিজিটাল লেনদেনের এ বৃদ্ধি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। আগামী বছরগুলোতে অনলাইন বিক্রি আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঈদকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রেমিট্যান্স; যা সরাসরি ভোগ ব্যয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। দেশিয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে টাকা পাঠিয়ে ভালো বিনিময় হার পাওয়ায় প্রবাসীদের বেশিরভাগ এখন ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন যা অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক। রেমিট্যান্সের হাত ধরে বাড়ছে রিজার্ভের আকারও।

ঈদকে ঘিরে অর্থনীতি দেশের জন্য ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনলেও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিভিন্ন সময়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, পরিবহন ব্যবস্থার অস্থিরতা, ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের বিস্তার, অতিরিক্ত ভোগবাদিতা আমাদের ঈদের প্রকৃত আনন্দকে ম্লান করে দেয়। বলতে দ্বিধা নাই, আধুনিক সময়ে ঈদকে ঘিরে অতিরিক্ত ভোগবাদের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। অনেকে পরিবারের চাপে সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে কেনাকাটা করছেন, ঋণগ্রস্ত হয়ে মানসিক চাপ সহ্য করছেন। ‘ঈদ সাজসজ্জা’ এবং ‘উপহার’ এর নামে অপ্রয়োজনীয় খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে যা পারিবারিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ভোগবাদী মনোভাব থেকে সরে এসে ঈদের প্রকৃত আধ্যাত্মিক এবং ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধে ফিরে আসাই যৌক্তিক। 

ঈদের অর্থনীতির জটিল অন্ধকার দিক হলো মূল্যস্ফীতির চাপ। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে যা ঈদকে ঘিরে আরও চাপ সৃষ্টি করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ১০.৮৭ শতাংশ। ২০২১ সালের পর থেকে বাংলাদেশি টাকা ডলারের বিপরীতে ৪৩ শতাংশ দুর্বল হয়ে যাওয়া এ মুদ্রাস্ফীতির একটি বড় কারণ। এ দামবৃদ্ধি মূলত কম আয়ের মানুষকে বেশি প্রভাবিত করে থাকে। তাই এ অর্থনৈতিক উৎসবকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও সুষম করে তুলতে হলে ন্যায্য মজুরি ও বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, ডিজিটাল অবকাঠামোর বিকাশ এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে ঈদের আনন্দকে কেবল উৎসব হিসেবে উদযাপন না করে একটি টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরের অনুঘটক হিসেবেও বিবেচনা করার অবকাশ রয়েছে।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক