তিন পার্বত্য জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় উচ্চমূল্যের মসলা চাষে স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। এ এলাকার জমি মসলা জাতীয় ফসল ও ফলের বাগানের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এরই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড পার্বত্য এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের জন্য গ্রহণ করেছে উচ্চমূল্যের মসলা চাষ পাইলট প্রকল্প।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, একসময় পাহাড়ে মসলা বলতে শুধু আদা, হলুদের চাষকে বোঝাত। কিন্তু এখন পাহাড়ের কৃষকরা জুম চাষের পাশাপাশি বিভিন্ন রকমের মসলা চাষের দিকে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। অনেক কৃষক মনে করছেন, এই মসলা চাষের মাধ্যমে তারা অধিক লাভবান হবেন। পরিবেশবিদরা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার আবহাওয়া বিবেচনায় এখানে উদ্যান ও মসলা জাতীয় ফসল আবাদের অনেক সুযোগ রয়েছে। দরিদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকদের উদ্যান ও মসলা জাতীয় ফসল আবাদে কৃষকদের সম্পৃক্ত করা সবচেয়ে ভালো উদ্যোগ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় উচ্চমূল্যের মসলা চাষ’ একটি পাইলট প্রকল্প। এটি ২০১৮ সালের জুন থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত চারবছর মেয়াদ। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ কোটি ৮৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় উন্নত জাতের মসলা যেমন- দারুচিনি, তেজপাতা, আলুবোখারা, গোলমরিচ, জুম মরিচ, ধনিয়া, বিলাতি ধনিয়া ইত্যাদি চাষাবাদ করে দেশের চাহিদা পূরণ করা যাবে। এসব ফসলের আবাদের ফলে কৃষকরা লাভবান হবেন এবং তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, এ প্রকল্পের আওতায় তিন পার্বত্য জেলায় ২ হাজার ৬০০ জন কৃষককে মসলা চাষের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কৃষকদের বিনামূল্যে আলুবোখরা, দারুচিনি, তেজপাতা, গোলমরিচ ইত্যাদি মসলার চারা-কলমও প্রদান করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় উচ্চমূল্যের মসলা চাষ’ প্রকল্প অফিস জানিয়েছে, কৃষকদের প্রয়োজনীয় কৃষি যন্ত্রপাতি, সার ও রোপণ কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। স্বল্প সময়ে আয়ের জন্য কৃষকদের সাথী ফসল হিসেবে পেঁপে চারা, উন্নত জাতের পেয়ারা ও জলপাই চারাও দেওয়া হয়েছে।
রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নের বরাদম এলাকার মসলা চাষি যুদ্ধমনি চাকমা বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড থেকে আমাকে মসলা চাষ করার জন্য দারুচিনি, গোলমরিচ, তেজপাতার চারা, সার এবং সেচ যন্ত্রপাতি দিয়েছে। আমি এখন জুমচাষ বাদ দিয়ে মসলা চাষ করছি। আশা করছি এই মসলা চাষে লাভবান হবো। আমার বাগান দেখে এলাকার অনেকেই মসলার বাগান করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’
বরাদম এলাকার আরেক কৃষক রতন চাকমা বলেন, ‘উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় আমি বাগানে দারুচিনি, আলুবোখরা, পেঁপে ও পেয়ারা বাগান করেছি। আমি উন্নয়ন বোর্ডকে ধন্যবাদ জানাই আমাকে মসলা চাষের বাগান করতে সহযোগিতা করায়।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মসলা চাষ প্রকল্পের রাঙামাটি সদর উপজেলার মাঠ সংগঠক জগদীশ্বর চাকমা বলেন, ‘এখানকার কৃষকরা আগে জুম চাষ করতো, বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে মসলা চাষ সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। এই প্রকল্পটি শুরু হওয়ার পর কৃষকদের প্রথমে আমরা উদ্বুদ্ধ করি, ‘আপনারাতো জুম চাষ করেন, জুম চাষের পরিবর্তে মসলা চাষ করেন।’ কৃষকদের আমরা কীভাবে চারা রোপণ করতে হয়, জৈব সার বীজ করতে এগুলো হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এখানে আলুবোখরার চারার বৃদ্ধিটা খুব তাড়াতাড়ি হয়।’
উচ্চমূল্যের মসলা চাষ প্রকল্পের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘এ মসলা চাষ প্রকল্পটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রকল্প। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় কম ওজনের উচ্চমূল্যের ফসলের চাষ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। সে নির্দেশনা মোতাবেক আমরা পার্বত্য অঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকায় কৃষকরা যাতে মসলা চাষ করে অধিক লাভবান হতে পারেন, সে উদ্যোগে নিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তুলনামূলক দুর্গম স্থানে উচ্চমূল্যের ও কম ওজনদার মসলা চাষাবাদের সুযোগ রয়েছে। এসব ফসল কম ওজনদার, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য ও মূল্যবান হওয়ায় কৃষকরা নিজ ঘরে তা সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সময়ে সহজে দূরের বাজারে নিয়ে বিক্রি করে অধিক অর্থ পেতে পারেন। এটি একটি পাইলট প্রকল্প। পরবর্তী সময়ে এই প্রকল্পের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বড় আকারে পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষকদের জন্য মসলা চাষ প্রকল্পটি হাতে নিতে পারবো।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় উচ্চমূল্যের মসলা চাষ’ প্রকল্পের পরিচালক মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পাহাড়ে এখনো অনেক অনাবাদী জমি রয়েছে, যেখানে মসলা চাষের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে মসলার চাহিদা এবং আমদানীর মধ্যে অনেক ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণ করার জন্য বর্তমান সরকার এ প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে। এই মসলা চাষ প্রকল্পটি রাঙমাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ প্রকল্পে রয়েছে আলুবোখরা, তেজপাতা ও গোলমরিচ। আমরা এই মসলা চাষ প্রকল্পে সাথী ফসল হিসেবে কৃষকদের পেয়ারা এবং পেঁপে চারা দিয়েছি। পেয়ারা ও পেঁপে থেকে কৃষকরা ৬ মাসের মধ্যে লাভবান হচ্ছেন। এসব মসলার চাহিদা আমাদের দেশে অনেক বেশি। চাহিদা পূরণ করতে পারলে আমরা দেশে আমদানি নির্ভরতা কমাতে পারবো। পাহাড়ের কৃষকরা কিন্তু খুবই উৎসাহী মসলা চাষে। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে আলুবোখরার নার্সারি করে চারা-কলম নিজেরা বিক্রি করছেন।’
এ প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি বর্তমানে আর্থ-সামজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় উচ্চমূল্যের মসলা চাষ তেমনই একটি পাইলট প্রকল্প।’