রাইজিংবিডি স্পেশাল

কালের সাক্ষী বাহাদুর শাহ পার্ক

আশরাফুল ইসলামঢাকা, ৮ ফেব্রুয়ারি : ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহের বিপ্লবীদের স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাহাদুর শাহ পার্ক। ইংরেজদের শাসন-শোষণের ইতিহাস, ইংরেজ শাসকদের বর্বরতা ও স্বাধীনচেতা সেনাদের আত্মত্যাগের কালের সাক্ষী এ পার্ক। ইংরেজ মেরিন সেনারা বাংলার সেনাদের নিরস্ত্র করার জন্য ১৮৫৭ সালের ২২ নভেম্বরে ঢাকার লালবাগ কেল্লায় আক্রমণ চালায়। স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী সৈন্যরা তাতে বাধা দিলে যুদ্ধ বেধে যায়। এতে আহত ও পলাতক সেনাদের গ্রেফতার করা হয়। পরে এক প্রহসনমূলক বিচারে ইংরেজ সামরিক আদালতে ১১ বিপ্লবীকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। রায় কার্যকরে তৈরি হয় ফাঁসির মঞ্চ। প্রকাশ্যে বাহাদুর শাহ পার্কে তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিণাম হিসেবে জনগণকে ভয় দেখাতে বিপ্লবী সিপাহীদের লাশগুলো ঝুলিয়ে রাখা হয় পার্কের সারিবদ্ধ গাছের ডালে। ইংরেজদের বর্বরতা ও সেনাদের আত্মত্যাগের সাক্ষ্য বয়ে চলেছে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক।আঠার শতকের শেষের দিকে পুরান ঢাকায় আর্মেনীয়রা বিলিয়ার্ড ক্লাব তৈরি করে। যেটি স্থানীয়দের কাছে আন্টাঘর নামে পরিচিত ছিল। ক্লাব ঘরের সাথেই ছিল একটি মাঠ, যেটিকে বলা হতো আন্টাঘর ময়দান। ১৮৫৮ সালে রানী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার নেওয়ার পর এই ময়দানেই এ সংক্রান্ত একটি ঘোষণা পাঠ করে শোনান ঢাকা বিভাগের কমিশনার। তখন থেকে এই স্থানের নামকরণ হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’।সিপাহী বিদ্রোহ এবং পরবর্তীতে ইংরেজ শাসকদের বর্বরোচিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে ১৯৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের শতবার্ষিকী পালন উপলক্ষে ‘ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট’ (ডিআইটি) এর উদ্যোগে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। এই বিদ্রোহের মাধ্যমে ইংরেজ শাসনের পতন ঘটিয়ে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের শাসন পুনরায় চালু করার চেষ্টা করা হয়। তাই তার নামানুসারে পার্কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক। ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধে ইংরেজরা এটি কিনে নেয়। তারা এটিকে পার্কের রূপ দেয় এবং এর চারদিকে লোহা দিয়ে ঘিরে দিয়ে এর চার কোণায় চারটি দর্শনীয় কামান স্থাপন করে। অচিরেই স্থানটি জীর্ণ হয়ে গেলে ভেঙে নওয়াব আব্দুল গণির উদ্যোগে একটি ময়দান তৈরি করা হয়। তখনো এর চারপাশে অনেক আর্মেনীয় বাস করতো। এ পার্কের উন্নয়নে নওয়াব আব্দুল গণির ব্যক্তিগত অবদান ছিল। তার নাতি খাজা হাফিজুল্লাহর মৃত্যুর পর তার ইংরেজ বন্ধুরা হাফিজুল্লাহর স্মৃতি রক্ষার্থে চাঁদা তুলে ১৮৮৪ সালে এখানে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করে। শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতিরক্ষার্থে উত্তর দিকে একটি সুউচ্চ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। উঁচু বেদির ওপর নির্মিত চার স্তম্ভের গোলাকার আচ্ছাদনে ঘেরা সৌধটি।পার্কটি ডিম্বাকৃতির এবং লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। এরপূর্ব এবং পশ্চিম পাশে দুটো প্রধান গেট রয়েছে। পার্কটির ভেতরে রেলিংয়ের পাশ দিয়ে পাকা রাস্তা আছে। পার্কটি ঢাকার অন্যতম প্রধান নৌবন্দর সদরঘাট এলাকায় ঢুকতেই লক্ষ্মীবাজারের ঠিক মাথায় অবস্থিত।পার্কটিকে ঘিরে ৭টি রাস্তার মিলনস্থান। এর চারপাশে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ বেশ কিছু স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থাকার কারণে এটি পুরান ঢাকার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। পার্কের উত্তরপাশে রয়েছে সেন্ট থমাস চার্চ, একই পাশেই অবস্থিত ঢাকার প্রথম পানি সরবরাহ করার জন্য তৈরি পানির ট্যাংক। উত্তর-পূর্ব কোণে আছে ঢাকার অন্যতম কলেজ কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং ইসলামিয়া হাইস্কুল, পূর্ব পাশে রয়েছে ঢাকার অন্যতম প্রাচীন বিদ্যালয় সরকারি মুসলিম হাইস্কুল, দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। পার্কের ঠিক উত্তর-পশ্চিম পাশেই রয়েছে ঢাকার জজকোর্ট। এছাড়া, বাংলা বাজার, ইসলামপুর, শাঁখারী বাজার থেকে বর্তমান ঢাকার নতুন এলাকায় আসতে এ পার্ক এলাকার রাস্তাটি প্রধান সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।বর্তমানে পার্কটি নানা সমস্যায় জর্জরিত। পার্কের মাঝখানে আছে একটি জলহীন ফোয়ারা। সেটির বেহাল দশা। চারদিকের দেয়ালের নিচের মাটি সরে গেছে। ভেতরে আছে একটি টয়লেট, পরিচ্ছন্নতার লেশমাত্র নেই তাতে। ট্যাঙ্ক থেকে পানি নিচ্ছেন হকার-দোকানদাররা। স্মৃতিস্তম্ভের ওপর জুতা পায়ে বসে আছেন দর্শনার্থীরা। ডিম্বাকার এ পার্কটির বাইরের রেলিং কেটে নিচ্ছে নেশাখোররা। রাতে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। সরেজমিন পার্কটির এমন চিত্র পাওয়া যায়। ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ৬১ অনুযায়ী রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মহাপরিকল্পনাভুক্ত স্থাপনা হিসেবে ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিবেচনায় বাহাদুর শাহ পার্ককে সংরক্ষণের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। কিন্তু পার্কের উত্তরের রাস্তায় ডাস্টবিন, ময়লার ছড়াছড়ি। উত্তর-দক্ষিণের ফুটপাতে দোকান এবং রিকশার জট। নষ্ট হচ্ছে পার্কের সৌন্দর্য। পশ্চিম দিকের প্রবেশদ্বার বন্ধ রাখা হয়। পূর্ব দিকেরটা দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে।এখানে স্থানীয়ভাবে প্রাত:ভ্রমণকারী সংঘ গড়ে তোলা হয়েছে। এ সংঘের সদস্যরা ভোর, বিকেল এবং সন্ধ্যায় হাঁটেন। এছাড়া, নানা পেশা ও চাকরিজীবী, পথচারী, ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ জনগণের নিত্যপদচারণা রয়েছে কালের সাক্ষী এ পার্কে।

 

রাইজিংবিডি / বকুল