আলাচিত অভিনেত্রী জেবা বখতিয়ারের আসল নাম শাহিন। ১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বর বালোচিস্তানের কোয়েটায় তার জন্ম। পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ, প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল ইয়াহিয়া বখতিয়ারের কন্যা তিনি। জেবা যখন বলিউডে পা রাখেন, তখন পাকিস্তানি অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকাদের ভারতে কাজ করা নিয়ে এখনকার মতো কড়াকড়ি ছিল না। তবে বিনোদন জগতে জেবা ক্যারিয়ার শুরু করেন পাকিস্তান থেকে। পাকিস্তানের ছোটপর্দায় তার অভিনয় ক্যারিয়ার শুরু।
১৯৮৮ সালে ‘আনারকলি’ নামে একটি ধারাবাহিকের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন জেবা। প্রচারে আসার পর তার অভিনয় প্রশংসা কুড়ায়। সেখান থেকেই বলিউডের নজরে পড়েন এই অভিনেত্রী। ১৯৯১ সালে বলিউডে কাজ শুরু করেন জেবা। রণধীর কাপুর পরিচালিত-প্রযোজিত ‘হেনা’ সিনেমায় প্রথম অভিনয় করেন তিনি। সিনেমাটিতে ঋষি কাপুরের বিপরীতে দেখা যায় তাকে। ‘হেনা’ সিনেমা মুক্তির পর বলিউডে ডাকসাইটে সুন্দরী নায়িকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন জেবা।
‘হেনা’ সিনেমা মুক্তির পর সুপারহিট হয়েছিল। তারপর রাতারাতি তারকা তকমাও পেয়ে যান জেবা। এ সিনেমার পর জেবা আরো অনেক সিনেমায় কাজ করেন। এ তালিকায় রয়েছে—‘মহব্বত কি আরজু’, ‘স্টান্টম্যান’, ‘জয় বিক্রান্তা’, ‘সরগম’, ‘মুকাদমা’, ‘চিফ সাহেব’, ‘বিন রোয়ের’ এর মতো সিনেমায় অভিনয় করেন জেবা। অন্যদিকে, ‘আনারকলি’ ছাড়াও ‘তানসেন’, ‘মুলাকাত’, ‘মুকাদ্দাস’, ‘মেহমান’, ‘মুসৌরি’, ‘দূরদেশ’, ‘সমঝোতা এক্সপ্রেস’ এর মতো টিভি সিরিজে অভিনয় করেন তিনি। তবে ‘হেনা’ সিনেমার মতো আর সাফল্য পাননি এই অভিনেত্রী।
জানা যায়, জেবার ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার নেপথ্যে ছিল তার ব্যক্তিগত জীবন। চারবার বিয়ে করেছিলেন তিনি। তিনবার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। ব্যক্তিগত সম্পর্কের চাপ উতরে ক্যারিয়ারে বিশেষ মন দিতে পারেননি। আর সে কারণে রুপালি পর্দা থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যান জেবা।
অভিনয়ের মাধ্যমে জেবা যথাটা আলোচিত হয়েছেন, তেমনই ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও সমালোচিত হয়েছেন। বার বার সম্পর্কে জড়িয়ে বিচ্ছেদের পথে হেঁটেছেন এই অভিনেত্রী। অভিনয় শুরু করার আগেই প্রথম বিয়ে করেন জেবা। ১৯৮২ সালে সালমান ভ্যালিয়ানি নামে এক পাকিস্তানি ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ দম্পতির একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। কিন্তু কন্যাসন্তান জন্মের পর স্বামীর সঙ্গে জেবার সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। ১৯৮৬ সালে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন তারা। বিচ্ছেদের পর তাদের কন্যাসন্তানকে দত্তক নেন জেবার বোন।
সালমানের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর অভিনয়জগতে পা রাখেন জেবা। ১৯৮৮ সালে ‘আনারকলি’ ধারাবাহিকে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। তারপর বলিউডে অভিনয়ের সুযোগ পান জেবা। তবে বলিউডে পা রাখার আগে এই ইন্ডাস্ট্রির কৌতুকাভিনেতা জাভেদ জাফরিকে বিয়ে করেন তিনি। ১৯৮৯ সালে জাভেদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন। কিন্তু বিয়ের খবর পুরোপুরি গোপন রাখেন জাভেদ। পরে জেবা এই বিয়ের খবর প্রকাশ্যে আনেন, পরবর্তীতে জাভেদও বিয়ের কথা স্বীকার করেন। তবে তাদের বিয়ে বেশি দিন টেকেনি। এক বছরের ব্যবধানে ভেঙে যায় জেবার দ্বিতীয় সংসারও।
বলিউড ছেড়ে ফের পাকিস্তানে ফিরে যান জেবা। সেখানে গিয়ে বড়পর্দা এবং ধারাবাহিক নাটকে কাজ শুরু করেন এই অভিনেত্রী। দ্রুত সময়ের মধ্যে ফের পাকিস্তানি ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জায়গা তৈরি করে ফেলেন। ধারাবাহিকে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এই সময়ে গায়ক আদনান সামির সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন জেবা। জাভেদের সঙ্গে বিচ্ছেদের তিন বছরের মধ্যে আদনানকে বিয়ে করেন তিনি। জেবার চেয়ে নয় বছরের ছোট ছিলেন আদনান। বয়সের ফারাক থাকা সত্ত্বেও জেবার প্রেমে পড়েন এই সংগীতশিল্পী।
১৯৯৩ সালে আদনান সামিকে বিয়ে করেন জেবা। কিন্তু অভিনেত্রীর সেই সম্পর্কও টেকেনি। আদনানকে বিয়ের পর কয়েকটি হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন জেবা। কিন্তু ‘হেনা’ যে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল, তার ছিটেফোঁটাও আর মেলেনি জেবার ভাগ্যে। ১৯৯৫ সালে একটি উর্দু ভাষার সিনেমা পরিচালনা করেন জেবা। কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে আদনানের সঙ্গে তার সম্পর্কে তিক্ততা তৈরি হয়। ১৯৯৭ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এ সংসারে তাদের একটি পুত্রসন্তান রয়েছে।
আদনান সামির সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর অভিনয় নিয়ে আরো ব্যস্ত হয়ে পড়েন জেবা। অভিনয়ের পাশাপাশি সিনেমা পরিচালনা এবং প্রযোজনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। আদনান সামির সঙ্গে বিচ্ছেদের পর অনেক দিন আর কোনো সম্পর্কে জড়াননি জেবা। সর্বশেষ ২০০৯ সালে পাকিস্তানের সোহেল খান লেঘরিকে বিয়ে করেন তিনি। গত ১৮ বছর ধরে সোহেলের সঙ্গেই সংসার করছেন এই অভিনেত্রী। তবে কোনো কোনো প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০১০ সালে এ সংসারও ভেঙে গেছে জেবার। এ অভিনেত্রী এখন পাকিস্তানে বসবাস করছেন। তবে অভিনয় থেকে সরে এসেছেন। আলোচনা আর মিডিয়ার লাইমলাইট থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন এই অভিনেত্রী।