রাইজিংবিডি স্পেশাল

কর্মসংস্থান চান ৫ কোটি তরুণ, তাদের ভোট চায় দলগুলো

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার প্রায় পৌনে ১৩ কোটি। তাদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণ, যা সংখ্যায় প্রায় ৫ কোটি। এসব ভোটারের বয়স ১৮ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে। এই ভোটাররা আগামী নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবেন।

এই তরুণদের মধ্যে অনেকে এবার প্রথম ভোটার হয়েছেন। অনেকে আগেই ভোটার হলেও নানা কারণে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেননি। এবারের নির্বাচনে তারা তাদের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির হিসাব মেলানোর চেষ্টা করবেন।

এই তরুণ ভোটারদের বেশিরভাগ শিক্ষিত। তারা বেড়ে উঠেছেন অবাধ তথ্য-প্রযুক্তির প্রবাহের সময়ে। স্বাভাবিকভাবেই তারা চিন্তা-চেতনায় অগ্রসর এবং মানসিকতায় স্বাধীন। তাদের প্রাগ্রসর মানসিকতা বিবেচনায় রেখে রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহার এবং প্রচারের কৌশল নির্ধারণ করেছে।  

দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার তরুণদের সঙ্গে কথা বলে ভোট নিয়ে তাদের ভাবনায় পরিবর্তন দেখা গেছে। তারা গতানুগতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন যেমন চান, তেমনই নিজেদের প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখতে চান। তাদের বেশিরভাগ দুর্নীতি দমন এবং কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়েছেন।

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও জেলায় মোট ভোটারের উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণ। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভোটারদের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ, যা জেলার মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনের ফলাফলে তারা বড় প্রভাব ফেলবেন।

নির্বাচন নিয়ে কথা বলতেই এই তরুণদের বড় অংশ রাজনীতিকদের ওপর আস্থা রেখেছেন। কিন্তু, তারা প্রতিশ্রুতির প্রতিফলনও দেখতে চেয়েছেন।

ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রাশেদ মাহমুদ বলেছেন, ‘‘আমরা শুধু স্লোগান নয়, বাস্তব কাজ দেখতে চাই। যারা ক্ষমতায় যাবেন, তারা যেন তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তরিক হন, এটাই আমাদের চাওয়া।”

নির্বাচন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইন নিউজ ও বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে তরুণরা নিজেদের মতামত প্রকাশ করছেন। এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ও ভোট প্রদানের হার বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তরুণ ভোটাররা প্রার্থীদের কাছে তাদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরছেন।  

সিলেটের এমসি কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুল মাজিদ বলেছেন, ‘‘প্রায় প্রতিদিনই প্রার্থীরা প্রচারে আসছেন। ভোট চাইতেছেন। আমাদের কথাও শুনছেন। আগামী সরকার তরুণদের চাহিদার দিকে প্রাধান্য দেবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তরুণরাই দেশের চালিকাশক্তি; আমরা চাই, তাদের জীবনমান উন্নয়নে নীতি নির্ধারণ করা হোক।’’

দেশের তরুণ ভোটাররা অন্যান্য ভোটারদের থেকে শিক্ষা ও তথ্য-প্রযুক্তিতে এগিয়ে। নির্বাচনেও তারা স্বাধীনভাবে মতামত জানাতে চান। সেক্ষেত্রে তারা প্রার্থীর শিক্ষা ও ইমেজকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।

ঠাকুরগাঁওয়ের তরুণদের সংগঠন নবারুণ সংঘের সাধারণ সম্পাদক লিটন ইসলাম মনে করেন, তরুণ ভোটাররা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে প্রার্থী, প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

এবার প্রথম ভোট দেবেন বরগুনা সদরের বুড়িরচর ইউনিয়নের লবণগোলা এলাকার শাহরিয়ার (২০)। প্রার্থীদের ভোট চাওয়ার ধরণ, নির্বাচনি ইশতেহার পছন্দ হয়নি তার। তিনি যে ‘নতুন বাংলাদেশ’ চেয়েছিলেন, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছেন না।

শাহরিয়ার বলেন, ‘‘যে আশা নিয়ে সরকার পতনের আন্দোলন করেছি, যাদের নেতৃত্বে করেছি, তারা কেউ দেশ তথা জনগণ নিয়ে ভাবে না। নির্বাচনে বরগুনায় বিভিন্ন দল থেকে যারা মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করছেন, তারা দলের প্রচার নিয়ে ব্যস্ত। তাদের মধ্যে কোনো নতুনত্বও দেখছি না।’’

জুলাই আন্দোলনের পরও রাজনীতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হওয়া এবং দুর্নীতি বন্ধ না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন বরগুনা সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তানজিলা ইভা।  

তানজিলা ইভা বলেন, ‘‘জুলাই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি অনিয়ম-দুর্নীতি-লুটপাট বন্ধ, বিরোধী মতের মানুষদের দমন-পীড়ন বন্ধ এবং নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু এর কোনটাই অর্জন হয়নি।’’

এসব বন্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতির ওপর তিনি আস্থা রাখতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘‘এখন আবার রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনি ইশতেহারে এসব বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু কোনো দলের ওপর ভরসা পাচ্ছি না।’’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পঞ্চগড়ের সমন্বয়ক ফজলে রাব্বী পরিবর্তনের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর আস্থা রাখতে চান। তিনি বলেন, তারা একটা পরিবর্তন চেয়েছিলেন, সেই পরিবর্তনে যিনি কাজ করবেন তাকেই ভোট দিতে চান।

ফজলে রাব্বী বলেন, ‘‘আমাদের প্রত্যাশা— নতুন যিনি সংসদ সদস্য হবেন, তিনি বেকারত্ব দূরীকরণ এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন।’’

দেশের গতানুগতিক রাজনীতির পরিবর্তন চান পঞ্চগড়ের নূরুন আলা নূর কামিল মাদ্রাসা থেকে সদ্য ফাযিল পাস করা সাকিব হোসেন। দলের প্রতীক নয়, প্রার্থীর যোগ্যতা দেখে ভোট দিতে চান।

তিনি বলেন, ‘‘আমরা প্রচলিত রাজনীতির একটা পরিবর্তন চাই। তাই দল দেখে নয়, উন্নয়নে যে কাজ করতে পারবে বলে মনে করব, তাকেই ভোট দেব।’’

পরিবর্তনের প্রত্যাশার কথা বলেন সিলেটের শাহপরান সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী তানভীর হাসানও। তিনি বলেন, “বর্তমান প্রজন্ম রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন চায়। দুর্নীতি ও সহিংসতার রাজনীতি পরিহার করে যোগ্য ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা জরুরি। যিনি তরুণদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে এলাকার উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন, তার পক্ষেই আমার ভোট।”

তরুণ ভোটাররা প্রশ্ন করছেন, যুক্তি দিচ্ছেন এবং নিজের পছন্দের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। এই তরুণ প্রজন্মই দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন— এমনটাই মনে করছেন বরগুনার তরুণ সাকিব মাহমুদ (২৭)।  

তিনি বলেন, ‘‘সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলাম, উনি কথা দিয়েছিলেন লুটপাট হবে না, উন্নয়ন করবেন। তিনিও কথা রাখেননি। তাই, এখন আর কেউকে বিশ্বাস করি না।’’

অনেক তরুণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে তাদের এলাকার উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছেন।

কুড়িগ্রাম সদরের বেলগাছা ইউনিয়নের যতিনের হাট এলাকার সরা মৌজার বাসিন্দা তরুণ ভোটার রেজাউল করিম মনে করেন, তাদের বড় সমস্যা যে, তারা কাজ পাচ্ছেন না। তার বাড়ির পাশে থাকা কুটির শিল্প কারখানাটি বন্ধ হয়ে আছে। যেসব প্রার্থী জেলায় শিল্পকারখানা করতে পারবেন, তাকে ভোট দেবেন রেজাউল করিম।

তরুণ ভোটারদের অধিকাংশই দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত নিরাপদ বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। ৫ কোটি তরুণ ভোটারের সমর্থন পেতে রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের ইশতেহারে সন্ত্রাস দমন, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ এবং কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো সামনে এনেছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১১ দলীয় জোট দুর্নীতি দমন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলছে। বিএনপি তরুণদের আকর্ষণ করতে ‘তারুণ্যের প্রথম ভোট, ধানের শীষের জন্য হোক’ স্লোগানে প্রচার চালাচ্ছে। তারাও বেকার ভাতা প্রদান, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের কথা বলছে। যদিও এসব প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় গেলে কতটা পূরণ করবে, তা নিয়ে আস্থাহীনতার কথা বলছেন তরুণরা।  

কুড়িগ্রাম সদরের পাঁচগাছী ইউনিয়নের শুলকুর বাজার এলাকার তরুণ ভোটার হাবিবুর রহমান মিন্টু বলেন, ‘‘আমরা চাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমুক্ত দেশ হোক। জেলায় কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক। যারা এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করবেন, তাদের ভোট দেওয়া হবে।’’    

আর নির্বাচনে আগে দেওয়া রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন দেখতে চান কুড়িগ্রামের নগরীর পাঠানটুলা এলাকার তরুণ ভোটার রায়হান আহমেদ। তিনি বলেন, “একজন তরুণ ভোটার হিসেবে আমি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করি। উন্নয়ন যেন কেবল প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়। কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও নাগরিক সেবায় অগ্রাধিকার দেওয়া প্রার্থীকেই আমি ভোট দিতে আগ্রহী।”

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সিলেটের প্রতিনিধি মোসাইদ রাহাত, কুড়িগ্রামের প্রতিনিধি বাদশা সৈকত, পঞ্চগড়ের প্রতিনিধি আবু নাঈম, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি মঈনুদ্দীন তালুকদার হিমেল এবং বরগুনার প্রতিনিধি ইমরান টিটু।)