কংক্রিটের শহরে যখন প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে সবুজের ছোঁয়া, তখন ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় এসেছেন নাটোর সদর উপজেলার উত্তর বড়গাছা গ্রামের বাসিন্দা আশরাফি নোমান। পেশায় ব্যাংকার হলেও প্রকৃতিপ্রেমী এই যুবক নিজের বাড়ির ছাদে গড়ে তুলেছেন সবুজের জগৎ- যা কেবল একটি ছাদ বাগান নয়, পরিবেশ সচেতনতার অনন্য উদাহরণ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স শেষ করে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে যোগ দেন আশরাফি নোমান। বর্তমানে নলডাঙ্গা উপজেলার পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের সেকেন্ড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
প্রায় সাত বছর আগে কয়েকটি গাছ দিয়ে ছাদ বাগান শুরু করেন আশরাফি নোমান। এখন তার সেই ছাদ বাগান পরিণত হয়েছে এক বিশাল সবুজ প্রকল্পে। নিজস্ব পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম ও নতুন কিছু করার আগ্রহ তাকে এনে দিয়েছে অনন্য সাফল্য। তার বাড়ির ছাদে দেশি-বিদেশি ফলজ, বনজ ও ওষুধি গাছের সমারোহ দেখতে পাওয়া যায়।
মরুভূমির মরিয়ম ফুল থেকে শুরু করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আনা স্ট্রবেরি গাছ সবকিছুই রয়েছে আশরাফি নোমানের বাগানে। বর্তমানে ভ্যালেজ, বাইকুনুর ও ডিক্সন জাতের আঙুর গাছেও ফল ধরেছে, যা এ অঞ্চলে বিরল।
তার বাগানে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার হানি ম্যান্ডারিন, কাশ্মীরি কেনু, থাই-২ কমলা, পাকিস্তানি কমলা, চায়না লেবু ও বিভিন্ন মাল্টার জাত। পাশাপাশি পাকিস্তানি, থাই, অস্ট্রেলিয়ানসহ বিভিন্ন জাতের ডালিম গাছে ফলন তার সাফল্যের আরেক প্রমাণ।
রক মেলন, কালো টমেটো, ব্যানানা টমেটো, তরমুজ, শসা, লাউ, শিমসহ নানা ধরনের সবজি উৎপাদন করে আশরাফি নোমান দেখিয়েছেন; ছাদেও সম্ভব বহুমুখী কৃষি।
আশরাফি নোমান শুধু নিজের ছাদেই সীমাবদ্ধ নন। তিনি নিয়মিত বিনামূল্যে চারা বিতরণ করেন এবং রাজশাহী , নাটোর ও পাবনা জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও সড়কের পাশে গাছ লাগিয়ে চলেছেন। তার লাগানো গাছগুলো এখন বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশের সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে।
আশরাফি নোমানের প্রতিবেশী মেহেদী হাসান, “নোমান ভাইয়ের ছাদ বাগান এখন আমাদের এলাকার গর্ব। তার কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরাও গাছ লাগানো শুরু করেছি। আশা করছি, আমরাও সফল হব।”
সহকর্মী আব্দুল লতিফ বলেন, “আশরাফি নোমান সবসময় পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে বিশ্বাসী একজন মানুষ। ছাদে ছাদে সবুজায়নের এই কাজ শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং পুরো এলাকার জন্যই একটি অনুপ্রেরণা। তার এই উদ্যোগ তরুণদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করছে।”
অপর সহকর্মী মাসুদ রানা বলেন, “তিনি খুবই পরিশ্রমী ও দূরদর্শী ব্যক্তি। শহরের কংক্রিটের ভিড়ে যেখানে সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে তার এই ছাদ বাগান সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরা বিশ্বাস করি, তার দেখানো পথ অনুসরণ করে ভবিষ্যতে আরো অনেকেই এভাবে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসবেন।”
আশরাফি নোমানের স্ত্রী শেলী বলেন, “ব্যাংকের ব্যস্ততার মাঝেও তিনি প্রতিদিন সময় বের করে গাছের যত্ন নেন। গাছই যেন তার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী।”
আশরাফি নোমানের বাবা মো. বেলজে আমিন (বাচ্চু) বলেন, “আমার ছেলে ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি ভীষণ ভালোবাসা দেখিয়েছে। পড়ালেখার পাশাপাশি সে যেভাবে ছাদ বাগানকে একটি সবুজ আন্দোলনে রূপ দিয়েছে, তা সত্যিই গর্বের বিষয়। আমি চাই, তার এই উদ্যোগ আরো বড় এবং সমাজের সবাই এতে অনুপ্রাণিত হোক।”
আশরাফি নোমান বলেন, “প্রকৃতির মাঝে যে শান্তি, তা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। আমি চাই, সবাই গাছ লাগাক, প্রকৃতিকে ভালোবাসুক।”
নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান খান বলেন, “ছাদ বাগান এখন সময়োপযোগী উদ্যোগ। এর মাধ্যেমে নগর এলাকায় সবুজ বাড়ে এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হয়। আশরাফি নোমানের মতো মানুষরা সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত।”