নির্বাচনপরবর্তী সারা দেশে নেতাকর্মী, ভোটারদের ওপর হামলা ও বাড়িতে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনার অভিযোগ তুলে এসব বন্ধ না হলে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক হয়। বৈঠকের পর জোট নেতাদের সঙ্গে নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে হাজির হন জামায়াত আমির।
বৈঠকে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল ও নির্বাচনপরবর্তী অবস্থা পর্যালোচনাসহ ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন ১১ দলের নেতারা।
তাদের বৈঠকে নির্বাচনে আপত্তির বিষয়গুলোর মধ্যে উঠে আসে ভোট কারচুপি, নির্বাচনি এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা ও বের করে দেওয়া এবং ভোট গণনাসহ আরো বেশি কিছু অনিয়মের ঘটনা
ব্রিফিংয়ে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর ভোটপরবর্তী ফ্যাসিবাদী কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানান। তিনি বলেন, “এসব এখনই বন্ধ করুন, এখনই। গতকাল (১২ ফেব্রুয়ারি) থেকে আজ (১৩ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত যা হয়েছে, তার তীব্র নিন্দা জানাই।”
বিভিন্ন জায়গায় রেজাল্ট শিটে ঘষামাজা করা, কারচুপি করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বিজয়ী করা, কিছু আসনে দ্বৈতনীতি গ্রহণ, সেন্টার দখল, ঢাকা-১৩, খুলনা-৫ আসনসহ যেসব স্থানে অন্যায় করা হয়েছে, সেসব আসনে প্রতিকার চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে। সুনির্দিষ্ট সময়ে প্রতিকার না পেলে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশর পক্ষে থাকবে ১১ দলীয় ঐক্য। ফ্যাসিবাদের বিষয়ে আপসহীন থাকবে ১১ দলীয় ঐক্য।
বৈঠকের পর প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াত আমির বলেন, “যেসব আসনে ভয়াবহ অনিয়ম হয়েছে, আমাদের পক্ষ থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আমরা তার প্রতিকার চাইব। কিন্তু হাস্যকর, এত কিছু করার পরও একটা পক্ষ সন্তুষ্ট হতে পারছে না। ভোট কেড়ে নেওয়া, রেজাল্টে বিভিন্ন রকম ম্যাকানিজম করা, এখন আবার সেই সিটগুলোর বিরুদ্ধে অনেকে আবার নতুন কষরত করা শুরু করেছে। কী চাচ্ছেন আপনারা, জাতির সামনে পরিষ্কার করে বলে দেন।”
ভোটপরবর্তী পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “কোনো কোনো জায়াগায় ফ্যাসিবাদীদের এখন ঘোষণা দিয়ে পুনর্বাসিত করা হচ্ছে। নির্বাচনি প্রচারের সময়েও তা লক্ষ করেছি। তবে মনে রাখবেন, কিছু মানুষ জুলাই রক্ত দিয়ে আমাদের এই সুযোগ এনে দিয়েছে।”
গণভোটের বিষয়ে তিনি বলেন, “সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ গণভোটের পক্ষ রায়। এখন তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব যারা বিজয়ী হয়েছেন তাদের। আমরা সহযোগিতা করব।”
১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, নতুন ধারার সুস্থ রাজনীতির পক্ষে থাকবে ১১ দলীয় জোট। নির্বাচনের আগের প্রতিশ্রুতি অব্যাহত থাকবে। নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়া হবে এবং কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। কোনো দল নয়, আপামর জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশনের আরপিওতে যেটির সুযোগ নেই, এমন ঋণখেলাপি অবস্থায় নির্বাচিত ঘোষণা করা প্রার্থীদের ফলাফল স্থগিত রাখাতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি দাবি জানান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, “আরপিওর লঙ্ঘন ১১ দলীয় ঐক্য মানবে না। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে যে রায় এসেছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।”
প্রেস ব্রিফিংয়ে ডা. শফিকুর বলেন, “আমাদের ভদ্রতা ও ইতিবাচক আচরণকে দুর্বলতা মনে করলে ভুল করবেন। কারণ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জানানোর পরেও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় কর্মী সমর্থকদের ওপর হামলা হচ্ছে। এটা ফ্যাসিবাদী লক্ষণ। ফ্যাসিবাদ আবারো দেখা দিলে তা দুর্ভাগ্য। এ দায় তাদের ওপর আসবে। ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশে থাকতে হলে ঐক্য নিয়েই থাকতে হবে। সংবিধানের আলোকে সবাই সমান। সবার জন্য একই নীতি হতে হবে। যদি ফ্যাসিবাদ ফিরে আসে আবারও তাহলে আমরা ছাড় দেব না।”
নির্বাচনের রাতের মতো কাস্টিং ভোট নিয়ে ব্রিফিংয়ে জামায়াত আমির বলেন, “নাসীরুদ্দীনের ওখানে যে কারণে একসেপ্ট (ভোট) করা হয়েছে, তা মামুনুল হকের এখানে বাতিল হয়েছে। সেক্রেটারি জেনারেলের আসনসহ বেশকিছু আসনে এমন হয়েছে। যাদের আসনে এমন হয়েছে, আমরা তার প্রতিকার চাই। সুনির্দিষ্ট তারিখের ভেতর প্রতিকার না হলে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। যা হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। বন্ধ না হলে আমরা বাধ্য হবো যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে।”
“বেশ কিছু জায়গায় হঠাৎ ফলাফল বন্ধ। এগিয়ে থাকলেও হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় কষ্ট করে আমাদের ফল ধরে রাখতে হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ফলাফল ঘসামাঝা করা হয়েছে। পরিবর্তন করা হয়েছে। সেন্টার দখল করে যা করা হয়েছে, তা ভিন্ন উদাহরণ,” যোগ করেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, “আমরা বলতে চাই, আমরা আজকে থেকে আপনাদের সঙ্গে আরো শক্তভাবে থাকব। তরুণ সমাজ বুকের রক্ত দিয়ে যা দিয়ে গেছে, যেমন দেশ চেয়েছে, আমরা যা বলেছি, আগে তা বাস্তবায়ন করতে আমরা লড়ে যাব। আমাদের অবস্থান আপামর জনগণের পক্ষে। আমাদের বাধ্য করা হলে রাজপথেও আমরা নামব।”
জামায়াত আমির বলেন, “১১ দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। অনেকে ঋণখেলাপিদের সুযোগ দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনকে বলব, আরপিও যাদের কাভার করে না, তাদের ফলাফল স্থগিত করে এর সুরাহা করুন।”
বৈঠক ও বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের এবং সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আ.ন.ম শামসুল ইসলাম, নির্বাচনে পরাজিত জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম।
এনসিপির আহ্বায়ক ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির নির্বাচনে পরাজিত মামুনুল হক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, জাতীয় নাগরিক পার্টির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াযী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী বৈঠকে অংশ নেন।
আরো উপস্থিত ছিলেন খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আব্দুল জলিল, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসাইন, এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মুনিরা শারমীন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মহাসচিব মিরাজুল ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল।