ভোর ৬টা। অন্ধকার পুরোপুরি কাটেনি। নারায়ণগঞ্জের রসুলপুরের জসিম মার্কেটের পাশের এক জীর্ণ ঝুপড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে দুটি ছায়া। একটি সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধার নুয়ে পড়া শরীর, অন্যটি ছয় বছরের এক শিশু। বৃদ্ধার নাম মিনারা বেগম। তার হাত ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসা শিশুটির নাম আদুরি। এই বয়সে যার হাতে থাকার কথা ছিল রঙিন বই, পেন্সিল। কিন্তু জীবনের করুণ বাস্তবতায় আজ তার ছোট্ট কোমল হাতে লোহার ভারী হাতুড়ি। এই হাতুরির আঘাতে ইটের খোয়ায় মিশে যাচ্ছে আদুরির শৈশব ও স্বপ্ন।
আদুরির জীবন এমন হওয়ার কথা ছিল না। তিন বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনা তছনছ করে দিয়েছে তার সাজানো পৃথিবী। বাবা ইয়াসিন আর মা মাহফুজা বেগমকে হারিয়ে তিন বছর বয়সেই এতিম সে। নানি মিনারা বেগমই এখন আদুরির একমাত্র অবলম্বন। নানির পাঁচ মেয়ের মধ্যে আদুরির মা ছিলেন চতুর্থ। কোনো ছেলে সন্তান নেই মিনারার, তাই এই বয়সেও হাড়ভাঙা খাটুনি ছাড়া বেঁচে থাকার অন্য কোনো পথ খোলা নেই তার সামনে।
প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় যখনই মা-বাবার প্রসঙ্গ এলো, পাথরের মতো শক্ত হয়ে ইট ভাঙতে থাকা আদুরি মুহূর্তেই বদলে যায়।জল জমে চোখের কোণায়। নিঃশব্দ সেই কান্নায় মিশে আছে গভীর হাহাকার। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম কষাঘাত ছোট্ট মনে তার চেয়েও বুঝি গভীর দাগ তৈরি করেছে। দ্রুতই সে সামলে নেয় নিজেকে। মনোযোগী হয় নিজের কাজে। তারপর একসময় ইট ভাঙার শব্দে চাপা পড়ে যায় তার সমস্ত বেদনা।
তেলকল এলাকার ধুলোবালির স্তূপে বসে থাকা এই শিশুদের দেখলে মনে হয়, যেন শৈশব এখানে নিষিদ্ধ শব্দ। এখানে প্রতিটি আস্ত ইট ভেঙে টুকরো করলে মজুরি পাওয়া যায় মাত্র ১ টাকা। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী শরীর নিংড়ানো পরিশ্রম করে দিনে ১৫০ থেকে ১৮০টির বেশি ইট ভাঙতে পারেন না। দিন শেষে যখন সূর্য ডুবে যায়, মিনারার ক্লান্ত হাতে উঠে আসে মাত্র দেড়শ থেকে পৌনে দুইশ টাকা।
আদুরি তার নানির পাশে বসে থাকে। কখনো কখনো নানির ক্লান্তি দেখে নিজের ছোট্ট কোমল হাতে তুলে নেয় ভারি লোহার হাতুড়ি। সেই হাতুড়ি তার হাতের তুলনায় কত বড়, সমাজ হয়তো তা লক্ষ্য করে না। কিন্তু আদুরি যখন এক মনে ইটে আঘাত করে, তখন মনে হয় সে ইটে নয়, বরং তার কপালে লেখা ভাগ্যের ওপর আঘাত করছে।
দিন শেষে যখন তারা বাড়ি ফেরেন, তখন আদুরির শরীর ধুলোয় ধূসর। দু’মুঠো ভাতের জন্য এই লড়াই তাদের প্রতিদিনের। সত্তর বছরের নানি আর ছয় বছরের নাতনি, একজন জীবনের শেষ প্রান্তে, অন্যজন জীবনের শুরুতেই বুঝি জেনে গেলেন নিষ্ঠুর বাস্তবতা। আদুরি জানে না তার ভবিষ্যৎ কী, সে শুধু জানে, আগামীকাল ভোর ৬টায় তাকে আবার সেই হাতুড়িটা তুলতে হবে।
মিনার বেগম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘আমার পাঁচ মেয়ে, আদুরির মা চার নাম্বার। তিন বছর আগে ওর মা-বাবা দুজনেই গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায়। তখন থেকেই আমার কাছে রাখি ওরে। আমরা গরিব মানুষ। একদিন কাজ না করলে পেটে ভাত জোটে না। আদুরির মাথা ভালো। সব কিছু মনে রাখতে পারে। কিন্তু কপালে স্কুলে যাওন নাই, কি আর করমু। একটা ইট ভাঙ্গলে এক টাকা পাই, তা দিয়ে কোন মতে চলি। আমাদের ও শখ আছে কিন্তু পূরণ করার সামর্থ্য নাই।’’
এরপর সেই চেনা বাক্য শোনা যায় এই বৃদ্ধার কণ্ঠে ‘‘সরকারি কোন সহযোগিতা পাই না আমরা। আসলে আমাদের দেখার কেউ নাই।’’
ইট ভাঙতে কষ্ট লাগে। ব্যথা লাগে। কিন্তু নানি ছাড়া তো দেখার কেউ নেই। আদুরি এই ভাগ্য মেনে নিয়েছে মনের অজান্তে। কতটুকুই আর বয়স! যে কারণে তার কণ্ঠে ঝরে সহজ কথা ‘‘নানির সঙ্গে সারদিন থাকি আর ইট ভাঙ্গি।’’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আইএলও-এর সমন্বয়ে পরিচালিত সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩৫.৪ লাখ, যার মধ্যে প্রায় ১২.৮ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। অর্থাৎ প্রতি ৩ জন শিশু শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১ জন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত যা শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য কষ্টকর ও অসহনীয় হয়ে ওঠে। এই কারণে অনেক শিশুরা অপরাধ জগতের সাথেও জড়িয়ে পড়তে পারে।
জাতিসংঘ ১৯৫৯ সালে শিশু অধিকার সনদ ঘোষণা করে। বাংলাদেশ এই সনদে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। বাংলাদেশ শিশু আইন অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবাইকে শিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
শিশু অধিকার সনদে বলা হয়েছে, শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো ধরণের বৈষম্য করা যাবে না। রাষ্ট্রসমূহ শিশুদের পরিচর্যা এবং সরকার শিশুদের সেবা ও সুবিধাদি প্রদান করবে। শিশুদের মৌলিক অধিকার যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। শিশুদের আর্থিক সুবিধা দিতে হবে।
অধিকারকর্মী জান্নাতুল ফেরদৌস আইভী রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘আদুরির হাতে এই হাতুড়ি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত অব্যস্থাপনার এক নিষ্ঠুর উদাহরণ। যে বয়সে একটি শিশুর শব্দ নিয়ে খেলার কথা, বর্ণমালার সাথে পরিচয় হওয়ার কথা, সেই বয়সে সে লড়ছে এক টুকরো ভাতের জন্য, ইট ভাঙতে হাতুড়ি হাতে নিতে হচ্ছে- এটা মেনে নেওয়া কঠিন। আমরা বড় বড় সেমিনারে শিশুশ্রম মুক্তির কথা বলি, আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করি, কিন্তু মাঠপর্যায়ে আদুরিদের এই জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে যে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা মানুষের জীবন থেকে অনেক বিচ্ছিন্ন।’’
একজন বৃদ্ধ এবং ৬ বছরের শিশুকে সহযোগিতা করার জন্য রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের মধ্যে বাস্তবধর্মী সেবাব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
আইভী আরো বলেন, ‘‘রাষ্ট্রীয় যে সামাজিক সুরক্ষা বলয় থাকার কথা ছিল সেখানে সেবাব্যবস্থা এতটাই জটিল এবং সময়সাপেক্ষ যে এমন প্রান্তিক মানুষদের কাছে সেই সেবা পৌঁছাতে পারে না। সরকারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সেবাব্যবস্থা এ জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ বাজেটের সবচেয়ে কম বরাদ্দের মধ্যে যেসব মন্ত্রণালয় রয়েছে তার একটি এটি। পর্যাপ্ত অর্থবল না থাকলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। ফলে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। একইসঙ্গে জাতীয় পর্যায়ের যাকাতের ফান্ড থেকে এ ধরণের পরিবারগুলোকে সহযোগিতা করার জন্য একটা সমন্বয় ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।’’
আদুরিদের এই হাড়ভাঙা খাটুনি বন্ধ করতে কেবল আইন দিয়ে হবে না, প্রয়োজন তাদের পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রীয় বিশেষ তদারকি। আমরা চাই না আমাদের এই দানবীয় আকারের ইমারতের প্রতিটি ইট ভাঙ্গার সাথে একজন ছোট্ট শিশুর হাতের শ্রমের অমানবিক গল্প লেখা থাকুক।