রাইজিংবিডি স্পেশাল

‘জনপ্রিয়’ তবুও কেন হারলেন তাসনিম জারা 

ঘড়ির কাঁটা তখন সাড়ে নয়টা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট শুরু হয়েছে দুই ঘণ্টা আগে। অথচ ঢাকা-৯ আসনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র খিলগাঁও মডেল কলেজে তখনও দেখা নেই স্বতন্ত্র প্রার্থী ড. তাসনিম জারার। সকাল সকাল উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও, তিনি আসেন প্রায় ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট পর—চোখেমুখে স্পষ্ট বিষণ্ন আর হতাশার ছাপ।

এসেই অভিযোগের ঝড় তুললেন তিনি, “পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, ঢুকলেও নানা অজুহাতে বের করে দেওয়া হচ্ছে। প্রিজাইডিং অফিসারের দ্বারস্থ হয়েও কোনো সহায়তা পাননি।”

ভোটের শুরুতেই এমন প্রতিকূলতায় কার্যত পিছিয়ে পড়েন তিনি, আর সেই ধাক্কা আর সামলে উঠতে পারেননি।

বিকেল সাড়ে চারটায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর, একই কেন্দ্র থেকে একের পর এক ফল আসতে শুরু করে। তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির এই মুখ, তাসনিমের জন্য অপেক্ষা করছে বড় ধরনের ভরাডুবি! ফলাফলও সেই কথাই বলছে।

৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন তাসনিম। ১ লাখ ১১ হাজার ২১২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন ধানের শীষের হাবিবুর রশিদ। ৫৩ হাজার ৪৬০ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় শাপলা কলির জাভেদ মিয়া রাসিন।

খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা থানা নিয়ে (ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত) এই আসনটি একটি জনবহুল ও মিশ্র আবাসিক-বাণিজ্যিক এলাকা। এ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬০ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৭৩ জন পুরুষ, ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৮২ জন নারী ও ৫ জন হিজড়া।

ভোটকেন্দ্র ছিল ১৬৯টি। সবকটি ভোটকেন্দ্রের প্রাপ্ত ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, হাবিবুর রশিদ প্রতিটি কেন্দ্রেই জিতেছেন। নিরঙ্কুশ বিজয়ী হওয়া হাবিুবর বাকিদের চেয়ে ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। যদি আলোচনাটা ভিন্নভাবে হয় তাহলে বলা যায়, মূল লড়াইটা তানসিম ও জাভেদের ভেতরেই হয়েছে।

ফলাফল আগের থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন তানসিম ও জাভেদ। ফলাফল কেন্দ্রে প্রার্থী ও তাদের এজেন্টদের জন্য ছিল নির্ধারণ আসন। সেগুলোতে হাবিবুর ও তার সমর্থকরাই ব্যবহার করেছেন পুরোটা সময়। অন্য দুজন যেখানে ছিলেন অনুপস্থিত, হাবিবুর ছিলেন প্রাণবন্ত, চনমনে। বিজয় ঘোষণার কেবল অপেক্ষায় ছিলেন।

জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের পর গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব হয়েছিলেন তাসনিম জারা। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি জোট করার পর এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৯ আসনে নির্বাচনে অংশ নেন তাসনিম। পেশায় চিকিৎসক, গবেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার তাসনিমের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু ব্যালটে সেই বিপ্লব হয়নি।

যেখানে শক্ত অবস্থান তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে দেখা গেল হোঁচট। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রচার ঠিকঠাক থাকলেও শেষ মুহূর্তে তানসিম পিছিয়ে পড়েছিলেন। পোলিং এজেন্ট ঠিকমতো দাঁড় করাতে পারেননি, ভোটার স্লিপ পৌঁছায়নি ঘরে ঘরে। জেনজির উচ্ছ্বাস ছিল, কিন্তু বড়দের আস্থা পুরোপুরি অর্জন করা যায়নি। তার ওপর ‘ঘরের মেয়ে’ না ‘পড়শি’—এই প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত থেকেই গেছে।

শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বাসাবো তরুণ সংঘ মাঠে দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার জ্যোতির্ময় মন্ডলের সঙ্গে কথা হয় রাইজিংবিডি ডটকমের। যিনি শুরু থেকেই এই আসনের নির্বাচনের খবরের কাজে ছিলেন।

তার ভাষ্য, ‘‘এখানে এসে যেটা বুঝেছি তাসনিম জারা জনপ্রিয়। কিন্তু রাজনীতির মাঠে পরিপক্কতা দেখাতে পারেননি। এখানে কেন্দ্রের বাইরে বিএনপির যতগুলো বুথ ছিল, তাসনিমের তো একটাও ছিল না। কেন নেই সেই প্রশ্নটা উঠছে তখনই যখনই সে হেরে গেছে। হতে পারে ফান্ডিংয়ের ঘাটতি। হতে পারে লোকবলের ঘাটতি। দেখুন, ফেসবুকের প্রচার দিয়ে তো মাঠের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। আপনি জেনজি-দের মন জয় করবেন কিন্তু এর বাইরে যে বিশাল ভোট ব্যাংক আছে সেটায় খেয়াল রাখবে কে?”

তাসনিমের ঘাটতির জায়গাগুলোই কাজে লাগিয়েছেন হাবিবুর। বিশাল কর্মী বাহিনী, মাঠে শক্ত উপস্থিতি, আর একটি পরিষ্কার ইমেজ—সব মিলিয়ে তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছেন। এই আসনে মার্কার নয়, মানুষটাই হয়ে উঠেছে মূল ফ্যাক্টর।

একটি পডকাস্ট তাকে সরাসরি মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী তাসনিমকে ‘সহকর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বলেছিলেন, “আমরা একই উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করতে চাই ঢাকা-৯ আসনের মানুষের উন্নয়ন। আমাদের আদর্শ আলাদা হতে পারে, কিন্তু উদ্দেশ্য তো এক। তাহলে আমরা কেন প্রতিপক্ষ? আমরা সহকর্মী।”

এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। আর ‘এলাকার সন্তান’—এই পরিচয়টা ভোটের মাঠে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই আসনের রাজনীতি আবারো প্রমাণ করল—শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, সংগঠন আর মানুষের বিশ্বাস—এই তিনটাই নির্ধারণ করে দেয় ফলাফল।

তাসনিম বিশাল ভোট ব্যবধানে হারলেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়ায় অভিভূত,  “৪৪ হাজারের বেশি ভোট একটি শক্ত ভিত্তি। সেরা সময় এখনো আসেনি-সেটি সামনে অপেক্ষা করছে।”