রাইজিংবিডি স্পেশাল

দুদক নিয়ে এ কেমন ষড়যন্ত্র !

এম এ রহমান : দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি স্বাধীন সংস্থা। দুদক আইন ২০০৪ এর ৩(২) ধারাসহ একাধিক ধারায় দুদককে একটি স্বাধীন সংস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

 

কিন্তু দুদক আইন ২০০৪ ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর সংশোধনীতে যে প্রস্তাব চলতি বছরের ১৭ আগস্ট গৃহীত হয়েছে, তাতে কমিশনের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার পাশাপাশি দুদকের স্বাধীনতা নস্যাৎ হবে। এর ফলে দুদক আইনগতভাবেই পুরোপুরি নখদন্তহীন বাঘে পরিণত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

সংশোধিত খসড়া আইনের বিষয়ে জানা যায়, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ধারা ২ এর শ-তে ২৭টি সম্পৃক্ত অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই আইনে স্বতন্ত্র ৮টি কারণে মানিলন্ডারিং অপরাধের কথাও বলা আছে।এর মধ্যে শুধু তিনটিতে সম্পৃক্ত অপরাধ বা প্রেডিকেট অফেন্সের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কিন্তু সংশোধিত মানিলন্ডারিং আইন অনুসারে দুদক কেবল ঘুষ ও দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট অপরাধ নিয়ে কাজ করতে পারবে। অথচ দুদক মানিলন্ডারিং আইনের আওতায় এ যাবৎ হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের দুর্নীতির মামলাসহ বড় বড় যে কয়টি মামলা হয়েছে এগুলোর কোনোটাই সম্পৃক্ত অপরাধ থেকে উদ্ভূত মানিলন্ডারিং এর মামলা নয়।এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি মানিলন্ডারিং আইনে মামলা হয়েছে।

 

অপরদিকে মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক পাশকৃত সংশোধিত দুদক আইনে, সরকারি সম্পত্তি সম্পর্কিত বা সরকারি কর্মচারী বা ব্যাংকের কর্মকর্তা/কর্মচারী বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/কর্মচারী কর্তৃক দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালে সম্পাদিত প্রতারণা ও জালিয়াতির বিষয়টি দুদক দেখবে। অর্থাৎ প্রতারণা ও জালিয়াতির ক্ষেত্রে পুলিশের পাশাপাশি দুদকও কাজ করবে। অথচ মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে প্রতারণা ও জালিয়াতি সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে দুদকের কোনো অংশ রাখা হয়নি। অন্যদিকে মানিলন্ডারিংয়ের বেশিভাগ অপরাধের ঘটনা ব্যাংকিং খাতে ঘটে। তাহলে এ বিষয়টি দেখবে কে? এমন প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের।

 

অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক পাসকৃত মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে ২(ঠ) বিলুপ্ত করে সংশোধনী আইনে ঠ-এর (১)(২) উপ-ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। ২ (ঠ) তে বলা হয়েছে, তদন্তকারী সংস্থা বলতে দুদক আইন ২০০৪ এর অধীনে গঠিত একমাত্র দুদককেই বোঝাবে। কিন্তু ওই ধারা বিলুপ্ত করে তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে পুলিশ, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) বা এর দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত এক বা একাধিক তদন্তকারী সংস্থাকে রাখা হয়েছে। আইনের কোথাও দুদকের কথা বলা হয়নি। অর্থাৎ দুদক মানিলন্ডারিং বিষয়ে কাজ করতে হলে বিএফআইইউ থেকে অনুমতি সাপেক্ষে কাজ করতে হবে।বিষয়টি হাস্যকরও বটে।

 

দুদক একটি স্বাধীন কমিশন হওয়র পরও এই আইন বলবৎ হলে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি সরকারি তদন্ত সংস্থা কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে মানিলন্ডারিংয়ের অপরাধ তদন্ত করতে হবে, যা দুদকের বিদ্যমান আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

 

এদিকে দুদক আইন ২০০৪ এর ২০(১) ধারায় বলা হয়েছে, এ আইনের তফসিলভুক্ত অপরাধ কেবল কমিশন কর্তৃক তদন্তযোগ্য। এ আইনের ২৪ ধারায় কমিশনারগণ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন। একই আইনের ২৬ (১) ধারা অনুসারে কমিশন কোনো ব্যক্তির অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেলে তা সম্পদ বিবরণী দাখিল করার নির্দেশ দিতে পারবে। দুদক আইন ২০০৭ এর ১৭ ধারায় কীভাবে সম্পদ বিবরণী জারি করতে হবে সে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

 

কিন্তু মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর সংশোধনী প্রস্তাবে ধারা ৯(৩)এ তদন্তকারী কর্মকর্তা বলতে দুদক ছাড়াও অন্য এজেন্সির কর্মকর্তারাও দুদক আইনের আওতায় অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তির অনুসন্ধান করতে পারবেন। এ ধরনের সংশোধনীতে দুদকের স্বাধীনতাও থাকবেই না বরং বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

এ প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমি এখনো আইনের পুরোপরি সংশোধনী দেখিনি। তবে যেটুকু দেখেছি তা যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে তা দুদকের জন্য সুখকর হবে না।’

 

তি্নি আরো বলেন, ‘দুদক আইনে এটা স্পষ্ট যে কমিশন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। আমরা এতদিন ওই আইন অনুসারেই কাজ করছি। এখন নতুন সংশোধিত আইন অনুযায়ী যদি দুদকের তফসিলকৃত অপরাধের তদন্ত অন্য কোনো সংস্থাকে দেওয়া হয় তাহলে দুদকের স্বধীনতা বলে কিছু থাকবে না।’

 

দুদক চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘সংশোধিত আইনের অপর একটি ধারায় বিএফআইইউয়ের মতো সংস্থা থেকে দুদককে অনুমতি নিয়ে মানিলন্ডারিং অপরাধ তদন্ত করতে বলা হয়েছে, যা স্বাধীন সংস্থা হিসেবে দুদকের জন্য খুব খারাপ হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেব।’

 

দুদক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, মানিলন্ডারিং অপরাধ দমনে দুদকের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে- বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর পাচারকৃত ২১ কোটি টাকা সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত আনা। মানিলন্ডারিং মামলায় গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের ১০ বছরের জেল ও ৪০ কোটি টাকা জরিমানাসহ বেশ কয়েকটি মামলায় সাফল্য।

     

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫/এম এ রহমান/লেনিন/রফিক