দৈনন্দিন জীবনে আমরা নানা ঘরোয়া সমস্যায় ভুগি। এসি, ওভেন, ওয়াশিং মেশিনসহ নানা গৃহস্থালী সরঞ্জাম মেরামত করতে উদ্বিগ্ন থাকি। এমন সব সমস্যায় আমাদের পাশে থাকার তাগিদ নিয়ে হাজির হয়েছে অনলাইন প্লাটফর্ম ‘টেকনিশিয়ান’। তরুণ উদ্যোক্তা সোরাব হোসেনের প্রতিষ্ঠানটি বাজিমাত করেছে আসার পরপরই।
সোরাব হোসেন বলেন, আমার জন্ম নোয়াখালী জেলাধীন সুবর্ণচর উপজেলার ওয়াপদা ইউনিয়নের চর বৈশাখী গ্রামে। একাডেমিক পড়াশোনা নিজ এলাকা সুবর্ণচর উপজেলার চর-ক্লার্ক ইউনিয়নের লর্ড লিওনার্ড চেশায়ার উচ্চ বিদ্যালয়ে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি শেষ করি এবং নোয়াখালী সরকারি কলেজে মানবিক বিভাগে পড়ি। বর্তমানে ঢাকায় সম্ভাবনাময় খাত ইলেকট্রনিক্স মার্কেটের ডিভাইসের হোম সার্ভিস নিয়ে।
আমি শুরু করি টেকনিশিয়ান, যার মাদার কোম্পানি হিসাবে কাজ করছে টেকনিশিয়ান টেকনোলজি লিমিটেড। উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমার স্বপ্ন দেখার কথা বলতে গেলে আমি যখন এসএসসি এক্সাম শেষ করি, তখন থেকে আমার একজন উদ্যোক্তা তথা সফল ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখি। তখন চিন্তা করে দেখলাম আমার এই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে হলে রাজধানী ঢাকায় আসা উচিত। তার ধারাবাহিকতায় ঢাকায় চলে আসি ২০১৬ তে। শুরুতে একটা বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশনে (বৈশাখী টেলিভিশন) চাকরি দিয়ে আমার ক্যারিয়ার শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা অবস্থায় আমি আমার স্বপ্ন নিয়া কাজ শুরু করি।
অফিস টাইম শেষ করে বের হতাম নগরীর বিভিন্ন এলাকার উদ্দেশ্যে এবং পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করি কী করা যায় রাজধানীতে। কোন ব্যাপারটায় আমরা অনেক পিছিয়ে। সেই চিন্তা ভাবনা থেকে আমার কাছে মনে হলো সার্ভিস সেক্টরটা খুব অবহেলিত, এখানে দেশের ভালো একটা সম্ভাবনাময় খাত। দেশের জন্য কিছু করা সম্ভব এবং একটা দক্ষ জনবল তৈরি করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল হবে। তার ধারাবাহিকতায় তৈরি করি একটা জরিপ। সেই চিন্তা ভাবনা থেকে ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নেই। রাজধানী ঢাকার একটি আবাসিক এলাকা বনশ্রীতে ২ রুমের একটা অফিস দিয়ে আমাদের কার্যক্রম শুরু করি এবং ২০১৯ সালের ৯ মার্চ আমাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করি।
টেকনিশিয়ানের মাধ্যমে গ্রাহক কী কী সুবিধা পেতে পারেন? বললেন, টেকনিশিয়ান হলো একটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, যার মাধ্যমে আমরা দিয়ে থাকি এসি, ফ্রিজ, ওভেন, ওয়াশিং মেশিন, কিচেন হুড, গিজার ইত্যাদি পণ্যসমূহের হোম সার্ভিস সুবিধা। গ্রাহক সুবিধার কথা বলতে গেলে টেকনিশিয়ান নিশ্চিত করে গ্রাহকের সেবার মান, কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই আমাদের হটলাইনে একটি মাত্র ফোন কল অথবা আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই সেবাগুলো নিতে পারবেন।
টেকনিশিয়ান নিয়ে জানালেন স্বপ্নের কথা। তিনি বলেন, একটি উদ্যোগ মানে একটি স্বপ্ন, স্বপ্নের মাঝেই আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি। তেমনি টেকনিশিয়ান নিয়ে রয়েছে আমার সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা। আমার এই উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা বেকারত্ব নিয়ে কাজ করা। আমার এই উদ্যোগের মাধ্যমে কিছু মানুষের বেকারত্ব দূর হবে এই স্বপ্ন নিয়ে পথচলা। আমি একটা পরিসংখ্যান দেখলাম আমাদের দেশের শিক্ষিত বেকার ৮০ শতাংশ, যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ডিপ্লোমা/ডিগ্রি নিয়ে বসে আছে। আর এর মূল কারণ হলো হাতেকলমে (কারিগরি) শিক্ষার অভাব।
আমার উদ্যোগের মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় ট্রেনিং ইনস্টিটিউট করতে চাই, যেখানে সবার জন্য স্বল্প খরচে একটা কারিগরি সহায়তা দিয়ে দক্ষ জনবল তৈরি করা। এবং দেশের এই টেকনিশিয়ান কমিউনিটির জন্য একটা সুন্দর সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করা, যাতে এই কমিউনিটি তাদের অধিকার পায়। আমি স্বপ্ন দেখি টেকনিশিয়ান একটি সফল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হয়ে দেশের ৬৪ জেলা শহরে আমাদের নিজস্ব ব্রাঞ্চ/সার্ভিস সেন্টার পরিচালনার মধ্যে দিয়ে আমাদের সার্ভিস পৌঁছে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে দেশের বেকারত্ব দূর করা। দেশের বাইরে সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং দেশের অর্থনৈতিতে ভূমিকা রাখা।
পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করবে আমার এই উদ্যোগ। নিজের মতো যারা তরুণ কিন্তু উদ্যোক্তা হতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য দিলেন টোটকাও। বললেন, তরুণদের দেওয়ার মতো পরামর্শ বলতে আমার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বলতে পারি, যারা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন, তাদের বলতে চাই। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে নিজের স্বপ্ন কখনো বিক্রি করবেন না। আমাদের আশেপাশে কিছু মানুষ আছে, যারা আপনাকে স্বপ্ন দেখাবে, বিনিয়োগ দেবে। আপনাকে নানাভাবে উৎসাহিত করবে। এটা আসলে তাদের স্বার্থ উদ্ধার হওয়া পর্যন্ত চলবে। আপনার আইডিয়া যখন বুঝতে পারবে, তখন আর তাকে খুঁজে পাবেন না। নিজে সময় দিন সময় নিন, ব্যবসায়ীক গতিতে আগাতে থাকেন, ভালো কিছু আপনার অপেক্ষায় রয়েছে।
দেশের যারা বেকার আছেন, তাদের বলতে চাই। সার্টিফিকেট শুধু একটা কগজে দেওয়া সনদ, যার সাথে বাস্তবতার তেমন মিল নেই। আপনি কতটুকু অভিজ্ঞ, কতটা কাজ পারেন, বুঝেন এখানে ওটাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আপনি নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করা ছাড়া কোনো সুযোগ নেই যে আপনি পারেন। সুতরাং ভালো ফলাফল নিয়া বসে না থেকে কাজে নেমে যান। নিজের জন্য কিছু করে এবং দেশের জন্য কিছু করে যান। কারণ আপনি দেশের জন্য কিছু করে না গেলে আপনার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা বোঝা হয়ে যাবে। সুতরাং আপানকে একজন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন এখন থেকে শুরু করতেই হবে। কখনো হাল ছাড়বেন না যত বিপদ আসুক, ভরসা রাখুন এবং নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়ান, সফল আপনি হবেন।