দেহঘড়ি

ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

ডায়রিয়া শব্দটি শুনলেই অনেকের অস্বস্তি লাগে। সুখবর হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডায়রিয়া হালকা ধরনের হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়। তবে কখনো কখনো এটি গুরুতর রোগের লক্ষণও হতে পারে। ডায়রিয়ার কারণে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে গিয়ে পানিশূন্যতা হতে পারে কিংবা শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করতে ব্যর্থ হতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে আর কখন ঘরোয়া যত্নই যথেষ্ট—তা জানা জরুরি।

ডায়রিয়ার ধরন

১. অ্যাকিউট ডায়রিয়া: এ ধরনের ডায়রিয়া সাধারণত ১–২ দিন স্থায়ী হয়। এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরনের ডায়রিয়া এবং বেশিরভাগ সময় চিকিৎসা ছাড়াই ভালো হয়ে যায়।

২. পারসিস্টেন্ট ডায়রিয়া: যদি ডায়রিয়া ২–৪ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তাহলে তাকে পারসিস্টেন্ট ডায়রিয়া বলা হয়।

৩. ক্রনিক ডায়রিয়া: চার সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ডায়রিয়া চলতে থাকলে বা বারবার ফিরে এলে তাকে ক্রনিক ডায়রিয়া বলা হয়। এটি গুরুতর কোনো রোগের ইঙ্গিত হতে পারে।

ডায়রিয়ার কারণ কী? ডায়রিয়ার প্রধান কারণ হলো অন্ত্রে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যাকে গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস বলা হয়। অনেকেই একে ‘স্টমাক ফ্লু’ বা ‘পেটের ভাইরাস’ বলেন।  ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী—সবই ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে নোরোভাইরাস সবচেয়ে সাধারণ কারণ।  শিশুদের মধ্যে রোটাভাইরাস বেশি দেখা যায়। 

খাদ্যে বিষক্রিয়া দূষিত খাবার বা পানীয় গ্রহণ করলে ক্ষতিকর জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে ডায়রিয়া হতে পারে।

ট্রাভেলার্স ডায়রিয়া অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ভ্রমণের সময় দূষিত খাবার বা পানির কারণে হওয়া ডায়রিয়াকে ট্রাভেলার্স ডায়রিয়া বলা হয়। কিছু ওষুধও ডায়রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। যেমন- অ্যান্টিবায়োটিক, ম্যাগনেশিয়ামযুক্ত অ্যান্টাসিড, কিছু ক্যানসারের ওষুধ, অতিরিক্ত ল্যাক্সেটিভ ব্যবহার ইত্যাদি।  

হজমে সমস্যা তৈরি করে এমন খাবার, ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা এবং দুধজাত খাবারের ল্যাকটোজ হজম করতে না পারলে ডায়রিয়া হতে পারে।

ফ্রুকটোজ অসহিষ্ণুতা ফল ও মধুর চিনিজাত উপাদান ফ্রুকটোজ হজমে সমস্যা হলেও ডায়রিয়া হতে পারে। এ ছাড়া  গ্লুটেনযুক্ত খাবার (যেমন গম) হজমে সমস্যা হলে ডায়রিয়া দেখা দেয়।

ডায়রিয়ার পেছনে দায়ী থাকতে পারে আরও যেসব রোগ

অন্ত্রের রোগ ক্রোনস ডিজিজ  আলসারেটিভ কোলাইটিস  ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম  

এসব রোগে অন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং ডায়রিয়া হতে পারে। মানসিক চাপ ও উদ্বেগ IBS-এর উপসর্গ বাড়াতে পারে। অন্ত্রের অস্ত্রোপচারের পর কিছুদিন ডায়রিয়া হতে পারে, কারণ তখন শরীর খাবার থেকে পুষ্টি শোষণে সময় নেয়।

গুরুতর ডায়রিয়ার লক্ষণ

জ্বর  তীব্র পেটব্যথা  বমি  মলে রক্ত বা শ্লেষ্মা  ওজন কমে যাওয়া 

পানিশূন্যতার লক্ষণ ডায়রিয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা। বড়দের ক্ষেত্রে- মাথাব্যথা, ত্বক শুকিয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা , বমি ভাব, গাঢ় রঙের প্রস্রাব  কম প্রস্রাব হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে- বিরক্তিভাব, কান্নার সময় চোখে পানি না আসা, কম প্রস্রাব হওয়া  এবং দীর্ঘ সময় ডায়াপার শুকনো থাকা।  

চিকিৎসা না হলে পানিশূন্যতা থেকে হতে পারে—

কিডনি বিকল হওয়া  স্ট্রোক  হার্ট অ্যাটাক  এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত  বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য এটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ

ওষুধ ছাড়া ডায়রিয়া কমানোর উপায়

প্রচুর তরল পান করুন বিশুদ্ধ পানি  স্যুপ বা ঝোল  ফলের পাতলা রস  স্পোর্টস ড্রিংক  ক্যাফেইনমুক্ত পানীয় 

এসব শরীরের পানি ও ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে।

ডায়েটে রাখতে পারেন ডায়রিয়া প্রতিরোধী খাবার। যেমন:

কলা সাদা ভাত আপেলের পেস্ট টোস্ট  এ ছাড়া খেতে পারেন— আলু  নুডলস  চর্বিহীন মাংস  মাছ  মুরগি 

যা এড়িয়ে চলবেন

কফি ও ক্যাফেইন অ্যালকোহল  গ্যাস তৈরি করে এমন খাবার  দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার (সাময়িকভাবে) 

শিশুদের ডায়রিয়া হলে কী করবেন? শিশুর ডায়রিয়া হলে অবশ্যই শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। বড়দের ওষুধ শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। শিশুকে পানিশূন্যতা থেকে বাঁচাতে দেওয়া যেতে পারে—বুকের দুধ, ফর্মুলা দুধ। বড় শিশুদের জন্য পেডিয়ালাইট জাতীয় ইলেকট্রোলাইট পানীয় দিতে পারেন। 

ডায়রিয়া প্রতিরোধের উপায়

পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া  খাবার তৈরির আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পরে হাত পরিষ্কার করা  টিকা নিন রোটাভাইরাস ভ্যাকসিন  প্রয়োজনীয় অন্যান্য টিকা  নিরাপদ খাবার খান সঠিক তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণ করুন  ভালোভাবে রান্না করা খাবার খান  মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার এড়িয়ে চলুন  ভ্রমণের সময় সতর্ক থাকুন অপরিশোধিত পানি পান করবেন না  কাঁচা বা আধাসেদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলুন  বোতলজাত বা ফুটানো পানি পান করুন 

ডায়রিয়া যদি কয়েক দিনের বেশি স্থায়ী হয় বা তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সূত্র: ক্লেভল্যান্ড ক্লিনিক