ধাক্কাগুলো ক্রমশ বড় হচ্ছে। ক্ষয়ে যাচ্ছে তীরের মাটি, ডুবছে বাড়িঘর, মানুষ ছুটছে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। সদ্য ফেলে আসা বছরে ঘূর্ণিঝড় আঘাত না হানলেও বেশ কয়েকটি নিম্নচাপ এবং গভীর নিম্নচাপের প্রভাব উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের চেয়েও বড় ধাক্কা দিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। ২০২৪ সালের মতো, উপকূলে বন্যার প্রভাব এই বছরেও অব্যাহত ছিল। উপকূলের জন্য চিরচেনা বিপদ জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙন, লবণাক্ততা কিংবা উচ্চ জোয়ারের প্রভাব সদ্য বিদায়ী বছরেও অব্যাহত ছিল। এই বিপদগুলো ক্রমশ সহনশীল মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। সদ্য ফেলে আসা বছরে যোগ হয়েছে বিপদের নতুন কিছু প্রবণতা, যেমন ডেঙ্গু। তীব্র তাপপ্রবাহ এবং শীতের প্রকোপ উপকূলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কাবু করেছিল এ বছর।
বছরজুড়ে চরম সংকটের মুখোমুখি থাকা এক জনপদের নাম উপকূল। ৭১০ কিলোমিটার তটরেখার এ জনপদে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর বিপদের শেষ নেই। তারা নানামুখি প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তাদের জীবন জীবিকার লড়াই আরো কঠিন করে তোলে। তাদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে, বাড়ে সংকটাপন্ন মানুষেরা সংখ্যা। বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। প্রতিবছর বাস্তুচ্যুত মানুষদের একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকা কিংবা দেশের অন্য বড় শহরে যেতে বাধ্য হয়। জার্মানওয়াচ প্রকাশিত 'গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৫'-এ বাংলাদেশের সামগ্রিক জলবায়ু ঝুঁকি এবং বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। উপকূল থেকে পাওয়া থেকে প্রতিবছরই ঝুঁকির তথ্য পাওয়া যায়। যেমনটা অন্যান্য বছরের মত ২০২৫ সালেও তা পাওয়া গেছে।
নিম্নচাপ, ব্যাপক ক্ষতি
সদ্য ফেলে আসা বছরে উপকূলে ঘূর্ণিঝড় আঘাত না হানলেও বেশ কয়েকটি নিম্নচাপ এবং গভীর নিম্নচাপ আঘাত করেছে। এর প্রভাব উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের চেয়েও বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি হলে ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আঘাত না করলে সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এ বছর একাধিক ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটা বাংলাদেশের উপকূল তছনছ করেছে। আঘাত করেছে পার্শ্ববর্তী দেশের উপকূলে। মে মাসের শেষের দিকে গভীর নিম্নচাপ বাংলাদেশের উপকূলের মানুষদের ব্যাপক ক্ষতি করে। এটি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করেছিল। এর প্রভাবে উপকূলীয় জেলাগুলোতে জলোচ্ছ্বাস এবং সারাদেশে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল। উপকূলের অনেক স্থাপনার ক্ষতি হয়েছিল এই নিম্নচাপের প্রভাবে।
মে মাসের গভীর নিম্নচাপের কারণে উপকূলের বহু জনপদ পানিতে ডুবে গিয়েছিল, অনেক স্থানে নদী ভাঙন বেড়ে গিয়েছিল। অনেকে বাড়িঘর স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছেন। ভোলার দ্বীপ ঢালচরের বাসিন্দা শরীফ সওদাগর বলেন, ‘‘গত বছরের জলোচ্ছ্বাস ও ভাঙনে ঢালচর থেকে শতাধিক বাড়ি স্থানান্তর করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে মানুষের জীবন-জীবিকায় নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। ক্রমাগত জলোচ্ছ্বাস, ভাঙন, ঘূর্ণিঝড়ে ঢালচরের মানুষ জীবিকা হারাচ্ছে।’
গত বছর ঢালচর থেকে বাড়ি স্থানান্তর করেছেন নুরুদ্দিন মাঝি। তিনি বলেন, ‘‘মাত্র ৭ দিন বয়সে নদী ভাঙনের কারণে ভোলার লালমোহনের হাকিমুদ্দিন থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঢালচরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। বড় হয়ে জীবিকার অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় নদী ও সমুদ্রে মাছ ধরা। ৪৮ বছর বয়স অবধি এই পেশায় ঢালচরে জীবিকা নির্বাহের পর আমি গত বছর ভাঙনের কারণে বাড়ি স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছি।’’
ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কা না এলেও উপকূলজুড়ে এখন ঘন ঘন নিম্নচাপ হচ্ছে, কোন কোন নিম্নচাপ গভীর নিম্নচাপে পরিণত হচ্ছে। গত বছর জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে উত্তর বঙ্গোপসাগরে আরেকটি গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এর প্রভাবে ভোলা, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় ১৪টি জেলায় স্বাভাবিকের চেয়ে ৩-৪ ফুট বেশি উচ্চতার জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাস দেখা দেয়।
অক্টোবর মাসের শুরুতে একটি নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে এটি গভীর নিম্নচাপ আকারে ওড়িশা উপকূলের দিকে অগ্রসর হয়। বাংলাদেশের উপকূলেও এর ঝাপটা লেগেছিল। অক্টোবরের শেষে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয়েছিল ’মনথা’ নামের শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। এটি উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বসতঘর, কৃষি জমি, মাছের ঘের, গাছপালার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নভেম্বরের শেষ দিকে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এ সময়ে ঘূর্ণিঝড় 'সেনিয়ার' ও 'দিতওয়াহ' ভারত মহাসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় ছিল। এর প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের উপকূলে। তবে তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
উপকূলের দিকে ধাবিত বন্যা
আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের মতো ২০২৫ সালেও উপকূলের দিকে ধাবিত হয়েছিল বন্যা। নোয়াখালী, ফেনি, লক্ষ্মীপুর এবং চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি অঞ্চল অবধি আকস্মিক বন্যা আঘাত করেছিল। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছোটবড় অনেকগুলো ভূমিধসের ঘটনা ঘটে গতবছর। এসব ভূমিধ্বসে প্রায় ১৪শ’ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ। আগের বছর যখন ফেনী-নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুরে বন্যা হয়েছিল, তার অনেক আগে ২০২৫-এ জুলাইয়ের প্রথম দিকে বন্যা আঘাত করেছিল। বন্যায় ফেনীর পাঁচটি উপজেলা ও দুটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হয়ে পড়েছিল। দুর্যোগ-পরবর্তী সরকারি তথ্যমতে, এ বছর জেলায় ১০৬ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৮,১৪৩টি পরিবার এবং দুর্যোগে আক্রান্ত হন ৭৭,৭০২ জন মানুষ।
বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিল নোয়াখালী এবং লক্ষ্মীপুর জেলাও। মানুষের দুর্ভোগ ছিল চরমে। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া নারী ও শিশুরা সীমাহীন কষ্ট ভোগ করেছেন। এই ধরনের সংকটে সাধারণত নারী ও শিশুরাই বেশি সংকটের মুখোমুখি হন। স্যানিটেশন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির কারণে নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। বন্যার ফলে পানিবাহিত রোগ যেমন ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও চর্মরোগ বেড়ে গিয়েছিল। বাড়ি হারানোর কষ্ট, পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং আশ্রয়কেন্দ্রে অনিরাপত্তা নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। বন্যাকালীন আশ্রয়কেন্দ্রে নারীরা যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের ঝুঁকিতেও থাকেন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর নতুন করে বসবাস শুরু করতে বহুমূখী সংকটে পড়তে হয়েছিল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের।
লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ
সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নের খোলপেটুয়া নদীর তীরে গত বছরের ঈদের দিনের সেই গল্পটা এই মানুষদের কাছে এখনো তাজা। একমাস পবিত্র মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার পর এসেছিল ঈদুল ফিতর। গতবছর রমজান শেষে রাত পোহানোর আগেই সব বাড়িতে ছিল ঈদের প্রস্তুতি। সেই প্রস্তুতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল সকালেও। আনুলিয়া ইউনিয়নের নয়াখালী গ্রামের রমেছা বেগমের মতো কেউ পায়েস রান্না করছিলেন, আনুলিয়া গ্রামের আসাদুজ্জামান, আবদুস সাত্তার গাজী, সফিকুল ইসলামের মতো আরো অনেক মানুষ নতুন জামা পরে গিয়েছিলেন ঈদের জামাতে। কিন্তু এরই মধ্যে হঠাৎ পানির স্রোত সর্বনাশ ডেকে আনলো। গোটা এলাকায় ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেলো। শুধু ঈদের আনন্দ নয়, এই বিপর্যয় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জীবনে নতুন সংকট নিয়ে এলো। আকস্মিক বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় আনুলিয়া ইউনিয়নের দশটি গ্রামের অন্তত দশ হাজার মানুষ চরম সংকটের মুখে পড়েছে।
অতি কষ্টে চলা রমেছা বেগমের সব কিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। খোলপেটুয়া নদীর পাড়ে নয়াখালী গ্রামে কঠোর পরিশ্রমে দিনমজুরি করে জীবন কাটাচ্ছিলেন রমেছা। দুই সন্তান ফেলে স্বামী চলে যাওয়ায় রমেছার ঠাঁই হয় নয়াখালী বাবার ভিটেয়। পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন রমেছা নিজেই নিজের রোজগারের পথ বের করেছিলেন। রাস্তার কাজ, মাটির কাজ, চিংড়ি ঘেরের কাজে দিনমজুরি করছিলেন তিনি। কাজ না থাকলে নদীতে চিংড়ির পোনা ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দরিদ্র বাবার ভিটেয় বসবাসের জন্য করেছিলেন মাটির দেওয়ালে তৈরি একটি ঘর। রমেছা বলেন, ‘‘নানান সংকটের মধ্য দিয়ে জীবন এগিয়ে নিচ্ছিলাম। জোয়ারের পানির তোড়ে বসবাসের ঘর হারিয়ে এখন নতুন সংকটে পড়লাম। এখন মাথাগোঁজার ঠাঁইও নাই। বেড়িবাঁধের উপরে বসবাস করছি। কবে ঘরে ফিরতে পারবো জানি না। ঘরে ফিরতে হলে ঘর তৈরি করতে হবে। ঘর তৈরি করতে লাগবে অনেক টাকা। কোথায় পাবো সে টাকা!’’
আনুলিয়া গ্রামের আসাদুজ্জামানসহ আরো অনেকের চিংড়ির খামার লবণ পানির নিচে ডুবে গিয়েছিল। আসাদুজ্জামানের চারটি চিংড়ির খামার লবণ পানির তলায় চলে যায়। বাড়িতে তার তিনটি ঘর ধ্বসে গিয়েছিল। সব নিয়ে তার ক্ষতির পরিমাণ ৫ লক্ষাধিক টাকা। সফিকুল ইসলামের ১১ বিঘা জমিতে চিংড়ির ঘের ছিল। সব মাছ ভেসে যায়। ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ছয় লাখ টাকা। এভাবে আরো অনেক চিংড়ি চাষি তাদের সর্বস্ব হারিয়েছিলেন। এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ চিংড়ি চাষের উপর নির্ভরশীল। গত বছর চিংড়ি চাষের মৌসুম কেবল শুরু হয়েছিল। এরই মধ্যে এই বিপর্যয়।
আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘ধারদেনা করে কিংবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে চিংড়ি চাষ করেছিলাম। ব্যাংক এবং সমিতিতে ঋণ রয়েছে। চিংড়ি চাষে বিপর্যয় হলেও ঋণ আমাদের শোধ করতেই হবে। মৌসুমের শুরুতে ঘের থেকে কেবল চিংড়ি আহরণ শুরু হয়েছিল। পুরো মৌসুম পেলে দেনা শোধ করে লাভবান হতে পারতাম। কিন্তু এখন আমরা ব্যাপক লোকসানে আছি। চিংড়ি আমাদের উপার্জনের প্রধান অবলম্বন। চিংড়িতে ধ্বস নামলে আমাদের বিকল্প কিছু নাই।’’
ট্রলার ডুবি, নিখোঁজ মৎস্যজীবী
এটা প্রতি বছরের ঘটনা। বিপদের মুখে পড়ে উপকূলের মৎস্যজীবীরা নিখোঁজ হয়। কেউ ফিরে আসে, কেউ ফিরে আসতে পারে না। জীবিকার প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও মৎস্যজীবীরা সমুদ্রে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যজীবী বা তাদের পরিবারের লোকজনের সহায়তা পাওয়ার খবর পাওয়া যায় খুব কম। ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলা থেকে 'মা বাবার দোয়া' নামে একটি মাছধরার ট্রলার সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হয়। ওই ট্রলারে ১৩জন মৎস্যজীবী ছিলেন। ১৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাট থেকে 'এফভি খাজা আজমির' নামক ট্রলারে আরো ১৮ জন মৎস্যজীবী সমুদ্রে গিয়েছিলেন। এরপর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
৭ আগস্ট চট্টগ্রাম উপকূলে মাছ ধরার ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। ওই ট্রলারে থাকা ১৯ জনের মধ্যে ১১ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বাকিদের সন্ধান মেলেনি। জুলাই মাসের শুরুতে ভোলার চরফ্যাশন এলাকা থেকে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে ৩টি ট্রলার ডুবির ঘটনায় প্রায় ৩০ জন মৎস্যজীবী নিখোঁজ হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
ডেঙ্গুর বিস্তার ছিল ভয়াবহ
সদ্য বিদায়ী বছরে উপকূলীয় জেলাগুলোতে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর বিস্তার ছিল ব্যাপক। উপকূলীয় জেলা বরগুনা জেলা সারাদেশে পরিচিত হয়ে উঠেছিল ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে। গত বছর অক্টোবর অবধি ওই জেলায় ডেঙ্গুতে অন্তত ৫৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বেসরকারি হিসাবে। উপকূলীয় অঞ্চলের নোনা পানিতে আয়রন বেশি। এ জন্য স্থানীয় মানুষ বৃষ্টির পানিসহ অন্যান্য পানি দীর্ঘদিন ধরে জমিয়ে রাখে। যে কারণে সহজেই এডিস মশা বংশবিস্তার করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলের অন্যান্য এলাকায়ও ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে বলে অনেকের ধারণা।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের গবেষণাতেও। ‘রিভার স্যালাইনিটি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ : এভিডেন্স ফ্রম কোস্টাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণা বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলীয় ১৯ জেলার ১৪৮টি উপজেলায় মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততায় আক্রান্ত হবে ১০টি নতুন এলাকা। উপজেলাগুলো হলো সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জ; খুলনার বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া, কয়রা, পাইকগাছা; বাগেরহাটের মোংলা এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা। লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির জন্য উপকূলের অনেক মানুষের ভরসার স্থল বৃষ্টির পানি। এ পানি মটকা বা প্লাস্টিকের বড়ড্রামে করে ভরে রাখা হয় শুকনো মৌসুমে ব্যবহারের জন্য। আর এ পানিতে ডেঙ্গু ছড়ানো এডিসের বিস্তার ঘটছে।
অন্যদিকে ভারতের ‘ন্যাচার ইন্ডিয়া’ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নোনাপানির মশা মিঠাপানির মশার চেয়েও ভয়ংকর ভূমিকা রাখতে পারে। সমুদ্রের নোনাপানি ও নদীর মোহনায় জন্ম নেওয়া এসব মশা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা, পীতজ্বর ও ম্যালেরিয়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। নদীর নোনাপানি এখন লোকালয়ের গভীরে পৌঁছে গেছে।’ তবে এখনো অবধি নোনাপানিতে এডিসের বংশবিস্তার হচ্ছে এমন তথ্য দেননি দেশের বিশেষজ্ঞরা।
তাপ এবং শীতের প্রকোপ
২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিলে উপকূলীয় জেলাগুলোতে তাপমাত্রা গত দুই দশকের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। অনেক জায়গায় পারদ ৪৩° সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে উপকূলীয় মানুষের মধ্যে হিটস্ট্রোক এবং ডিহাইড্রেশনের সমস্যা ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে। উপকূলীয় জেলাগুলোর মধ্যে সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে গরমের তীব্রতা ছিল সবচেয়ে বেশি। এসময় নদী-ডোবা-নালা পানিশূন্য হয়ে পড়ায় মানুষের সংকট কয়েকগুন বেড়ে যায়। পানি সংগ্রহ করতে হয় দূরদূরান্ত থেকে। কৃষি ক্ষেত্রেও চরম সংকট দেখা দেয়। একইভাবে গতবছরের জানুয়ারি এবং ডিসেম্বরের শেষে শীত কাবু করেছিল উপকূলবাসীকে। ছবির ক্যাপসন