রাইজিংবিডি স্পেশাল

ক্ষমতার কুর্সি থেকে ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল, এবার সংসদ ছাড়া জাপা

বিরোধী দল থেকে শূন্যের খাতায় নাম লেখাল জাতীয় পার্টি (জাপা)। আগের তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসে খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। ভোঁতা লাঙ্গলে ফলেনি কোনো ফসল। ফলে চল্লিশ বছর পর পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব হারাল বর্তমানে জিএম কাদেরের নেতৃত্বে থাকা দলটি। অবশ্য তাদের মহাসচিব বলছেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিকার হয়েছেন তারা।  

নব্বইয়ের গণআন্দোলনে তৎকালীন স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ৯ বছরের শাসনের পতন হলেও নানা জোড়াতালি দিয়ে এবং এরশাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় ভর করে দল হিসেবে ভেসে ছিল জাতীয় পার্টি। ফলে ১৯৯১ সালের পার্লামেন্টেও তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। সেই থেকে ডান-বাম করতে করতে চার দশক সংসদে দেখা গেছে বহুভাগে বিভক্ত জাতীয় পার্টিকে। তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর কোণঠাঁসা অবস্থায় ছব্বিশের নির্বাচনে এসে প্রার্থী দিলেও জনগণ তাদের কাউকে পার্লামেন্টে যাওয়ার রায় দেয়নি।

এরশাদ বেঁচে থাকা অবস্থায় দলীয় অন্তর্কোন্দলে জর্জরিত জাতীয় পার্টি এবারের নির্বাচনেও আরেকবার দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় জাতীয় পার্টির নির্বাচনি প্রতীক ‘লাঙ্গল’-এর দাফনের আভাস ছিল ভোটের মাঠে, যার প্রমাণ মিলেছে ফলাফলে।  

নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, লাঙ্গল প্রতীকে ১৯৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল জাতীয় পার্টি, যার একটিতেও জিততে পারেননি তাদের প্রার্থীরা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে ভাঙাগড়া থাকলেও এমন দুঃসময়ের মুখোমুখি আর কখনো হয়নি দলটি। 

১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সরকার ও বিরোধী দল- উভয় ভূমিকায় থাকা দলটি ইতিহাসে এই প্রথমবার শূন্যতায় গর্তে পতিত হলো।

ক্ষমতার কুর্সি থেকে শূন্যে পতন ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সংবিধান স্থগিত করে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। এরপর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও এরশাদের অবৈধ ক্ষমতা দখলের প্রতিবাদে জনমত গড়ে উঠতে থাকে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি ১৯৮৫ সালে একটি গণভোট আয়োজন করেন এবং দাবি করেন, ৯৪ শতাংশ ভোটার তার পক্ষে রায় দিয়েছেন।

তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সামরিক শাসনকে বেসামরিক রূপ দিতে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৩ আসনে জয় পায় দলটি। ভোটে জাপা ৪২ শতাংশ ভোট পায়। সে নির্বাচন মেনে নেয়নি তখনকার ত্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলো।

আন্দোলনের মুখে ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ আবার নির্বাচনের ঘোষণা দেন এরশাদ। চতুর্থ সংসদ নির্বাচন বর্জন করে প্রায় সব রাজনৈতিক দল। বিতর্কিত সে নির্বাচনে ৬৮ শতাংশ ভোট দেখিয়ে জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসন দখল করে নেয়।

১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়।

এরশাদ পতনের পরও একানব্বইয়ের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি সত্যিকারের ভোটে ৩৫টি আসনে জয় পায়। ওই দুর্বিসহ পরিস্থিতিতেও তাদের ঝুলিতে ছিল ১২ শতাংশ ভোট। 

আর দলটির চেয়ারম্যান এরশাদ জেলে বসে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেখিয়েছিলেন; রংপুরের পাঁচটি আসনে লড়াই করে সবকটিতেই জিতেছিলেন তিনি।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিতর্কিত ষষ্ঠ নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত ছিল জাতীয় পার্টি। একই বছরের ১২ জুনের সপ্তম নির্বাচনে দলটি ৩২টি আসন পায়। ওই নির্বাচনেও এরশাদ পাঁচটি আসন ধরে রেখেছিলেন।  তারা মোট গৃহীত ভোটের ১৬ শতাংশ পেয়েছি, অর্থাৎ দলটির ওপর মানুষের আস্থা বেড়েছিল সেবার। 

ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে তাদের সরকার গঠন করতে হয়েছিল। ফলে একব্যক্তি নির্ভর এরশাদের জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে পাঁচ বছর কাটিয়ে দেয়। 

২০০১ সালের অষ্টম নির্বাচনে এরশাদের দলের জনপ্রিয়তা কমে, তারা ১৪টি আসন পায়; ভোট পেয়েছিল মাত্র ৭ শতাংশ।

এরশাদের জনপ্রিয়তায় ভাটার টানে গতি হারাতে থাকা জাতীয় পার্টি ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক হয়। নৌকার ভোটের সুযোগ নিয়ে আবার কিছুটা গতি ফিরিয়ে ২৮টি আসন জিতে নেন দলটির নেতারা। অবশ্য ভোটব্যাংক ছিল সেই ২০০১ সালের মতো, মাত্র ৭ শতাংশ ভোট পায় দলটি। অবশ্য সে সময় এক প্রার্থীর সর্বোচ্চ তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নিয়ম চালু হলে এরশাদ ঢাকা ও রংপুরে দাঁড়িয়ে তিনটিতেই জয়ী হন।

২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনটি বিএনপি বর্জন করলে আওয়ামী লীগ সমঝোতায় জাতীয় পার্টি ৩৪টি আসন দখলে নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়। তবে আগের দুই নির্বাচনের মতো দলটির ভোটব্যাংক একই ছিল, মাত্র ৭ শতাংশ।

‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনেও আসন দখলে আওয়ামী লীগের মতো কারিশমা দেখাতে পারেনি জাতীয় পার্টি। দেশের মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ সেবার জাতীয় পার্টিকে পছন্দ করেছিল বলে দেখানো হয়। কোনোমতে ২২টি আসন নিয়ে বিরোধী দলের সুযোগ করে নিয়ে সেবারও পার্লামেন্টে ‘গৃহপালিত’ প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখা যায় তাদের। 

২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এরশাদের মৃত্যুর পর পদপদবি নিয়ে নেতাদের কাড়াকাড়ির মধ্যে তার ছোট ভাই জিএম কাদের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হন। তার নেতৃত্বে ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামি’খ্যাত দ্বাদশ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি মাত্র ১১টি আসন দখল করতে সমর্থ হয়। তবে অস্তিত্ব সংকটের চূড়ায় পৌঁছে যাওয়ার বার্তা চব্বিশেই পেয়ে যায় জাতীয় পার্টি। মাত্র ৩ শতাংশ মানুষ লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দিয়েছিল।

সবশেষ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি ১৯৮টি আসনে প্রার্থী দিয়ে কাউকে জেতাতে পারেনি। লাঙ্গলের চল্লিশ বছরের উর্বর ভূমিতে কোনো সফল ফলাতে পারেনি দলটি। পার্টি চেয়ারম্যান জিএম কাদের মুষ্টিমেয় ভোট পেয়ে জামানত বাঁচিয়েছেন আর কী! দলের সাধারণ সম্পাদক শামীম হায়দার পাটোয়ারীও এবার শূন্য। অবশ্য এর মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টির ‘গৃহপালিত’ তকমা হয়তো ঘুচবে; আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে পারবে দলটি।

রংপুরে ‘লাঙ্গলের দাফন’ একসময় রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো ছিল জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি। কিন্তু এবার এসব আসনে জামায়াত-বিএনপির দাপট দেখা গেছে। রংপুর জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী এবং একটি এনসিপি। কুড়িগ্রামের চারটির মধ্যে তিনটিতে জামায়াত, একটিতে এনসিপি। গাইবান্ধার পাঁচটির মধ্যে চারটিতে জামায়াত ও একটিতে বিএনপি। নীলফামারীর চারটি আসনই দখল করেছে জামায়াত। আর লালমনিরহাটের তিনটির তিনটিই নিয়েছে বিএনপি।

শুধু নিজেদের ঘাঁটিতে পরাজয় নয়, দলটির শীর্ষ নেতৃত্বও করুণভাবে পরাজিত হয়েছে। রংপুর-৩ আসনে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের প্রাপ্ত ভোটে তৃতীয় হয়েছেন। আগেরবার এই আসন থেকে জিতে তিনি সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছিলেন। 

এই ফল বিপর্যয়ের পর ফেসবুকে একটি ছবি ভাইরাল হয়, যাতে দেখা যাচ্ছে রংপুরে কয়েকজন তরুণ সামনে একটি লাঙ্গল রেখে প্রতীকী জানাজা পড়ছেন। অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, লাঙ্গলটির প্রতীকী দাফনও করা হয়েছে।

দলটির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসন ও গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এরমধ্যে গাইবান্ধা-৫ আসনে তিনি জামানত হারিয়েছেন।

‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ অভিযোগ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমাদের একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নির্বাচন করতে হয়েছে। নির্বাচনের কয়েকদিন আগেও আমাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে। মিডিয়া থেকে আমাদের ব্ল্যাকআউট করে দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরো বলেন, “আমাদের নিশ্চিত ৬ থেকে ১০টি আসন পাওয়ার কথা ছিল, যেখানে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে আমাদের তৃতীয় স্থানে দেখানো হয়েছে। যেখানে আমাদের ৫০ হাজার ভোট রয়েছে, সেখানে দেখানো হয়েছে ২০ হাজার। এসব পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে।”

তবে তিনি সার্বিক নির্বাচন মূল্যায়ন করে বলেন, “২০১৪ বা ২০১৮ সালের তুলনায় এবার ভালো নির্বাচন হয়েছে বলে মনে হয়।”