রাজনীতি

রাতজাগা প্রচারে অলিগলি সরব, সাড়ে ৭টায় লগ্ন শেষ

পুরান ঢাকার গোয়ালঘাট লেন। স্বাভাবিক দিনে রাত ১০টার পর যেখানে লোকজনের চলাচল খুব একটা চোখে পড়ে না, সেখানে মঙ্গলবার গভীর রাতেও দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। চারপাশে মানুষের কোলাহল, নির্বাচনি প্রতীক আর প্রার্থীর নামে স্লোগানে মুখর অলিগলি-রাজপথ। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রচারের লগ্ন শেষ হচ্ছে মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায়। সেই লগ্নশেষের বাঁশি বেজে ওঠার আগে রাতজাগা কয়েক ঘণ্টার ভোটের প্রচার বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, যা ১৭ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে নির্বিঘ্নে উৎসবমুখর প্রচারের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

ঢাকা-৬ আসনের একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীকে গভীর রাতে গোয়ালঘাট লেন ধরে প্রচার করতে দেখা যায়। শেষসময়ের প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগাতে নির্বাচনি এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন তিনি।

একই মহল্লার রাস্তার বিপরীত পাশে দেখা গেল ঢাকা-৭ আসনের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে। প্রচার গাড়ির সঙ্গে তিনি ঘুরছেন অলিতে-গলিতে; সঙ্গে রয়েছেন কর্মী-সমর্থকরা।

গভীর রাত ভোরের দিকে যতই এগিয়ে যাচ্ছে প্রচারে ভিড় কমলেও কর্মী-সমর্থকরা সজাগ রয়েছেন মোড়ে মোড়ে। শোভা পাচ্ছে ব্যানার, লিফলেট। ভোটে হার-জিতের হিসাব-নিকাশ অলিগলি, চায়ের দোকান থেকে ঘরের আড্ডায় উত্তাপ বাড়াচ্ছে। অনেক প্রার্থীই শেষ সময়ের হিসাব মেলাতে কাটাচ্ছেন নির্ঘুম রাত।

নবাবপুর রোডের চেরুর চায়ের দোকান যেন পরিণত হয়েছে একটি ছোট রাজনৈতিক গবেষণাকেন্দ্রে। কাঠের বেঞ্চে বসে কয়েকজন চায়ের কাপ হাতে আলোচনা করছেন কে কোন এলাকায় শক্ত অবস্থানে, শেষ রাতের প্রচার কার পক্ষে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তরুণ ভোটাররা কার দিকে ঝুঁকছেন- সব নিয়েই চলছে বিশ্লেষণ।

চায়ের দোকানের এক কোণে বসে থাকা ষাটোর্ধ্ব জয়নুদ্দীন বলেন, “এবার ভোটটা আলাদা। মানুষ চুপচাপ শুনছে কিন্তু ভেতরে ভেতরে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।”

আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই শেষ হচ্ছে প্রচার। শুধু ঢাকা-৬ বা ঢাকা-৭ নয়, প্রার্থীদের এই নির্ঘুম প্রচারের চিত্র দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনেই। নগর-মহানগর, শহর-গ্রামের পাড়া-মহল্লা থেকে মেঠোপথ; সবখানেই ভোটের আমেজ।

সকালে শেষ হচ্ছে প্রচার, ইসির প্রস্তুতি সম্পন্ন নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে সব ধরনের নির্বাচনি প্রচার বন্ধ হয়ে যাবে। সে অনুযায়ী মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা হলেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সব ধরনের প্রচার শেষ হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের পর কোনো সভা-সমাবেশ, মিছিল, প্রচারপত্র বিতরণ কিংবা গণমাধ্যমে প্রচার চালানো যাবে।

ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে একযোগে নিরবচ্ছিন্ন ভোটগ্রহণ হবে। ২৯৯টি সংসদীয় আসনে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারে ভোট নেওয়া হবে। 

শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে আসনটির নির্বাচন বাতিল হওয়ায় এবার একযোগে ৩০০টির পরিবর্তে ২৯৯টি আসনে ভোট হচ্ছে। 

এরইমধ্যে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে ভোটগ্রহণের যাবতীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রতিটি জেলার ডিসি ওই জেলার সব আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২২০ জন।

সারা দেশে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হওয়ায় বুথ ও ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে ব্যালট গণনায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে বলে আভাস দিয়ে রেখেছে ইসি ও সরকার।

নির্বাচন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দায়িত্ব পালন করবেন মোট ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা। এর মধ্যে ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

ভোটের মাঠে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকছেন সেনাবাহিনীর ১ লাখ সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ সদস্য।

ভোট পর্যবেক্ষণে থাকবে ৮১টি পর্যবেক্ষণ সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন দেশি পর্যবেক্ষক। বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক থাকছেন ৫৪০ জন।

এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫১টি রাজনৈতিক দল। মোট প্রার্থী ২ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি ২৮৭ জন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন প্রার্থী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা এবং জাতীয় পার্টির ১৯৮ জন প্রার্থী লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৭৬ জন ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন।