ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করতে যাচ্ছে বিএনপি। আগামীকাল শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ইশতেহার ঘোষণা করবে।
দলীয় সূত্র বলছে, এবারের ইশতেহারে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, দুর্নীতি রোধ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, তরুণদের কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন এবং কৃষি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে জনমুখী নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হবে।
অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন বলে রাইজিংবিডি ডটকমকে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য মাহদী আমিন।
জানা গেছে, বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা এবং জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোকে ইশতেহারের মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড এবং কৃষক কার্ড চালুর পরিকল্পনা রাখা হচ্ছে, যার মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে।
ইশতেহারে দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালী করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকছে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রতিশ্রুতি রাখছে দলটি। বিএনপি নির্বাচিত হলে এক কোটি নতুন চাকরি সৃষ্টি, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ এবং বিদেশে নতুন শ্রমবাজার তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী প্রায় সাড়ে চার কোটি তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বেকার ভাতা চালুর প্রতিশ্রুতিও থাকছে ইশতেহারে। যুক্তরাজ্যের আদলে দেশে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।
কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষি উপকরণের দাম কমানো, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষিঋণ সহজীকরণ এবং ধান-চাল ক্রয়ে স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি রাখা হচ্ছে। কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি সহায়তা কর্মসূচিও ইশতেহারের অংশ হতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
নারীর ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ সৃষ্টি, নারী উদ্যোক্তা তহবিল গঠন, মাতৃত্বকালীন ভাতা বৃদ্ধি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনাও ইশতেহারে থাকছে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সম্পত্তি দখল রোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, নিরাপত্তা সেল চালু এবং ধর্মীয় উৎসবে রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হবে।
ধর্মীয় শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রেও কিছু উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। কওমি মাদ্রাসার উন্নয়ন, ইসলামিক গবেষণা তহবিল গঠন, ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং ধর্মচর্চার অবাধ পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থাকছে। পরিবেশ সুরক্ষায় দেশব্যাপী খাল ও নদী পুনর্খনন, ২৫ কোটি গাছ রোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এছাড়াও দলীয় নেতারা মনে করছেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘোষিত ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ কর্মসূচির রূপরেখাও ইশতেহারের মাধ্যমে আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশল জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, ইশতেহার তৈরির ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের প্রত্যাশা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই ইশতেহার চূড়ান্ত করা হয়েছে। দলটির বিশ্বাস, এবারের ইশতেহার দেশের রাজনীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করবে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।