দেহঘড়ি

রক্তদানের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শরীরে আসলে কী ঘটে

দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার কিংবা বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় আমাদের দেশে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজন হয় রক্তের। মানবিক মানুষেরা রক্ত দিতে এগিয়ে আসেন, তবুও প্রথমবার রক্ত দিতে গেলে অনেকের মনে থাকে ভয় বা নানা প্রশ্ন—রক্ত দেওয়ার পর শরীরে কী ঘটে? শরীর কি দুর্বল হয়ে যায়?

চিকিৎসকদের মতে, রক্তদান সম্পূর্ণ নিরাপদ একটি প্রক্রিয়া এবং শরীর খুব দ্রুতই নিজেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করে।

দ্রুত তরল অংশ পূরণ হয়

চিকিৎসকদের মতে, রক্তদানের পর প্রথম যে পরিবর্তনটি ঘটে তা হলো রক্তের তরল অংশ বা প্লাজমা পুনরায় পূরণ হতে শুরু করে। সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্লাজমার বেশিরভাগ অংশ আগের অবস্থায় ফিরে আসে। রক্তনালিতে শরীরের টিস্যু বা কোষের ফাঁকে থাকা তরল ধীরে ধীরে প্রবেশ করে রক্তের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম জমা থাকা তরল ও প্রোটিন আবার রক্তে ফিরিয়ে দেয়।

রক্ত দেওয়ার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কিডনি শরীরে পানি ধরে রাখতে কাজ করে এবং মস্তিষ্ক তৃষ্ণা অনুভব বাড়িয়ে দেয়। যার ফলে মানুষ বেশি পানি পান করে—যা রক্তের ভলিউম দ্রুত স্বাভাবিক করতে সহায়তা করে। লিভার ধীরে ধীরে অ্যালবুমিনসহ বিভিন্ন প্লাজমা প্রোটিন তৈরি করে, যদিও এগুলো পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে একটু বেশি সময় লাগে।

নতুন রক্তকণিকা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু

রক্ত দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্লাজমা দ্রুত পূরণ হলেও লোহিত রক্তকণিকা (RBC) সম্পূর্ণভাবে পুনরায় তৈরি হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যায়। তবে অস্থিমজ্জা (বোন ম্যারো) রক্তদানের পরপরই নতুন রক্তকণিকা তৈরির কাজ শুরু করে দেয়। প্লাটিলেট ও শ্বেত রক্তকণিকা তুলনামূলক দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে—সাধারণত কয়েক দিন থেকে এক সপ্তাহের মধ্যেই।

সাময়িক মাথা ঘোরা বা ক্লান্তি রক্ত দেওয়ার পর কারও কারও সাময়িক মাথা ঘোরা বা হালকা ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। চিকিৎসকেরা বলেন, ‘‘রক্তের পরিমাণ সাময়িকভাবে কমে যাওয়া কিংবা ভ্যাসোভেগাল প্রতিক্রিয়ার কারণে এমনটা ঘটে, যেখানে স্নায়ুর প্রভাবে হৃদস্পন্দন কিছুটা ধীর হয়ে যায় এবং রক্তচাপ কমে যায়।’’ তরুণ, প্রথমবার রক্তদাতা বা যাদের শরীরের গঠন ছোট—তাদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যেতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা খাবার খাওয়া এবং কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে সাধারণত এই সমস্যা দ্রুতই দূর হয়ে যায়।

পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া রক্তদানের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শরীর —প্লাজমা পূরণ হয়, নতুন রক্তকণিকা তৈরির কাজ শুরু হয় এবং হরমোনগত বিভিন্ন ব্যবস্থা রক্তচাপ ও তরলের ভারসাম্য বজায় রাখে। পরবর্তী দিন ও সপ্তাহগুলোতে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার ও সুষম পুষ্টি গ্রহণ করলে লোহিত রক্তকণিকা ধীরে ধীরে পূর্ণমাত্রায় ফিরে আসে।

এই দ্রুত ও স্বয়ংক্রিয় পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াই প্রমাণ করে, সুস্থ মানুষের জন্য রক্তদান নিরাপদ—এবং এক ব্যাগ রক্ত অন্য কারও জীবনে এনে দিতে পারে নতুন আশার আলো।

সূত্র: ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস