‘আর আড়াল নয়: রোগ নির্ণয়হীনদের খুঁজে বের করি, অলক্ষ্যে থাকা রোগীদের সহায়তা করি’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আজ দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন-বাহক বলে ধারণা করা হয়। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকার ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ এই নীতি অবলম্বন করেছে। থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধে এই নীতি সবচেয়ে বেশি কার্যকর। চলুন থ্যালাসেমিয়া রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাক।
ডা. রাবি হান্না ব্যাখ্যা করেছেন- থ্যালাসেমিয়া হলো একটি রক্তের রোগ, যেখানে শরীর ঠিকভাবে লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না। এই রোগে একজন মানুষ তার জৈবিক বাবা-মায়ের কাছ থেকে এক বা একাধিক ত্রুটিপূর্ণ জিন উত্তরাধিকারসূত্রে পায়।
এই জিনগুলোর ত্রুটির কারণে শরীর স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। হিমোগ্লোবিন হলো লোহিত রক্তকণিকার ভেতরে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন, যা শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন বহন করে।
থ্যালাসেমিয়ায় শরীর কম পরিমাণে সুস্থ হিমোগ্লোবিন তৈরি করে। ফলে লোহিত রক্তকণিকার আয়ুও কমে যায়। এতে শরীরে সুস্থ রক্তকণিকার ঘাটতি দেখা দেয়, যাকে অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা বলা হয়। অ্যানিমিয়ার উপসর্গ হালকা থেকে মারাত্মক পর্যন্ত হতে পারে, যা নির্ভর করে থ্যালাসেমিয়ার ধরন ও তীব্রতার ওপর।
থ্যালাসেমিয়ার ধরন থ্যালাসেমিয়া প্রধানত দুই ধরনের: আলফা থ্যালাসেমিয়া এবং বিটা থ্যালাসেমিয়া। এগুলোর নামকরণ করা হয়েছে হিমোগ্লোবিনের দুটি প্রোটিন চেইনের নাম অনুসারে — আলফা ও বিটা।
আলফা থ্যালাসেমিয়া আলফা চেইনে মোট ৪টি জিন থাকে। এর মধ্যে এক বা একাধিক জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে আলফা থ্যালাসেমিয়া হয়। একটিমাত্র ত্রুটিপূর্ণ বা অনুপস্থিত আলফা জিন থাকে। সাধারণত কোনো উপসর্গ থাকে না। এটিকে আলফা থ্যালাসেমিয়া মিনিমা বলা হয়।
দুটি ত্রুটিপূর্ণ বা অনুপস্থিত আলফা জিন থাকে, উপসর্গ থাকলেও সাধারণত হালকা হয়। এটিকে আলফা থ্যালাসেমিয়া মাইনর বলা হয়।
তিনটি ত্রুটিপূর্ণ বা অনুপস্থিত আলফা জিন, মাঝারি থেকে গুরুতর উপসর্গ দেখা দেয়। একে হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ বলা হয়।
চারটি ত্রুটিপূর্ণ বা অনুপস্থিত আলফা জিন, এটি জন্মের সময়ই প্রাণঘাতী হতে পারে। বেঁচে থাকলে আজীবন রক্ত দিতে হতে পারে। এটিকে হাইড্রপস ফিটালিস উইথ হিমোগ্লোবিন বার্টস বলা হয়।
বিটা থ্যালাসেমিয়া বিটা চেইনে মোট ২টি জিন থাকে। কতগুলো জিন ক্ষতিগ্রস্ত এবং কোথায় ত্রুটি রয়েছে, তার ওপর উপসর্গ নির্ভর করে।
একটি ত্রুটিপূর্ণ বা অনুপস্থিত বিটা জিন থাকে, হালকা বা কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। একে বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনর বা বিটা থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট বলা হয়।
দুটি ত্রুটিপূর্ণ বা অনুপস্থিত বিটা জিন থাকে, মাঝারি থেকে গুরুতর উপসর্গ দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞরা আবার এটিকে দুই ভাগে ভাগ করেন: ট্রান্সফিউশন-ডিপেনডেন্ট থ্যালাসেমিয়া (নিয়মিত রক্ত দিতে হয়), নন-ট্রান্সফিউশন-ডিপেনডেন্ট থ্যালাসেমিয়া (নিয়মিত রক্ত না লাগলেও চলতে পারে) সময়ের সঙ্গে রোগের ধরন পরিবর্তনও হতে পারে।
উপসর্গ ও কারণ
রোগের ধরন ও তীব্রতার ওপর উপসর্গ নির্ভর করে। কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। একটি আলফা জিন না থাকলে সাধারণত উপসর্গ থাকে না। দুইটি আলফা জিন বা একটি বিটা জিন ত্রুটিপূর্ণ হলেও উপসর্গ নাও থাকতে পারে। কখনও হালকা অ্যানিমিয়া ও ক্লান্তি হতে পারে।হালকা থেকে মাঝারি উপসর্গ
নন-ট্রান্সফিউশন-ডিপেনডেন্ট থ্যালাসেমিয়ায় দেখা যেতে পারে: প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া বয়ঃসন্ধি দেরিতে হওয়া শারীরিক বৃদ্ধি কম হওয়া হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়াগুরুতর উপসর্গ তিনটি আলফা জিন না থাকলে জন্ম থেকেই গুরুতর অ্যানিমিয়া দেখা দিতে পারে। ট্রান্সফিউশন-ডিপেনডেন্ট থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ সাধারণত ২ বছরের মধ্যে প্রকাশ পায়।
বাবা-মায়ের কাছ থেকে ত্রুটিপূর্ণ জিন সন্তানের শরীরে আসে। এই জিনগুলো শরীরকে আলফা বা বিটা চেইন তৈরির নির্দেশ দেয়। আলফা চেইনের ৪টি জিনের মধ্যে ২টি মা ও ২টি বাবা থেকে আসে। বিটা চেইনের ২টি জিনের মধ্যে ১টি মা ও ১টি বাবা থেকে আসে। যদি এসব জিনের কোনোটি ত্রুটিপূর্ণ বা অনুপস্থিত হয়, তাহলে থ্যালাসেমিয়া হয়।
জটিলতা বারবার রক্ত নেওয়ার কারণে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমে যেতে পারে। এতে ক্ষতি হতে পারে: হৃদপিণ্ডে, যকৃতে এবং এন্ডোক্রাইন সিস্টেমে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শিশুদের সমস্যা শারীরিক বৃদ্ধি ধীর হওয়া এবং হাড়ের সমস্যা দেখা দেয়।
রোগ নির্ণয় সাধারণত শিশু বয়সেই মাঝারি ও গুরুতর থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে। যেসব রক্ত পরীক্ষা করা হয়:
সিবিসি: রক্তকণিকার সংখ্যা দেখা হয়। হিমোলাইসিস টেস্ট: রক্তকণিকা দ্রুত নষ্ট হচ্ছে কি না দেখা হয়। আয়রন ব্লাড টেস্ট: আয়রনের অভাব আছে কি না বোঝা হয়। হিমোগ্লোবিন অ্যানালাইসিস: অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন শনাক্ত করা হয়। জেনেটিক টেস্টিং: ত্রুটিপূর্ণ জিন শনাক্ত করা হয়।কখন ডাক্তার দেখাবেন? থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলোআপ করা জরুরি।
সূত্র: ক্লেভল্যান্ড ক্লিনিক