রাইজিংবিডি স্পেশাল

ভোটের মাঠে উত্তাপ, ইসিতে অভিযোগের লড়াই

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন, প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের হয়রানি, প্রচারে বাধা এবং মাঠ প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) একের পর এক লিখিত অভিযোগ দিচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এসব অভিযোগের বিপরীতে পাল্টা অভিযোগও জমা পড়ছে কমিশনে।

প্রচারের শুরুর পর থেকে বিএনপি, ১১ দলীয় জোটের পক্ষে জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একাধিকবার নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছে। দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে। কোথাও পোস্টার ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক, কোথাও সভা-সমাবেশে বাধা, আবার কোথাও নেতাকর্মীদের আটক, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নির্ধারিত সময়ের বাইরে প্রচারণার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও এসেছে। এসব ঘটনায় কয়েকটি মামলার পাশাপাশি জরিমানাও করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

মাঠ প্রশাসন নিয়ে অভিযোগ রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, “বিভিন্ন নির্বাচনি এলাকায় রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে পক্ষপাতদুষ্টভাবে কাজ করছেন।”

এসব অভিযোগ তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের দাবি জানায় বিএনপি।

এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান পৃথক অভিযোগে বলেন, “একটি রাজনৈতিক দল দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের কাছ থেকে ভোটার আইডি কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।”

জামায়াত, এনসিপি ও এবি পার্টির অভিযোগ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সিইসির সঙ্গে একাধিক সাক্ষাতে অভিযোগ করেন, “বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন ও সহিংসতা ঘটছে।”

তিনি বলেন, “জামায়াতের নারী কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে এবং প্রচার কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও কমিশনকে অবহিত করা হয়েছে।”

তবে ভোটারদের এনআইডি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহের সঙ্গে জামায়াতের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও তিনি দাবি করেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ ঢাকা-১৮ আসনের এনসিপি প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবের ওপর হামলার ঘটনায় নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানান। তিনি দাবি করেন, “দলীয় পরিচয়ে এই হামলা হয়েছে এবং এটি দমন-পীড়ন ও কেন্দ্র দখলের আশঙ্কার ইঙ্গিত বহন করে। প্রতিপক্ষের নির্বাচনি ও প্রচার কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু অভিযোগ করেন, “ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনি আচরণবিধি প্রকাশ্যে লঙ্ঘিত হলেও প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।”

তিনি বলেন, “একেক এলাকায় একেক রিটার্নিং কর্মকর্তা ভিন্নভাবে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছেন—কোথাও কঠোরতা, কোথাও নীরবতা।”

তিনি আরো জানান, দলের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফুয়াদের ওপর তার নির্বাচনি এলাকায় হামলার ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে ইসি নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন ৩০০টি সংসদীয় আসনে ‘নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি’ গঠন করেছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ অনুযায়ী এসব কমিটি সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। আইন ও বিচার বিভাগ এবং সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে কমিটিগুলো গঠন করা হয়েছে।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৭৬টি নির্বাচনি এলাকায় আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে ১১৯টি মামলা হয়েছে এবং জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১২ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ টাকা।

ইসি যা বলল দলগুলোর অভিযোগ ও আচরণবিধি নিয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “নির্বাচন সংক্রান্ত প্রত্যেকটি অভিযোগের সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে এবং তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।”

তিনি আরো বলেন, “আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার এখন পর্যন্ত ভালো পরিবেশ বিরাজমান। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্বুদ্ধ করার ফলে আচরণবিধি প্রায় শতভাগ নিশ্চিত করা গেছে বলে কমিশন মনে করে।”