নৃপেন রায়ঢাকা, ২ ফেব্রুয়ারি : সারা দেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডারদের রগকাটার শিকার হয়েছে।
গত এক বছরে এমন নৃসংশ ঘটনা ঘটেছে শতাধিক। আহতরা প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। কিন্তু এখনো উন্নত চিকিৎসার জন্য গুণছে অপেক্ষার প্রহর। মামলা হলেও ধরা পড়েনি দুর্বৃত্তের দল।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার দাবিতে সহিংস আন্দোলন গড়ে তোলে। এই আন্দোলনে সারা দেশে বেপরোয়া হয়ে ওঠে জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডাররা। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সর্বোচ্চ রায়কে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিবিরের নৃসংশতার শিকার হয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ লীগ, ছাত্রলীগের নেতারা। অনেকেরে হাত পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। অনেককে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয় । কারো কারো কেটে নেওয়া হয় হাত-পা।
বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আধিপত্য ও দখল ফিরে পেতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ওপর প্রকাশ্যে ও গোপনে চড়াও হয় শিবিরের নেতাকর্মীরা। দীর্ঘ চিকিৎসার পর জীবন ফিরে পেলেও স্বাভাবিকতা ফিরে পায়নি তারা। অনেকে অর্থাভাবে নিতে পারছেন না উন্নত চিকিৎসা। নিজের জীবনের পাশাপাশি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে পরিবারের ভবিষ্যতও।
রাইজিংবিডির প্রতিনিধিরা খোঁজ নিয়েছেন নৃসংশতার শিকার এসব নেতাকর্মীর।
গত বছরের ১৩ মার্চ রাতে রাজশাহীতে শিবিরের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এরই জেরে জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা ৩০ নম্বর ওয়াডর্ (দক্ষিণ) আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম শহীদকে গুরুতর ভাবে কুপিয়ে দুই পায়ের রগ এবং ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি রহুল আমিনের হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে শহীদুল এখন কিছুটা চলাফেরা করতে পারেন। কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মরে বেঁচে আছি। ওরা রগ কেটে জীবনটার হিসেব পাল্টে দিয়েছে। স্বাভাবিকতা কোনদিন ফিরবে না। জানা গেছে, উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন- চিকিৎসক সেসময় বলেছিল। এখন চিকিৎসা নিতে পারছি না অর্থাভাবে।
গত বছর ২৩ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদ আল হোসেন ওরফে তুহিনের ওপর হামলা চালিয়ে দুই হাত ও দুই পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির ক্যাডাররা।
তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, দলীয় নেতারা ওই সময় একটু খোঁজখবর নিয়েছেন। চিকিৎসার প্রাথমিক কিছু খরচও কেউ কেউ দিয়েছেন। কিন্তু হামলায় ডান হাতের আঙুলে কোপ লেগে পাঁচ টুকরা হয়ে যায়।
সেগুলো কোনোমতে অপারেশন করে জোড়া লাগানো হয়েছে। এখন উন্নত চিকিৎসার জন্য সাত আট লাখ টাকা প্রয়োজন। কারণ এই টুকরো হওয়া আঙুল জোড়া লাগানোর চিকিৎসা সিঙ্গাপুরে করতে হবে।
তিনি আরো বলেন এখন চেষ্টা করছি নেতাদের বলছি, তাদের পাশে ঘুরছি। দেখি কি হয় বলে একটু ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই ছাত্রলীগ নেতা।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ রাইজিংবিডিকে বলেন, দলীয়ভাবে হামলার শিকার বিভিন্ন জনকে সহযোগিতা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় মন্ত্রী-এমপি এবং নেতাদের।
‘দল এই রগকাটাদের সু চিকিৎসার ব্যাপারে আরো কি ব্যবস্থা নিচ্ছেন’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দলীয়ভাবে সেরকম উদ্যোগ নেই। তবে একান্তই কারো জন্য সেরকম ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন পড়লে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হবে।
তবে রাজশাহীতে বিভিন্ন সময়ে রগকাটার শিকার হয়েছেন আরো কয়েকজন। তারা হলেন, গত বছরের ৯ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুল ইসলাম সাদ্দাম শিবিরের হামলার শিকার হয়। হামলায় তার পিঠের মাংস ও হাড় কেটে যায়। ফুসফুসের একাংশও কেটে যায়। সে হামলায় তুফান নামে এক নেতাও গুলিবিদ্ধ হয়।
গত ২৯ নভেম্বর রাজশাহী নগরীর বিনোদপুর হানুফার মোড়ে সেলিম রেজা সেলু নামের সাবেক ছাত্রলীগ নেতার ডান হাতের রগ ও বাম হাতের আঙুল কেটে দেয় শিবির ক্যাডাররা।
এছাড়া গত ১ নভেম্বর বগুড়ায় আযিযুল হক কলেজ ছাত্রলীগ নেতা বেনজির আহমেদ (২৪) বা হাতের রগ কেটে দেয় শিবিরের নেতাকর্মীরা। গত ১১ অক্টোবর সিলেট শাহজালাল ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা (শাবি) ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি অঞ্জন রায়ের রগ কেটে দেয় শিবির। গত ২৬ নভেম্বর লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ বাজারে মসজিদের ভেতর ইমন হোসেন সুজন নামে (২৫) ছাত্রলীগ নেতার রগ কাটে শিবিরকর্মীরা।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীতে ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল ইসলাম মিঠুনের হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয় শিবিরের দুর্বৃত্তরা। গত ১৮ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিমুল আহমেদ ডিউক নামে এক ছাত্রলীগ নেতার হাত ও পায়ের রগ কাটে জামাত শিবির ক্যাডাররা। গত ৬ ডিসেম্বর হাজী মুহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অরুণ কান্তি বিশ্বাস শিটনের পায়ের রগ কাটে এই দুর্বৃত্ত চক্র।
গত ১১ সেপ্টেম্বর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোশাররফ হোসেনের দুই হাত-পায়ের রগ কাটে শিবির কর্মীরা। ২০১২ সালের গত ২১ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি আখেরুজ্জামান তাকিমের রগ কেটে দেয় জামায়াত শিবির ক্যাডারদের একটি দল।
গত ১১ ডিসেম্বর ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার তালশার ইউনিয়নের হরিণদিয়া ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম হাত-পায়ের রগ কেটে দেয় শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডাররা।
গত ১২ নভেম্বর চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার মো. আবু ছৈয়দ (২৯) নামে যুবলীগের স্থানীয় এক নেতার হাতের রগ কেটে দিয়েছিল মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা। অভিযোগ আছে শিবির ক্যাডাররাই এই হামলা করে।
এছাড়া কিছুদিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের নুর জাহান নামের নারী ইউপি সদস্যের উপর হামলা করে পায়ের রগ কেটে দেয় জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। এর আগে উপজেলা ছাত্রলীগের নেতা কারিবুল হক রাজিনের হাত পায়ের রগ কাটে একই চক্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য বলেন, এ রকম হামলার শিকার নেতাকর্মীদের তথ্য সংগ্রহ করতে সংশ্লিষ্টদের দলীয় ভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে তাদের আবেদন এবং তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মাধ্যমে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সরকার। তবে সেটা একটু সময় লাগবে বলেও পরোক্ষ ইঙ্গিত দেন তিনি।
জানা গেছে রগ কাটার শিকার এসব নেতাকর্মী দুর্বিসহ জীবন কাটাচ্ছেন। ঘটনার পর অনেকেই সমবেদনা জানালেও এখন কেউ আর খোঁজ নিচ্ছে না। তাদের উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও সে উদ্যোগ নেই। দলীয় নেতাদের কাছে গেলেও তারা আর আগের মতো আচরণ করেন না।
রাইজিংবিডি / নৃপেন / এএম