বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের সম্ভাবনা ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে আগ্রহের সঙ্গে আলোচনাও হচ্ছে; যেখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে শীর্ষ দুই পদে কারা আসছেন।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি নিয়ে আলোচনা ও প্রশ্নের সূত্র ধরে সংগঠনটির বিভিন্ন স্তরে এবং পদ আসতে পারেন বলে যাদের নিয়ে আলাপ হচ্ছে, তাদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে রাইজিংবিডি ডটকম।
এই আলাপে সামগ্রিকভাবে একটি বিষয় উঠে এসেছে। আর তা হলো, স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে একটিতে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকদের কাউকে বেছে নেওয়া হতে পারে। অন্যটি স্বেচ্ছাসেবক দলের চলমান কমিটির সহ-সভাপতি, সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্য থেকে কাউকে দেওয়া হতে পারে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটির নতুন নেতৃত্ব বাছাই করার আলোচনা ও গুঞ্জন বিশেষ এক প্রেক্ষাপটে জোরালো হয়ে উঠেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান সভাপতি এস এম জিলানী ও সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। রাজীব আহসান প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন।
ফলে মাঠের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের সারা দেশে কার্যক্রম ত্বরাণ্বিত করতে জিলানী ও রাজীব দুজনেই বিএনপির চেয়ারম্যানের কাছে দায়িত্ব ছাড়ার ব্যাপারে মত দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২৮ মার্চ প্রথমবারের মতো রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সে সময় ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জিলানী ও সাধারণ সম্পাদক রাজীব নতুন কমিটির বিষয়ে চেয়ারম্যানের কাছে তাদের অভিমত ব্যক্ত করেন।
স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষপদপ্রত্যাশী এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যানের কাছে স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই নেতা তাদের মনোভাব জানানোর পর থেকেই লবিং-তদবির শুরু হয়ে গেছে।
২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জিলানীকে সভাপতি ও রাজীবকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল সংগঠনটির কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয়।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ ৩ বছর। ২০২২ সালে গঠিত এই কমিটির মেয়াদ গত বছরের সেপ্টেম্বরেই শেষ হয়েছে। বর্তমানে কমিটিটি মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
বিএনপি আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় কাউন্সিল করার পরিকল্পনা নিয়েছে, যার অংশ হিসেবে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অন্য সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্ব ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নেতৃত্ব পেতেও স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের দৌড়ঝাঁপ দেখা যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবক ও যুবদলের শীর্ষ পদের দৌড়ে কয়েকটি নাম ঘুরেফিরে আসছে।
অবশ্য এই দৌড়ে নেই মো. সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ঝিনাইদহ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ থাকা অবস্থায় তাকে বহিষ্কার করা হয়।
জিলানী, রাজীব, ফিরোজ বাদে স্বেচ্ছাসেবক দলের সক্রিয় নেতাদের মধ্যে অনেকের দাবি, সংগঠনের ভেতর থেকেই শীর্ষ নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হোক। তাদের যুক্তি, এতে কমিটির নিচের দিকে থাকা নেতারা উৎসাহ পাবেন। অন্য সংগঠন করা কাউকে শুরুতেই শীর্ষ পদে দায়িত্ব দিলে দীর্ঘদিন স্বেচ্ছাসেবক দল করে আসা নেতাকর্মীরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
ইয়াছিন, নাজমুল, আকরাম, রবিন, শ্রাবণ, রফিক, তুহিনসহ আলোচনায় যারা স্বেচ্ছাসেবক দলে সক্রিয় নেতাদের মধ্যে শীর্ষ দুই পদে আলোচনায় রয়েছেন সিনিয়র সহ-সভাপতি ইয়াছিন আলী ও সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান।
তবে সুপার ফাইভের (শীর্ষ পাঁচ পদ) বাদ রেখে এবারের কমিটি হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের ভেতর থেকে আলোচনায় আছেন বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মোখতার হোসাইন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক, আব্দুর রহিম হাওলাদার সেতু, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সাদরেজ জামান। এ তালিকায় রয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিনও।
স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদে আলোচনায় আসছে তাদের যান তাদের মধ্যে রয়েছেন (উপরে বাঁ থেকে) ইয়াছিন আলী, আকরামুল হাসান মিন্টু এবং (নিচে বাঁ থেকে) রফিকুল ইসলাম রফিক ও সাইফ মাহমুদ জুয়েল।
সভাপতি পদে আলোচনায় থাকা বর্তমান সহ-সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন এর আগে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতির ছিলেন। ছাত্রদলের রাজনীতি দিয়ে শুরু করা রবিন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলেন।
কথা হলে রাইজিংবিডি ডটকমকে রবিন বলেন, “আমরা সকলেই বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আস্থাশীল এবং শ্রদ্ধাশীল। আমরা মনে করি, আওয়ামী শাসনবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে যারা জুলুম, নির্যাতন, গুমের শিকার হয়েছেন; তিনি তাদের মূল্যায়ন করবেন।”
আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান থেকে এখন পর্যন্ত যাদের সম্পর্কে কোনো অপকর্মের ফিরিস্তি নাই বা যারা নিজেদের সৎভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন, তাদের দিয়ে এবং যারা এই সংগঠনকে সামনের দিকে আরো গতিশীল করতে পারবেন তাদের নিয়ে আমাদের চেয়াম্যান সংগঠনটি পরিচালনা করবেন।”
স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজিব হল শাখার ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তার সম্পাদক ও সহ-সভাপতির দায়িত্ব পান। সেখান থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক এবং পরে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান নাজমুল।
কবে নাগাদ স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি দেওয়া হতে পারে- তা নিয়ে রাইজিংবিডি ডটকমের সঙ্গে কথা হলে নাজমুল হাসান বলেন, “কমিটি গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন খুশি তখন কমিটি দেবেন। আমরা তার সিদ্ধান্তের প্রতি সর্বদা আস্থা রাখি।”
সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কারাভোগের মাধ্যমে সাংগঠনিক দক্ষতার ভিত্তিতেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অনেকে বলেন, তিনি মেধা, প্রতিভা ও দৃঢ়তায় অগ্রগামী।
রফিক রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, কমিটি গঠনসহ সব বিষয়ে সাংগঠনিক অবিভাবক আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত।”
পদ-পদবির প্রত্যাশার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জীবনবাজি রেখে রাজপথের প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছি। হামলা-মামলার শিকার হয়ে কারাভোগ করেছি। যেখানেই দ্বায়িত্ব দেওয়া হোক, সেটাই সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব, ইনশাআল্লাহ।”
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন তুখোড় সাবেক ছাত্রনেতা। কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সভাপতির পদে থেকে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে সম্মুখভাগে নেতৃত্ব দেন তুহিন।
রাইজিংবিডি ডটকমকে তুহিন বলেন, “জাতীয়তাবাদী দল এবং শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছি। যতদিন বাঁচব, বিএনপির সাথেই থাকব।”
ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকদের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদে যারা আলোচনায় রয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আকরামুল হাসান মিন্টু, ফজলুর রহমান খোকন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল।
সর্বশেষ সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলকে নিয়ে জোর আলোচনা রয়েছে। ছাত্রদলের রাজনীতিতে ভীষণ জনপ্রিয়তা পাওয়া শ্রাবণের নাম যুবদলের নতুন কমিটির ক্ষেত্রেও শোনা যাচ্ছে।
ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের একাধিক সাবেক শীর্ষ নেতা জানান, বিএনপির সহযোগী সংগঠনগুলোতে ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের বিশেষভাবে মূল্যালয়ন করা হয়ে থাকে। স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলে ধারাবাহিকভাবে ছাত্রদলের সাবেক নেতারাই দায়িত্ব পেয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান আগে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে ছাতদলের সাবেক একাধিক নেতা জানান, ছাত্রদলের সাবেক নেতা রাজিবের কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু, তার পরের কমিটির সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল এবং সবশেষ সাবেক সভাপতি শ্রাবণ ও সাধারণ সম্পাদক জুয়েল বিএনপির কোনো অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে নেই। তাদের প্রত্যাশা, বিএনপি চেয়ারম্যান ছাত্রদলের সাবেক এই পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করবেন।
বিএনপির বিভিন্ন স্তরে কথা বলে জানা গেছে, স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদের আলোচনায় মিন্টু, শ্রাবণ ও জুয়েলই বেশি এগিয়ে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত সৈনিক তারা। স্বেচ্ছাসেবক দলের বাইরে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতেও আলোচনায় রয়েছেন তারা।
কথা হলে জুয়েল রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “বিএনপির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই দীর্ঘদিন রাজপথে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। আমাদের অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারম্যান আমাকে ছাত্রদলের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ছাত্রদলের পর আমি বিএনপির কোনো সহযোগী সংগঠনে যুক্ত হইনি।”
“প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে যে দায়িত্ব দেবেন, আমি সেটাই মাথা পেতে নেব,” যোগ করেন জুয়েল।